বাংলাভ’মি২৪ ডেস্ক ॥
রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই। স্বামী আবুল হোসেনের ঘরে ফেরার কোন হদিস নেই। তার স্ত্রী ডলি (ছদ্মনাম) তখনও প্রতীক্ষায়। এর মধ্যেই দরজায় শব্দ। খুলে দিতেই ডলি দেখেন, তার স্বামী একা নন সঙ্গে এক যুবক। দু’জনের মুখ থেকেই আসছে মদের গন্ধ। আবুলের মদ্যপ অবস্থা, রাত গভীর করে বাসায় ফেরা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সঙ্গে অচেনা যুবক দেখেই ডলির বুক কেঁপে ওঠে। ডলির দিকে তাকাতে-তাকাতেই যুবকটি ঘরে ঢুকে। আবুল তাকে বিছানায় নিয়ে বসিয়ে দেয়। দুই রুমের বাসা। পাশের রুমের খাটে ডলির ছয় বছর বয়সী পুত্র সন্তান ঘুমে। যুবকের পাশে ডলিকে বসতে বলে আবুল। ডলি নিশ্চুপ। আবুল বলে, ‘আমাদের বড় ভাই। ভাইয়ের কাছে অনেক টাকা ঋণী আমি।
ভাইকে খুশি করে দাও।’ ডলি প্রতিবাদ জানায়। আবুল গালিগালাজ করে। এক সময় মারধর করে। তারপর স্বামীর নির্দেশে বাধ্য হয়েই অন্ধকারে পা বাড়ায় ডলি। ডলি এখন প্রায়ই রাজধানীর অভিজাত কয়েকটি আবাসিক হোটেল কলে সাড়া দিয়ে রাত কাটায়। এ পেশায় আসার কারণ বলতে গিয়ে সে আরও জানায়, তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে লেখাপড়ায় একাদশ শ্রেণীর কোটা ডিঙ্গাতে পারেনি সে। বিয়ে হয় এলাকার এক খুদে ব্যবসায়ীর সঙ্গে। সন্তান জন্মের এক বছর পরেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে স্বামীর মৃত্যু ঘটে। এর দেড় বছর পর ট্রাক চালক আবুলের সঙ্গে পরিচয়। দ্বিতীয় বিয়ে। একই এলাকার ছেলে আবুল। বিয়ের পর সন্তানসহ ডলিকে ঢাকায় নিয়ে আসে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের বুবলি এলাকায় থাকাকালীনই প্রকাশ পায় আবুলের আসল চেহারা। ডলি নিজের শরীর বিক্রি করলেও এই টাকা জমা হতো আবুলের পকেটে। এক সময় আবুলকে ডিভোর্স দেয় ডলি। নিজেই বাসা ভাড়া নেয়। সাবলেট। পূর্বের খদ্দেরদের ডাকে আবাসিক হোটেল, বাসায় ছুটে যায় সে।
ছেলে থাকে বাড়িতে ডলির মা-বাবার কাছে। বাড়ির সবাই জানেন ডলি একটি বেসরকারি হাসপাতালে হিসাব বিভাগে চাকরি করে। শুধু ডলি নয়, রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় রয়েছে এরকম অসংখ্য নারী। বিভিন্ন পেশার আড়ালে তারা মূলত যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে। যৌনকর্মীদের সংগঠন দুর্জয় নারী সংঘের তথ্যমতে, দেশে নারী যৌনকর্মীর রয়েছে ৭৪৩০০। এরমধ্যে ৪৩৩০০ যৌনকর্মীই বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ও হোটেলে এ পেশায় নিয়োজিত। বাকি ৩০৭০০ যৌনকর্মী ভাসমান। যৌনকর্মীদের বৃহত্তম অংশই বাস করে ঢাকায়। যৌনকর্মের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত রাজধানীর কিছু হোটেল বন্ধ হওয়ায় ফ্ল্যাটকে বেছে নিয়েছে অনেকে। তবে অভিজাত হোটেলে যৌন ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে। হোটেলের চেয়ে ফ্ল্যাটে খদ্দেরকে বেশি টাকা গুনতে হয়। সূত্রমতে, পরিচিত খদ্দের ছাড়াও দালালদের মাধ্যমে খদ্দের সংগ্রহ করেন ফ্ল্যাটে থাকা যৌনকর্মীরা। দালালরা খদ্দেরের কাছ থেকে বখশিসের টাকা আদায় করে। কোন কোন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট যৌনকর্মীরা দালালদের পার্সেন্টেজ দিয়ে থাকে। দালাল হিসেবে হোটেলের সার্ভিস বয়রা উল্লেখযোগ্য। হোটেলে খদ্দেরকে দিতে হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। সেখানে ফ্ল্যাটে দিতে হয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা।
হোটেলের ভিআইপি (পতিতাদের বয়স ও সৌন্দর্য অনুসারে) পতিতার ক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, সেখানে ফ্ল্যাটে ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা। যৌকর্মীদের দালাল হিসেবে পরিচিত কেরানীগঞ্জের সোহেল জানান, ফ্ল্যাটে যৌনকর্মীদের খদ্দেরদের মধ্যে রয়েছেন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তান নিয়ে বাসাবোর একটি বহুতল ফ্ল্যাটের তৃতীয় তলায় থাকে রংপুরের একটি পরিবার। স্বামী গাড়িচালক রুস্তুম মিয়া। তাদের বাসায় থাকে তিন যৌনকর্মী। তিন মেয়ের বয়স ১৬ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে।
তাদের নিজের বোন দেখিয়ে মাসে ১০০০০ টাকা ভাড়ায় এই ফ্ল্যাট নিয়েছে রুস্তুম। রুস্তম জানান, খাওয়া-থাকা বাদে তিন মেয়েকে মাসে ৩০০০০ টাকা দেয় সে। রুস্তুম আয় করে ২০০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা। সে আরও জানান, খদ্দেরদের নিকট অল্প বয়সীদের চাহিদা বেশি। রুস্তুমের বাসায় থাকা তিন মেয়ের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী মেঘার (ছদ্মনাম) বাড়ি বাগেরহাটে। তার মা নেই। বাবা খুনের মামলায় কারাগারে। বাবাকে মুক্ত করতে টাকা দরকার। তাই অন্ধকারে হাঁটছি একা। খদ্দের সম্পর্কে ষোড়শী মেঘার মন্তব্য, ‘বয়স্করাই বেশি আমার কাছে আসে।’ আগের তুলনায় অল্পবয়সী মেয়েরা এখন এ পেশায় বেশি জড়াচ্ছে। এজন্য সামাজিক অবস্থাকে দায়ী করেছেন উন্নয়ন সংস্থা লাইট হাউস কনসোর্টিয়াম- এর বিশেষজ্ঞ সৈয়দ তাপস। তিনি বলেন, ‘আইনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ। কিন্তু আইনের রক্ষকরাই এর অপব্যবহার করছেন। অপ্রাপ্ত বয়সী যৌনকর্মী পুলিশের কাছে আটক হওয়ার পর সর্দারণীরা মায়ের দাবিতে আদালত থেকে তাদের মুক্ত করে। পরে আবার ওই পেশায় নিয়োজিত করে।’ ভাসমান যৌনকর্মীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে ভিআইপি যৌনকর্মীদের খদ্দেরও হন অনেক পুলিশ কর্মকর্তা। গত ৩১শে ডিসেম্বর থার্টিফার্স্ট নাইটে হোটেল রেডিসনে অনেক ভিআইপি যৌনকর্মীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়।
৩০০০ টাকা টিকিটের মূল্য দিয়ে ডিজে পার্টিতে ঢুকতে পারছিলো না অনেকে। সেখানে দায়িত্বরত গুলশান থানার জনৈক পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়ে ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হন কয়েক যৌনকর্মী। তাদের একজন রুহান (ছদ্মনাম) জানায়, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে অধ্যয়নরত। থাকে হোস্টেলে। নিজের খরচ যোগাতেই এক বান্ধবীর মাধ্যমে এ পথে পা বাড়িয়েছে। প্রতি রাতের জন্য তাকে দিতে হয় ৩০০০ টাকা। বড় মাপের ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীরাই মূলত তার খদ্দের। অন্যদিকে ভাসমান যৌনকর্মীরা ৫০ থেকে শুরু করে ২০০ টাকায় ঘণ্টা খানেকের জন্য খদ্দেরের সঙ্গী হয়। বিভিন্ন শ্রেণীর শ্রমিকরাই মূলত তাদের খদ্দের। রাজধনাীর হাইকোর্ট, জনসন রোড, পরীবাগ, শাহবাগ, বিভিন্ন সিনেমা হল, সংসদ ভবন সংলগ্ন এলাকায় রাতে ভাসমান পতিতাদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। ‘মানুষের জন্য’ ফাউন্ডেশনের সেক্স ওয়ার্কার ইনটারভেশন প্রোগ্রামের ম্যানেজার মহুয়া তানিয়া বলেন, ‘পুলিশ ও মাস্তান কর্তৃক যৌনকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হন। তাদের রোজগারের বড় একটি অংশই পুলিশ ও মাস্তানদের পকেটে যায়।’ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এখন খদ্দের কম। তাই রোজগার কমে গেছে বলে জানান মিরপুর-১০-এর বাসিন্দা যৌনকর্মী আশা আনজুম (ছদ্মনাম)। এ অবস্থা চলতে থাকলে নিজের খরচ চালানো দায় হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রচলিত কোন আইনে পতিতাবৃত্তি বা যৌনপেশা নিষিদ্ধ নয়। ২০০০ সালের মার্চে ‘উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে যৌনকর্মী বেআইনি নয়’ বলে উচ্চ আদালতের বিচারপতি মো. ফজলুল করিম ও বিচারপতি এমএ ওয়াহাব মিয়ার সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ রায় দেন। তারপরও পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয় যৌনকর্মীদের। ১৯৯৯ সালের ১৪ই জুলাই যৌনকর্মীদের পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসনের নামে দেশের বৃহত্তম পতিতালয় টানবাজার ও নিমতলী থেকে উচ্ছেদ করা হয়। পরবর্তীতে পুনর্বাসন করা না হলে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় গোপনে এ ব্যবসা বিস্তৃত হচ্ছে। (এম.জামিন)
