বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ সোনালী ব্যাংকে চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। এ নিয়ে পুলিশ ও র্যা বের হাইকমান্ড ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে চলেছে। চলছে পর্যালোচনা, বিশদ গবেষণা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সোনালী ব্যাংকের ৪৬৮টি শাখা অরক্ষিত হয়ে আছে বলে র্যা ব ও পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রহরীদের সঙ্গে অপরাধীদের সখ্য থাকার প্রমাণও মিলেছে। অরক্ষিত শাখাগুলোতে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) ও সিকিউরিটি অ্যালার্ম বসানো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিরাপত্তার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের সহায়তা নিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
এ ব্যাপারে র্যা বের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এ টি এম হাবিবুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বেশির ভাগ শাখার নিরাপত্তা পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংকে যেভাবে চুরিসহ নানা অনিয়ম হচ্ছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। অরক্ষিত শাখাগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে এবং ব্যাংকের যেসব নিরাপত্তা প্রহরী রয়েছেন তাঁদের সব সময় নজরদারির মধ্যে রাখতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ভবনের বাইরে ও ভেতরে সিসি ক্যামেরা ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিকিউরিটি অ্যালার্ম স্থাপন করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংক লুট করা দুর্বৃত্তদের ধরতে র্যা বের পাশাপাশি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। তবে টাকা লুটের সঙ্গে ব্যাংকের লোকজন জড়িত বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিশোরগঞ্জ ও বগুড়ায় সুড়ঙ্গ কেটে সোনালী ব্যাংকের টাকা লুট হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তার ও চুরি বন্ধের কৌশল নিয়ে পুলিশ, র্যা ব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বৈঠক করে চলেছেন। এরই মধ্যে তাঁরা বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় কী ধরনের নিরাপত্তা থাকতে হবে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন র্যা ব-পুলিশ। কর্মকর্তারা অনুসন্ধান চালিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন, সরকারি ব্যাংকগুলোতে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার পাশাপাশি নিরাপত্তার বালাই নেই বললেই চলে। যাঁরা ব্যাংকে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন তাঁদের নেই উন্নতমানের প্রশিক্ষণ। নেই আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। প্রহরীরা রাতে সঠিকভাবে ডিউটি না করে ঘুমিয়ে থাকেন। আবার দুর্বৃত্তদের সঙ্গে সিকিউরিটি গার্ডদের আঁতাতও থাকছে। বিশেষ করে সোনালী ব্যাংকের সব কটি শাখায় নিরাপত্তাব্যবস্থা অপ্রতুল। ঢাকার বাইরে ব্যাংকের যেসব শাখা রয়েছে সেগুলোর অবস্থান ভাঙাচোরা ভবনে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সোনালী ব্যাংকের শাখা আছে এক হাজার ২০৩টি (২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত)। পুলিশ ও র্যা বের তদন্তে দেখা গেছে ব্যাংকটির ৪৬৮টি শাখাই অরক্ষিত। শাখাগুলোতে নেই কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা। কোনোটিতেই নেই সিসি ক্যামেরা। নেই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিকিউরিটি অ্যালার্ম। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লা, লাকসাম, নরসিংদী, ভৈরব, গাজীপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, রংপুরসহ আরো কয়েকটি এলাকায় অরক্ষিত শাখাগুলোর অবস্থান। ঢাকায়ও আছে এর কয়েকটি।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভল্টে রাখা টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বলা হয়েছে। পরে তারা নিরাপত্তা বাড়াতে সোনালী ব্যাংকের শাখাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু সেই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করছে না ব্যাংক। অরক্ষিত শাখাগুলোর মধ্যে অধিকাংশেরই আগ্নেয়াস্ত্র নেই। নেই দক্ষ নিরাপত্তাকর্মী। ভল্টও ত্রুটিপূর্ণ। আবার কিছু ব্যাংকের শাখায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও তা ব্যবহার করার জনবল নেই।’ পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, বিভিন্ন প্রাইভেট কম্পানি থেকে ভাড়া করা গার্ড দিয়ে নিরাপত্তা, লেনদেন, এমনকি অফিস সহকারীর কাজ পর্যন্ত করানো হচ্ছে। ব্যাংকের ভল্ট সুরক্ষিত করার জন্য ইস্পাতের বেষ্টনী নির্মাণসহ সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা স্থাপনের জন্য কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হয়। ভল্টের সিকিউরিটি সিস্টেমের সঙ্গে ব্যাংকের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের নিরবচ্ছিন্নভাবে সংযোগের ব্যবস্থা রাখতেও বলা হয়েছে। নিয়মকানুন মেনে চললে ব্যাংকে চুরি, ডাকাতিসহ সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধ করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ
তিন মাসের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শাখার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে এক বৈঠকে এ নির্দেশ দেন ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম। বৈঠকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়িয়ে জনগণের আমানত সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ জন্য তিন মাসের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠকে সোনালী ব্যাংকসহ অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং বিভাগের অতিরিক্ত সচিব অমলেন্দু মুখার্জিকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এস এম মনিরুজ্জামান কমিটির সদস্যসচিব। সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের একজন ডিএমডি কমিটির সদস্য থাকবেন। এ কমিটি নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কাজ যেমন- ভল্টরুমের স্ট্যান্ডার্ড ও পরিমাপ ঠিক করবে। এ ছাড়া ব্যাংকের আমানত সুরক্ষায় বীমা চালু করা যায় কি না, তাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে কমিটি।
বৈঠকে ভল্টরুমের নিরাপত্তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সোনালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাংকের এক হাজার ২০০ শাখার মধ্যে ৮০০ শাখা ভাড়া বাড়িতে। ভাড়া বাড়িতে থাকা প্রায় সব শাখাই পুরনো ভবনে অবস্থিত। এ কারণে এসব ভবন থেকে শাখা স্থানান্তর জরুরি। কিন্তু জমি কিনে এসব শাখা স্থানান্তর ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এ ছাড়া নতুন ভবনে শাখা স্থানান্তরও স্বল্প সময়ে সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী হতে পারে সে ব্যাপারে পরামর্শ চান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নিচতলায় ভল্টরুম মোটেই নিরাপদ নয়। ভল্ট দোতলায় হওয়াটা বাঞ্ছনীয়। আরেক এমডি বলেন, ব্যাংকগুলোর ভল্টরুম সাধারণত কর্নারে হয়। কর্নারের রুম বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ভল্টরুম মাঝের রুমে স্থানান্তর করা গেলে নিরাপদ হবে। রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ উপায়ে নির্মিত ভল্টের পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি সাধারণ গ্যাসকাটার দিয়ে কাটা সম্ভব নয়। রূপালী ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় এটি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া শাখার নিরাপত্তায় নিজস্ব নিরাপত্তা অথবা প্রাইভেট প্রহরী অথবা আনসারকে দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না সেটি ঠিক করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে ব্যাংকিং বিভাগের সচিব ড. এম আসলাম আলম বলেন, সোনালী ব্যাংকে নতুন নতুন ঘটনা ঘটছে। আর ঝুঁকিতে পড়ছে ব্যাংকটি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আগে থেকে গুরুত্ব না দেওয়ায় এ রকম হচ্ছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বলেন, এক হাজার ২০০ শাখার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক দিনে সম্ভব নয়। এ নিয়ে কাজ চলছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।কা.কন্ঠ
