শ্রীপুর প্রতিনিধি ॥ গাজীপুরের শ্রীপুরে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে লাঠিতে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে আহত ছাত্রলীগ কর্মী আল-আমিন (২১) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। গত ১০ মার্চ বিকালে জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শ্রীপুর উপজেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক আল আমিন স্থানীয় উজিলাবো গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে। এদিকে গত ৮ মার্চের ঘটনায় গত ১০ মার্চ পর্যন্ত থানায় তিনটি মামলা করা হয়েছে। সংঘর্ষের ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেফতার করেছে।
এলাকাবাসী, পুলিশ ও নেতাকর্মীরা জানায়, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন ১৫ মার্চ হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ গত ১২ মার্চ দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকায় শ্রীপুরের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্ব›িদ্ধতা করে ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত বর্তমান চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন সবুজ (মোটরসাইকেল), আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল জলিল (আনারস) এবং বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবদুল মোতালেব (কাপ-পিরিচ)। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে দু’গ্রুপ বিভক্ত হয়ে কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে।
এর জেরে গত ৮ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় যোগদানের সময় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জেলা আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ইকবাল হোসেন সবুজ ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল জলিলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ, গুলি ও হাত বোমা নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ এবং ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। প্রায় ৫ ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে শ্রীপুর শহর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে পুলিশ ও সাংবাদিকসহ উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়। এদের মধ্যে কয়েকজন গুলিবিদ্ধও রয়েছে। আহতদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা আল আমিনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ও পরে ওই রাতেই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৯ মার্চ রাতে আল আমিন মারা যায়। গত ১০ মার্চ বিকালে বাদ আসর স্থানীয় উজিলাবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আল আমিনের পিতা আবুল হোসেন বাদী হয়ে শ্রীপুর থানায় একটি হত্যা মামলা {নং- ১৬(৩)১৪} দায়ের করেন। এ মামলায় ইকবাল হোসেন সবুজকে ১নম্বর বিবাদী, ২ নম্বর বিবাদী তাঁর ভাই সাখাওয়াত হোসেন, ৩নম্বর বিবাদী শ্রীপুর পৌরসভা মেয়র মো: আনিসুর রহমানসহ ৩৫জনের নাম উল্লেখ করে এ হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিহতের একমাত্র বড় ভাই আলমগীর হোসেন জানান, ঢাকার এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৯ মার্চ রাত ১২টার দিকে আল আমিন মারা যায়। পরে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ গত ১০ মার্চ বিকালে শ্রীপুরের গ্রামের বাড়িতে দাফনের জন্য আনা হয়েছে। ঘটনার দিন হামলাকারীরা আমার ভাইকে ড্রেনে ফেলে দেয়ার পরও পিটিয়ে আহত করেছে। আমার ভাই এমন কোনো অপরাধ করেনি যে তাকে পিটিয়ে হত্যা করতে হবে। এ সময় তিনি তার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অসমর্থিত সূত্র জানায়,-পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নিহত আল-আমিন গুলিবিদ্ধ হয়ে হত্যা করা হয়েছে; এমন তথ্য সেই। রিপোর্টে উল্লেখ্য রয়েছে- ‘তার মাথায় আঘাতের কারণে মৃত্যু’।
এদিকে শ্রীপুর মডেল থানার ওসি আমির হোসেন জানান, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে গত ৮ মার্চ শ্রীপুর শহরে দু’পক্ষের মাঝে সংঘর্ষ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ আহত করার ঘটনায় গত ৯ মার্চ রাতে শ্রীপুর থানায় আরো দুটি মামলা হয়েছে। এর একটিতে বাদী হয়েছেন শ্রীপুর থানার এসআই কবির হোসেন। সরকারি কাজে বাধা, সরকারি লোকসহ বিভিন্ন জনকে মারধর ও জখম করার অপরাধে এ মামলায় অজ্ঞাত মোট তিনশ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অপর মামলার বাদী হয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি উপজেলা পরিষদে জেলা আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন সবুজের ছোট ভাই। হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ মারধরসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা ওই মামলায় শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নূরুন্নবী আকন্দ, শ্রীপুর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবুর রহমান, সোলায়মানসহ নাম উল্লেখ করে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও মামলায় অজ্ঞাত আরও ৫০-৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি জানান, গত ৮ মার্চরের সংঘর্ষেও ঘটনায় অস্ত্রসহ এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও গ্রেফতারের অভিযান চলছে।
উল্লেখ্য, নির্বাচনী প্রচারকালে গত ৭ মার্চ দুপুরে বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল জলিলকে র্যাব সদস্যরা বরমী এলাকা হতে আটক করে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে জলিলের বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়ক প্রায় ৫ ঘণ্টা অবরোধ করে এবং ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সন্ধ্যার পর জলিলের মুক্তি নিশ্চিত হওয়ার পর তারা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। এ ঘটনার জেরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরদিন গত ৮ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় যোগদানের সময় আবদুল জলিলের কর্মী-সমর্থকরা আওয়ামীলীগ অফিসের সামনে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে। তৎক্ষণিক এই ঘটনায় ইকবাল হোসেন সবুজ দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সভা করেন। এ সময় সবুজ গ্রুপের অতিউৎসাহী সমর্থকরা জলিল গ্রুপের কয়েক নেতাকর্মীকে মারপিট করে। পরে রহমত আলী এমপি’র পুত্র দূর্জয়ের নির্দেশে জলিল গ্রুপ পাল্টা হামলা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়। শুরু হয় হামলা পাল্টা হামলা। এ পরিস্থিতিতে ইকবাল হোসেন সবুজ নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়ী বহর নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গাড়ীতে লাঠি সোটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করে। এ সয়য় ইকবাল হোসেন সবুজকে গুলি করে হত্যার মিশন ছিল প্রতিপক্ষের। পরে সবুজের দেহরক্ষী কামরুল লাইসেন্সকৃত অস্ত্র নিয়ে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। এ ঘটনায়ই আল আমিন প্রতিপক্ষের লাঠির আঘাতে নির্মম আহত হন। এ সময় তার মাথা ফেটে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছিল। সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
শ্রীপুরে নির্বাচনী সহিংসতা : নিহত ছাত্রলীগ নেতা আল আমিন গুলিবিদ্ধে মারা যায়নি
আপডেট :March 16, 2014
0
সম্পর্কিত আরও সংবাদ
সাম্প্রতিক সংবাদ
আর্কাইব
প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার
ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।
সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫
