স্টাফ রিপোর্টার ॥ ধূলা আর ময়লা আবর্জনার নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাস্তা সংস্কার এবং তিতাস ও ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িসহ নানা করণে বাড়ছে ধূলার রাজত্ব। এতে পথচারীসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে জটিল ও কঠিন রোগের আশঙ্কা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ধূলার মাধ্যমে বাতাসে নানা রোগের জীবাণু ছড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে যাদের এলার্জি রয়েছে তাদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। এছাড়া শিশু ও বৃদ্ধরা সর্দি-কাশিসহ ফুসফুসের নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
মাত্রাতিরিক্ত ধূলায় পথচারী এবং যানবাহনের যাত্রীদের অনেকেই নানান রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। মাসের পর মাস নগরীর কেন্দ্রস্থলে এই ধূলার মহোৎসব হলেও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। ধূলা নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনও এ বিষয়ে ন্যূনতম কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
রাজধানীর মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের স্থান ঘুরে দেখা গেছে, ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে রাস্তায় ব্যাপক ধূলাবালি উড়ছে। ধূলা নিয়ন্ত্রণে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ম-কানুন মেনে চলার নির্দেশ থাকলেও তারা এ বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ধরণের দূষণের মধ্যে ধূলা দূষণের অবস্থান শীর্ষে। এর কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতির প্রভাব বাড়ছে। জীবাণুমিশ্রিত ধূলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ধূলার কারণে রাজধানী ঢাকাবাসীর মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের প্রতিমাসে কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পযর্ন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এর কারণে পরিধেয় কাপড় চোপড়সহ ঘরের আসবাবপত্র ধূলায় ভরে যায়। এগুলো পরিস্কার করতে উল্লেখযোগ্য সময় ও অর্থ নষ্ট হয়। এতে পানি ও বিদ্যুতেরও অপচয় বাড়ে।
এজন্য পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় একটি কাযর্কর আইন প্রণয়নের দাবিও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
চিকিৎসকরা বলছেন, ধূলা দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুস ক্যান্সার, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানী ও যক্ষাসহ নানা জটিল ও কঠিন রোগ দেখা দিচ্ছে। এটির প্রভাব ধূমপানের চেয়েও ভয়াবহ। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ধূলা দূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আতিকুর রহমান বলেন, ‘ধূলা দূষণের কারণে দিনদিন স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মূলত শহরাঞ্চলের অধিকাংশ রোগীই ধূলা দূষণের রোগী। চিকিৎসার সাহায্যে এসব রোগ সেরে উঠলেও এ থেকে খুব সহজে মুক্তি পাওয়া কঠিন। আর এসব রোগের রোগের ফলে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ে।’
রাজধানীতে যে কারণে ধূলা দূষণ হচ্ছে:
রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি, ভবন নির্মাণ, ভবন ভাঙা, রাস্তা নির্মাণ, মেরামত, পাইপ লাইন বসানোসহ বিভিন্ন কাজ নিয়ম-কানুন অমান্য করে সম্পন্ন করায় ধূলা দূষণ ঘটছে। তাছাড়া নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন এবং সিটি করপোরেশনের আবর্জনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময়েও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় বাড়ছে ধূলা দূষণ।
এ অবস্থায় ধূলাদূষণ বন্ধে কিছু পরামর্শও দিয়েছে পবা। এগুলো হলো-
নিয়মিত রাস্তা পরিষ্কার করা, পরিসেবার সংযোগ মেরামত, বৃদ্ধি ও নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় রাস্তা খননে সৃষ্ট মাটি সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে ফেলা, দালানকোঠা বা অন্যকোনো অবকাঠামো তৈরির সময় নির্মাণ সামগ্রী রাস্তার ওপর বা রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় না রাখা।
ধূলা সৃষ্টিকারী কোনো সামগ্রী বহনের ময় সঠিক আচ্ছাদন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়া। ড্রেনের আবর্জনা রাস্তার পাশে জমিয়ে না রাখা। আবর্জনা যথাযথ স্থানে ফেলা। আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় সতর্কতা অবলম্বন করা।
ফুটপাতসমূহ নিয়মিত পরিষ্কার করা। বাইরে থেকে ঢাকায় প্রবেশ করা যানবাহনগুলো যথাযথভাবে পরিষ্কার করা। সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা।
বাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বলেন, ‘দেশে অস্বাভাবিকভাবে ধূলা দূষণ বেড়েছে। এর ফলে বাড়ছে নানা জটিল ও কঠিন রোগব্যাধি। বাড়ছে দৈনন্দিন ব্যয়। ধূলা দূষণ বন্ধে নাগরিক সচেতনতা তৈরির জন্য সরকার বেসরকারি সংগঠন ও সচেতন মহলকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ধূলাদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার উৎসগুলোকে বন্ধ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা যেতে পাবে।’
