বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ রাজধানীর যানজট সমস্যা যাচ্ছেই না। প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, ২ লাখ অবৈধ রিকশার বেপরোয়া চলাচল, লোকসংখ্যা বৃদ্ধি, যত্রতত্র পার্কিং, ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত আবাসন ও স্থাপনা ইত্যাদি কারণে এ সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। ১০ বছর আগে যানজট নিরসনে প্রণীত মহাপরিকল্পনার বেশিরভাগেরই বাস্তবায়ন হয়নি এখনো। এছাড়া এর আলোকে ২০১০ সালে যে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এখন শুনা যাচ্ছে, ড্যাপের জন্য নতুন পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।
২০ বছর আগে (১৯৯৩ সালে) রাজধানীতে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে লোকসংখ্যা ছিল ৭০ লাখ আর বর্তমানে ১ কোটি ২৭ লাখে এসে ঠেকেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন উন্নয়ন পরিকল্পনার (ডিএমডিপি) প্রাক্কলন অনুসারে ২০১১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪২ লাখ আট হাজার। প্রতিদিন নতুন মানুষ আসছে ২ হাজার ১৩৬ জন। আর সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ২০০৮ সালের জুন থেকে ২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত রাজধানীর রাস্তায় ৩৭ হাজার ৭০৫টি নতুন গাড়ি যুক্ত হয়েছে।
নগরীতে যে হারে লোকসংখ্যা বাড়ছে, সে হারে কিন্তু আয়তন বাড়েনি। এরপরেও অব্যাহতভাবে নির্মাণ হচ্ছে বহুতল ভবন, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অফিস, আবাসন। আর এসব স্থাপনার বেশিরভাগেরই নেই নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা।
সরকার যানজট নিরসনে খিলগাঁও ফ্লাইওভার, মহাখালী ফ্লাইওভার, বিজয়সরণি ফ্লাইওভার,এয়ারপোর্ট-মিরপুর ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেও কোনো ফল হয়নি। রবং ফ্লাইওভারের মধ্যেও যানজট লেগে থাকে। যানজটে সীমাহীন দুর্ভোগের পাশাপাশি পুড়ছে মূল্যবান জ্বালানি সম্পদ, বাড়ছে দূষণ, অপচয় হচ্ছে মানুষের মূল্যবান সময়।
বাংলাদেশ প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জুবায়ের বিন আলমের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতি বছর ১১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকার সম পরিমাণ ক্ষতি হয়। প্রতি বছর পরিবহন খাতে ব্যবহারের জন্য ১১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকার জ্বালানি আমদানি করা হয়। যার বেশিরভাগই ঢাকার পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে প্রাপ্ত মূল্যবান জ্বালানি সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায়। কিন্তু যানজটের কারণে এ সম্পদে অপচয় ঘটছে প্রতিদিন। বায়ু ও শব্দ দূষণের কারণে মানুষ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়, যানজটের কারণে রাজধানীতে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো দূরহ, মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যানজটে শিশুদের পড়ালেখার ওপর নেতিবাচক প্রভাক পড়ছে। অনেক সময় মূমুর্ষু রোগীকেও হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
রাজধানী ও এর প্রবেশ পথগুলো যানজটমুক্ত ২০০৪ সালে ২০ বছরমেয়াদি (২০০৫-২৪) মহাপরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করা হয়। এসটিপির আওতায় চার পর্বে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরিকল্পনাটি হলো- ৫০টি নতুন সড়ক নির্মাণ, এক রুটে একটি বড় কোম্পানির বাস পরিচালনার ব্যবস্থা, বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজ (বিআরএফ) প্রবর্তন, বাসের জন্য পৃথক লেন বাস র্যা পিড ট্রানজিট (বিআরটি), মেট্রোরেল বা ম্যাস র্যা পিড ট্রানজিট (এমআরটি), ফ্লাইওভার এবং বৃত্তাকার নৌপথ প্রবর্তন ও স্বল্প দূরত্বের রেল সার্ভিস চালু এর অন্যতম।
এছাড়া রাজধানীর প্রধান সড়ক রিকশামুক্ত ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং নগরীতে মানুষের চাপ কমিয়ে আনতে প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশও করা হয় ওই পরিকল্পনায়। আর এই এসটিপিকে অনুসরণ করেই রাজউক বহুল আলোচিত ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ প্রণয়ন করে।
মূলত ১৯৯৫ সালে রাজধানীকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ড্যাপ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। ২০১০ সালে এ-সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়। বিদ্যমান ড্যাপের মেয়াদ আগামী বছর শেষ হচ্ছে। নতুন ড্যাপ প্রণয়নে এরই মধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এজন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করছে সংস্থাটি। ২ মার্চ আগ্রহপত্রও চাওয়া হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের জন্য বৃহত্তর ঢাকার (ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর) ভূমি ব্যবহারের নকশা প্রণয়ন করবে এ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এ নকশা অনুযায়ী ভবিষ্যতে আবাসনসহ অন্যান্য প্রকল্প অনুমোদন দেবে রাজউক।
এসব পরিকল্পনার নবায়ন হচ্ছে কিন্তু সমন্বিত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ প্রকল্পগুলো নিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। আর পরিকল্পনার প্রস্তাবগুলো বাস্তবসম্মত কি না তা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এ ব্যাপারে পরিবেশ বিষয়ক এনজিও ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের ন্যাশনাল এডভোকেসি অফিসার মারুফ রহমান জানান, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান- এসটিপি) একটি প্রস্তাবনায় যানজট নিরসনের জন্য ৩টি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সুপারিশ করা হয়েছে। এর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বর্তমানে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি এলিভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রাইভেট কার বান্ধব অবকাঠামো।
ঢাকায় বর্তমানে শতকরা ২ ভাগ মানুষের প্রাইভেট কার রয়েছে। সুতরাং এই অল্প সংখ্যক মানুষের জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পেছনে এত টাকা ব্যয় করা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া বাস, ট্রাক, রিকশা, ট্রেন এবং পথচারী চলাচলকে যানজটের কারণ হিসেবে চিহিৃত করে পরিবহন ব্যবস্থায় কার্যকর মাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হলেও প্রাইভেট গাড়ির মতো যানজট সৃষ্টিকারী অন্যতম বাহন নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অবকাঠামো শহরের নান্দনিক সৌন্দর্যহানির পাশাপাশি গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় দূষণ, জ্বালানির অপচয়, তাপমাত্রা, দুর্ঘটনা ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি করে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পথচারী এবং জ্বালানিমুক্ত যান চলাচলের সুবিধা নষ্ট করে। এসটিপিতে পাতাল রেল (মেট্রো) নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। যা মাত্র শতকরা ৮ ভাগ যাত্রী বহন করবে। অথচ এর জন্য খরচ পড়বে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।’
মারুফ রহমানের পরামর্শ হলো- ঢাকা শহর থেকে যানজট দূর করতে হলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশসহ সমম্বিতভাবে পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
এছাড়া রাজধানীর ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাতজুড়ে ২ লাখ ৩০ হাজার হকার রয়েছে। অনেক এলাকায় ফুটপাত থেকে মূলরাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত দখল করে বসানো হয়েছে বিভিন্নি পণ্যের দোকান। বিশেষ করে গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট এলাকায় মূল রাস্তায় দোকান বেশি।
তবে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও হকার্স লীগের সভাপতি এমএ কাশেম হকারদের কারণে যানজট বাড়ছে এটা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘হকাররা যানজট সৃষ্টি করে না। বিভিন্ন গণপরিবহন নগরীর রাস্তায় যত্রতত্র গাড়ি থেকে যাত্রী ওঠা নামার কারণে যানজট হচ্ছে। সরকার গত ১৫ বছরেও হকারদের পুনর্বাসন না করার কারণে ১ লাখ ৫০ হাজার স্থায়ী ও ৮০ হাজার অস্থায়ী হকার ক্ষুদ্র ব্যবসা করে যাচ্ছে। যারা বসার জায়গা পায় না তারাই রাস্তায় বসে। এদের পুনর্বাসন করা হোক। হকাররা কোনো দিন ফুটপাতে বসবে না।’
যানজটের বড় কারণ হিসেবে প্রাইভেট কারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন নতুন মডেলের প্রাইভেট গাড়ি নামছে। যাত্রী পরিবহনের অনুপাতে অনেক বেশি জায়গা নিয়ে প্রাইভেট গাড়ি সৃষ্টি করছে যানজটসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা। পরিবেশ ও যানজটের কথা বাদ দিলেও প্রাইভেট গাড়ির অন্যতম বড় সমস্যা পার্কিং।’
অনেকে যানজটের জন্য মূল সড়কে বেপরোয়া রিকশা চলাচলকে দায়ী করেন। কিন্তু জাতীয় রিকশা-ভ্যান শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইউনুস আলী তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান, ৭৯ হাজার ৫৪০টি রিকশা আছে লাইসেন্সধারী। আর ২ লাখ রিকশার কোনো লাইসেন্স নেই। তার মতে, রিকশা ঢাকা শহরে যানজট সৃষ্টি করে না। পুলিশ চাঁদা তোলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নগরীতে ১৫ হাজার ট্রাফিক প্রয়োজন। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে ঢাকা শহরে কোনো যানজট থাকবে না।
রাজধানীর যানজটের কারণ প্রধান ভুক্তভোগী নিয়মিত চলাচল করা কর্মজীবী মানুষেরা। এ নিয়ে তাদেরও কিছু অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ রয়েছে।
বাসাবোর বাসিন্দা সমাজকর্মী মো. বোরহান বিশ্বাস জানান, ঢাকা শহরে প্রতিদিন নতুন নতুন গণপরিবহন নামানো হচ্ছে। রাস্তায় চলতে পুলিশ সার্জেন্ট ও ট্রাফিকদের চাঁদা দেয়ার বিরপরীতে যত্রযত্র গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা পাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মিরপুর অথবা ধানমণ্ডি, গাবতলী যেতে ভয়াবহ যাজটের কবলে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে প্রতিদিনই যানজট লাগে। এর অন্যতম কারণ হলো ওই স্কুলে যারা পড়ে তাদের মধ্যে অধিকাংশই স্বচ্ছল পরিবারের। তাদের যাতায়াতের জন্য প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এখানে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। রাস্তার উপরেই গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে ফলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পড়ে আরামবাগ, ফকিরাপুল, শাজাহানপুর, নয়াপল্টনসহ আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় যানজট। একই অবস্থা সৃষ্টি হয় নটরডেম কলেজ, বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল, সিদ্ধেশ্বরী কলেজের সামনে।
মিরপুর এলাকার কামাল নামের এক ছাত্র জানান, গত রোববার সকাল ১১টায় মিরপুর ১০ নম্বর থেকে যাত্রা শুরু করে ফার্মগেট পৌঁছান দুপুর আড়াইটায়। এসময় সড়কের দু’পাশে লাইন ধরে গাড়ি আটকে থাকতে দেখেন তিনি। অপর এক ছাত্র বলেন, ধানমণ্ডি থেকে দুপুর দেড়টায় রওনা হয়ে মহাখালীতে পৌঁছান বিকেল সাড়ে ৩টায়। অন্যান্য দিন এই পথ আসতে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে তার।
মহানগরীর ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্বশীল এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, যানজট শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে কাওরান বাজার, ফার্মগেট, মহাখালী, সাতরাস্তা, রেডিসন হোটেল পেরিয়েছে। যানজট সামাল দিতে অল্প ট্রাফিক নিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ট্রাফিকের জনবল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
খিলগাঁও এলাকার এক ব্যবসায়ী সাহাদাত হোসেন সাবু বলেন, সব জেলাকেন্দ্রিক অফিস রাজধানী ঢাকায়। যার ফলে সব কাজ ঢাকা থেকে সম্পাদন করা হয়। তিনি মনে করেন, প্রত্যেক জেলার নিজ নিজ দপ্তর নিজ নিজ জেলায় থাকা প্রয়োজন। তাহলে রাজধানীতে মানুষের চাপ কমতো। বাংলামেইল২৪ডটকম
