বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ সিগারেট শিল্প রক্ষায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে ধুমপান বিরোধী আন্দোলনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সিগারেট শিল্পকে ক্রমান্বয়ে ‘বিশেষ’ সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, ধুমপান নিরোধে সরকার নানামাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও দু’টি বহুজাতিক সিগারেট কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে খোদ সরকারই। আর এর মধ্যে দু’টি কোম্পানিকে ‘অবৈধ’ সুবিধার মাধ্যমে ২১ বছরে ৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজস্ব খাতের এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সিগারেট প্রীতির অভিযোগ উঠেছে।
আরো জানা গেছে, জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে সরকার ধুমপানকে নিরুৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এরই অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তামাক চাষে ‘ঋণ’ প্রদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ২১ বছর ধরে অনৈতিকভাবে দু’টি সিগারেট কোম্পানিকে বকেয়া সুবিধায় ব্যান্ডরোল দিয়ে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ওই দুই সিগারেট কোম্পানিকে প্রতি ১৫ দিনে বকেয়া সুবিধায় ব্যান্ডরোল দিয়ে আসছে।
এর মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো কোম্পানিকে প্রতি ১৫ দিনে ৮০ কোটি টাকা ও ঢাকা ট্যোবাকো কোম্পানিকে ৪০ কোটি টাকার ব্যান্ডরোল সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
১৯৯১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ওই কোম্পানি দু’টি অবৈধভাবে ৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা অতিরিক্ত সুযোগ ভোগ করেছে।
আরো অভিযোগ রয়েছে, এর মাধ্যমে কোম্পানি দু’টি সরকারি কোষাগার থেকে বকেয়ায় ব্যান্ডরোল সুবিধা সুযোগ নেয়।
কিন্তু অভিযোগ থেকে বাঁচতে ও কর ফাঁকি দিতে কোম্পানির ডেলিভারি চালানে ১৫ দিনের মধ্যে শুল্ক পরিশোধ যোগ্য লেখা হতো।
এদিকে, দেশি বিড়ি কোম্পানিগুলো এ ধরনের কোনো সুবিধাই পায়নি। দেশি বিড়ি কোম্পানিগুলোকে পোস্ট অফিস থেকে অগ্রিম রাজস্ব পরিশোধের মাধ্যমে ব্যান্ডরোল কিনতে হয়।
এ দু’টি কোম্পানিকে ‘পৃষ্ঠপোষকতার’ স্বার্থে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এমন সুবিধা দেওয়ায় বিভিন্ন মহলে আলোচনার ঝড় ওঠে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কার স্বার্থে সুবিধা অব্যাহত ছিল তা নিয়ে বিরাট কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। এ সুবিধার ফলে কি পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন শুল্ক সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে দু’টি কোম্পানি থেকে রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া ৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা আদায় করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগ উঠেছে, সিগারেট কোম্পানিগুলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে বিশেষ সুবিধা নিতে এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের আত্মীয়দের নাকি কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে এ সুবিধাসহ সিগারেট কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে তারা কাজ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানের ঊধ্বর্তন এক কাস্টমস কর্মকর্তা বাংলানিউজকে জানান, সিগারেট কোম্পানির কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাওয়া কিছু কর্মকর্তা কোম্পানি দু’টির হয়ে এনবিআরে কাজ করছেন। ফলে যে যাই বলুক কোনো কাজ হয় না।
একই সঙ্গে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বছরের পর বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সিগারেট কোম্পানির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে ২০১১ সালে প্রাক বাজেট আলোচনায় বিষয়টি উত্থাপিত হলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত রাজস্ব বোর্ডকে এ সুবিধাটি বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগে জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সিগারেট কোম্পানিগুলো ভ্যাট রিবেটের (কর ছাড়) সুবিধা দিয়ে আসছেন।
এর মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো কোম্পানি প্রতিবছর ৭০ কোটি টাকার ভ্যাট রিবেট (কর ছাড়) পায়। অথচ এ সুবিধা দেশি বিড়ি কোম্পানিগুলো পায় না।
রাজস্ব বোর্ডের দ্বিমুখী নীতি থেকেই স্পষ্ট যে সিগারেট কোম্পানিকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে খোদ এনবিআর।
এ নীতি ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণে প্রতিবছর সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।
উল্লেখ্য, আমাদের দেশে রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত সিগারেট ও মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো।
ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সিগারেট আসক্তির হার বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের ওপর সিগারেট কোম্পানির খবরদারিও বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন।
গত ২৮ এপ্রিল প্রাক বাজেট আলোচনার নামে এনবিআর চেয়ারম্যানের কক্ষে সিগারেট অ্যাসোসিয়েশনের ‘গোপন বৈঠক’ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায়ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন পক্ষপাতিত্বমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, বিড়ি খেলে মানুষ মারা যায়, কারণ বিড়িতে ধুলা ময়লা বেশি থাকে। তাই ক্ষতির মাত্রাটা বেশি। কিন্তু সিগারেট খেলে তা হয় না। কারণ সিগারেটে নিকোটিনের পরিমাণ অনেক কম এবং সিগারেট অনেক আধুনিক ও ফিল্টার যুক্ত।
এ বিষয়ে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির মহাসচিব ডা. শেখ গোলাম মোস্তফা বাংলানিউজকে বলেন, বিড়ি ও সিগারেট দু’টিই ক্যান্সারের জন্য দায়ী। তবে বিড়ির চেয়ে সিগারেট ক্যান্সারের জন্য বেশি দায়ী। কারণ সিগারেটে আসক্তদের তৃপ্তির জন্য বেশি বেশি টানতে হয়। কিন্তু বিড়ি কম টানলেই তৃপ্তি হয়।
সর্বপরি সিগারেটের চতুর্থ স্ল্যাব বাতিল করে সিগারেটের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার দাবি বিশেষজ্ঞদের। এতে সিগারেট বিলাস দ্রব্যে পরিণত হবে। সেই সঙ্গে দেশে রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ঝুঁকির পরিমাণও কমে আসবে বলে মত বিশেজ্ঞদের।
পাশাপাশি সিগারেট শিল্পকে দেওয়া ভ্যাট রিবেট, ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ প্রভৃতি সুবিধা বন্ধেরও দাবি জানান বিশেষজ্ঞরা। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
