বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ যে কয়টি হল নিয়ে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার মধ্যে সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল সবচেয়ে জমিদারি। হলটি জমিদারদের বাড়ির মতো করে তৈরি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যতগুলো হল রয়েছে সেগুলোর মধ্যে এর অবস্থান শীর্ষে। হলের কাঠামোটি বিখ্যাত হওয়াতে অনেক বিদেশি পর্যটক হল পরিদর্শন করতে আসেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও হলটি যেন সমস্যার পাহাড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের বড় বড় রাজনীতিবিদেরা এ হলে থেকে গৌরবের সঙ্গে পড়া লেখা শেষ করেছেন। কিন্তু সেই ঐতিহ্যবাহী হলে থাকা শিক্ষার্থীরা কতটা কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছে তা দেখার কেউ নেই। নানা সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন। কিন্তু অনেকটা নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে হল প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্য হল থেকে কর্তৃপক্ষ অবৈধ ও বহিরাগতদের হল ছাড়া করতে নানা অভিযান চালালেও এ হলের প্রশাসন নিশ্চুপ। ফলে এখনো শত শত শিক্ষার্থী কালবৈশাখী ঝড়ের মধ্যেও হলের বারান্দায় রাত্রিযাপন করছে। হলের খেলার কক্ষেও নেই খেলার সুযোগ। কেননা সেখানেই প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী তাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করে নিয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে ও হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হলে খাদ্য, পানি ও আবাসন সমস্যা চরমে। তারপরও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না হল কর্তৃপক্ষ। ফলে সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এদিকে ছেলে মেয়েদের সুষ্ঠু মেধা ও মনন বিকাশে সুন্দর পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন হলের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের একটাই দাবি- হল কর্তৃপক্ষ যদি একটু সোচ্চার হতো তাহলে শিক্ষার্থীদের এত দুর্ভোগে পড়তে হতে না।
তাদের একটাই প্রশ্ন এসব সমস্যার সমাধান কি কোনো দিনই হবে না?
এস এম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইমরান আলী বাংলামেইলকে বলেন, ‘হলে ওঠার পর থেকেই সমস্যা দেখে আসছি। কিন্তু কী বলবো, কোনো সমস্যার সমাধান এখনো দেখছিনা। আমাদের হলের আবাসিক শিক্ষকেরা কখনো কোনো ব্যাপারে খোঁজ নিতে আসে না। আমার তো মনে হয় তারা জানেই না হলে কুকুর-বিড়াল ঘুমায় নাকি ছাত্ররা ঘুমায়।’
হলের প্রধান সমস্যাগুলো:
খাদ্য সমস্যা: হলের মূল সমস্যা হল খাদ্য সমস্যা। হলটিতে প্রায় ১৫শ শিক্ষার্থী থাকেন। কিন্তু এত শিক্ষার্থীর জন্য হলের যে ক্যান্টিন রয়েছে তাও আকারে অনেক ছোট। এক সঙ্গে ২০-৩০ জনের বেশি খেতে পারে না।
তাছাড়া ক্যান্টিনে খোঁজ নিয়ে ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে- ছোট এ ক্যান্টিনটিতে অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে খাবার দেয়া হয়। আর প্রতিদিন খাবারের তালিকা একই থাকে। মাসের পর মাস সেই খাবার ম্যানুর কোনো পরিবর্তন হয় না। যার ফলে দীর্ঘ দিন একই ধরনের খাবার খেতে বাধ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
অনেকে অভিযোগ করেছে ক্যান্টিনের খাবারের কারণে গ্যাস্টিকের প্রকপ বেড়ে গেছে। ক্যান্টিন ম্যানেজারকে এ বিষয়ে বার বার বলার পরও কোনো সাড়া পায় নি তারা। তাছাড়া অপর্যাপ্ত লোকবল দিয়ে ক্যান্টিন চালাচ্ছে। একরকম সেলফ সার্ভিস চালু হয়েছে ক্যান্টিনে। নিজেদেরকেই খাবার নিয়ে খেতে হয়।
এ সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তৌহিদুজ্জামান বাংলামেইলকে বলেন, ‘ক্যান্টিনের খাবার পরিবেশনের অবস্থা খুবই বাজে। অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে খাবার পরিবেশন করা হয়। কিছু দিন আগে ভাত থেকে শুরু করে সব কিছুরই দাম বাড়ানো হয়েছে। অথচ খাবারের মানের কোনো উন্নয়ন হয়নি। সেই সঙ্গে লোকবলের তো অভাব আছেই। যার ফলে খাবার খেতে গিয়ে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অথচ হল প্রশাসন এত সমস্যার মধ্যেও নীরব ভূমিকা পালন করছে। কোনো নির্দেশনা পর্যন্ত ক্যান্টিনকে দেয় না।’
ক্যান্টিন ম্যানেজার বাচ্চু মিয়া বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সাধ্য মত খাবার পরিবেশন করতে চেষ্টা করি। লোকজন পাওয়া যায় না বলে এমন অবস্থা।
খাবারের দাম বাড়ানো সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগের চেয়ে সব কিছুর দাম বাড়ছে বলেই দাম বাড়ানো হয়েছে। তাছাড়া হলে যা সাহায্য করার কথা তা আমার নিজে করতে হয়। এ জন্যই দাম বাড়তি।’
আবাসন সঙ্কট: মুসলিম স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত বড় আয়তনের দ্বিতল এ হলটি যে কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করে সহজে। ঢাবির সৌন্দর্য আর গৌরবের মূর্তমান প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হলটি।
হলটি বাহির থেকে দেখে যতটা ফিটফাট গোছালো মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই ধরা পরে হলের আসল চেহারা। এ যেন শিক্ষার্থীদের কারাবাস! অনেকটা শিক্ষা জীবনের অভিশাপ।
প্রশাসনের অবহেলা আর ছাত্রলীগের দখলবাজির কারণে প্রায় ১ হাজার শিক্ষার্থী মানবেতর জীবন যাপন করছে। এ জন্য যেন কারও মাথা ব্যথা নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, হলের দ্বিতীয় তলার দু পাশের টানা বারান্দায় গিঞ্জি গিঞ্জি করে এক সারিতে পাতানো প্রায় ৫শ’র মত খাট। সেখানেই শিক্ষার্থীরা শুয়ে বসে আছে। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে- এদের মধ্যে ১ম বর্ষ থেকে শুরু করে ৩য়, ৪র্থ এমনকি মাস্টার্স বর্ষের শিক্ষার্থী রয়েছে। আর এক্ষেত্রে রাজনীতি একটা বড় ভূমিকা রাখছে। যেসব শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তারা খুব সহজেই ভালো রুমে থাকার ব্যবস্থা পায়। আর যারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। একজন শিক্ষার্থীর পড়ালেখা শেষ হতে চললেও তাদেরকে বারান্দাদেই থাকতে হয়।
এসব বৈধ শিক্ষার্থীর কক্ষগুলো বছরের পর বছর দখল করে আছে ছাত্রলীগের পদধারী নেতা কর্মীরা, তাদের পোষ্য কিছু বহিরাগত ক্যাডার ও কয়েক বছর আগে ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে এমন সাবেক শিক্ষার্থীরা। ফলে এসব বৈধ শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। একই সঙ্গে বৈধ শিক্ষার্থীদের রুমে ফিরিয়ে দিতে হল কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
এখনো ভালো একটি কক্ষে উঠতে না পারা আইইআর বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম এ সম্পর্কে বাংলামেইলকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার রঙিন জীবন অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে বারান্দায় থাকা। পড়া লেখা প্রায় শেষ তবুও কক্ষে থাকার সুযোগ পেলাম না। অথচ হল কর্তৃপক্ষ আমাকে বৈধ শিক্ষার্থী হিসেবে কক্ষ বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু সেই রুমে গিয়ে দেখি পলিটিক্যাল সিনিয়র ভাই থাকেন। এদিকে হল কর্তৃপক্ষ আমাকে রুমে তুলে দিতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী আবাসিক এবং দ্বৈতাবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ভাড়া বাবদ কিছু টাকা দিতে হয়। সেই হিসেবে একজন আবাসিক শিক্ষার্থী তার রুমের ভাড়া দিয়েই হলে থাকছেন। তবে এসএম হলের এ আবাসন সঙ্কট অবস্থায় রুম ভাড়া দিয়ে বারান্দায় থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক দিদার মুহাম্মদ নিজামুল ইসলাম বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমি প্রভোস্ট স্যারকে আগেই বলে দিয়েছি আপনারা শিক্ষার্থীদের যেসব কক্ষ বরাদ্দ দিবেন সেসব কক্ষে আপনাদের নিজ দায়িত্বে শিক্ষার্থীদের তুলে দিতে হবে। কারণ সিটে তুলে দেয়ার দায়িত্ব ছাত্রলীগের না। এ ক্ষেত্রে যদি কোনো ধরনে সাহায্য লাগে আমাদের পক্ষ থেকে সাধ্যমত করার চেষ্টা করবো।’
পানির সমস্যা: ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ইদানিং পানি সমস্যাও বেড়ে গেছে। বলতে গেলে নামাজের আগে শুক্রবার পানিই থাকে না। অথচ আগে কখনো এমন হয়নি। তবে কিছু শিক্ষার্থী জানিয়েছে, শুধু শুক্রবার ৪-৫ ঘণ্টা পানি থাকে না। অন্য সময় পানির কোনো সমস্যা হয় না।
হলের নান সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট মাহাবুবুল আলম জোর্য়াদ্দারের সঙ্গে একাধিক বার যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততা দেখিয়ে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
এ সম্পর্কে এস এম হলের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিব অফিসার মোহাম্মদ নূর জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সাধ্যমত হলের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয় তারপরও কিছু সমস্যা থেকে যায়। ক্যান্টিনের সমস্যা সমাধানের জন্য আজই ম্যানেজারকে ডাকবেন বলে জানান তিনি। বাংলামেইল২৪ডটকম
