Skip to content

অ্যাকর্ড ছোবলে বিপর্যস্ত গার্মেন্ট

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ‘মগ’ নয়, গার্মেন্ট খাতে যেন চলছে অ্যাকর্ড-এর মুল্লুক। ইউরোপীয় ক্রেতাদের প্রভাবশালী এই জোটের সুপারিশে (কিংবা চাপের মুখে) রাতারাতি তালা ঝুলছে কারখানায়।কিন্তু এ বিষয়ে সরকার যেন চুপ থাকারই নীতি নিয়েছে। সব মিলিয়ে এমন অরাজকতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে পুরো গার্মেন্ট শিল্পই চরম অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।

গত দুই মাস ধরে দেশব্যাপী নীরবে চলছে শত শত গার্মেন্ট বন্ধের পাঁয়তারা। এরই মধ্যে বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। কাজ হারানোর পথে আছেন আরও প্রায় পাঁচ লাখ। আর দুই বেলা খাবার জোটানো নিয়ে দারুণ টেনশনে পড়তে যাচ্ছেন প্রায় ৫০ লাখ মানুষ।

অ্যাকর্ড-এর সাম্প্রতিক দৌড়ঝাঁপ দেখে মনে হবে, পর্যবেক্ষণের নামে বিশেষ কোনো পক্ষের স্বার্থ হাসিল করার মিশন নিয়েই যেন সব কার্যক্রম চলছে। তা না হলে ন্যূনতম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া কেবল চোখের দেখাতেই একের পর এক গার্মেন্টে তালা ঝোলাতে সরকারকে ‘চাপ’ দিত না ওরা। এমনকি যে কয়টা বন্ধ হয়েছে, সেগুলোর শ্রমিকরা এখন পর্যন্ত অ্যাকর্ডের কাছ থেকে কোনও ক্ষতিপূরণও পায়নি।

ভবন নির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপ-আমেরিকান আদর্শমানগত অমিল থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে যে ভবনের আচমকা ধসে পড়ার কোনো আশঙ্কাই নেই, সেই ভবনকে অনিরাপদ ঘোষণা করে রাতারাতি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটুকু মানবিক সেটাও খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। একের পর এক কারখানা বন্ধ করে অ্যাকর্ড শ্রমিকদেরই ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত জীবনের পথে।

অ্যাকর্ডের ‘মূল্যায়ন’-এর প্রাথমিক ধাক্কাতেই চাকরি হারিয়েছে সফটেক্স-এর প্রায় পাঁচ হাজার পোশাক শ্রমিক।

বিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট আতিকুল ইসলামের মতে, ঢাকায় ১৬ গার্মেন্ট বন্ধ হওয়ায় বেকার হয়েছেন সাড়ে ১৭ হাজার শ্রমিক। এভাবে চলতে থাকলে আগামী তিন মাসে বেকার হবেন আরো ১ লাখ এবং ৫ মাসে বেকার সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

প্রশ্ন উঠছে, কিসের ভিত্তিতে এত দ্রুত কারখানাগুলোকে অনিরাপদ ঘোষণা দিয়ে চলেছে অ্যাকর্ড? পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কি ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করছে তারা?

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু কারখানা ভবন ঘুরেফিরে দেখে এবং ভবনের বাহ্যিক গঠন দেখেই ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে রায় দিয়ে চলেছে অ্যাকর্ড।

এ বিষয়ে রিভিউ কমিটিতে থাকা বুয়েটের অধ্যাপক আহসানুল কবির জানিয়েছেন, অ্যাকর্ড টিম কারখানা দেখে এসে তাদের মৌখিকভাবে তথ্য দিয়ে থাকে। ওই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তারা একটা খসড়া হিসাব তৈরি করেন।

আহসানুল কবির আরও জানান, ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে অ্যাকর্ড হাতুড়ি ছাড়া আর কোনো যন্ত্র ব্যবহার করেনি।

অবশ্য অ্যাকর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েইজ দাবি করেছেন, ভবন পরীক্ষায় তারা ফেরো স্ক্যানার ও থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন।
অপরদিকে ফেম নিটিং গার্মেন্টের মালিক ও বিজিএমইএ পরিচালক মো. মশিউল আলম সজল জানিয়েছেন, অ্যাকর্ড তার ভবনটিকে দুর্বল বলে চিহ্নিত করলেও তারা কোনো সয়েল টেস্ট করেনি। অথচ কোনো ভবনকে দুর্বল বলতে হলে সয়েল টেস্টকে অপরিহার্য বলে মনে করেন রাজউকের কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান।

অপরদিকে, একই খবরে জানা যায়, অ্যাকর্ড তাদের ভবন পরীক্ষার কারিগরি দিকগুলো রিভিউ কমিটির কাছেও ব্যাখ্যা করেনি। কিছু ক্ষেত্রে রিভিউ কমিটি বন্ধের ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে রাজি না থাকলেও অ্যাকর্ড তাদের ‘চাপ’ দিয়ে রাজি করায়।

গত মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাকর্ডের নির্বাহী পরিচালক রব ওয়েজ বলেন, কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হোক, তা আমরা চাই না। আর অ্যাকর্ড যা করছে তা বৈজ্ঞানিকভাবেই করছে।

পরিদর্শন শুরু হলেও কারখানা স্থানান্তর, সংস্কারের সময় শ্রমিকদের মজুরি প্রদান, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামসহ অন্যান্য ব্যয়ভার বহন করার জন্য বড় ধরনের তহবিল দরকার। এক্ষেত্রে জাইকা ১০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। তবে তা যথেষ্ট নয়। আমেরিকান ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স গার্মেন্ট মালিকপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকলেও অ্যাকর্ড এ পর্যন্ত কাউকে ক্ষতিপূরণ দেয়নি। আর তাই ক্রেতা-সদস্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মিলিয়ন ডলারের তহবিল দিয়ে কী হবে তাও পরিষ্কার নয়। ওই অর্থ বন্ধ গার্মেন্ট মালিকদের হাতে যাবে কিনা সেটাও স্পষ্ট করেনি অ্যাকর্ড।

মার্চের শুরুতে সফটেক্স-এর একটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে এ বিতর্ক চাঙ্গা হয়ে ওঠে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিকের বেতন দিতে প্রায় ১০ কোটি টাকা প্রয়োজন সফটেক্স-এর। এ টাকা কে দেবে তা এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

যদিও অ্যাকর্ড বলছে, চুক্তি অনুযায়ী শ্রমিকদের মজুরি মালিককেই দিতে হবে।

তবে মালিকরা জানিয়েছেন, উৎপাদন বন্ধ রেখে এ অর্থ দেওয়ার সামর্থ তাদের নেই। এ বিষয়ে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী সরাসরি অ্যাকর্ড-এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও সরকারের তরফ থেকে বিশেষ কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

আমেরিকান জোট অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও আইন বিবেচনায় কাজ করলেও অ্যাকর্ড তা একেবারেই মানছে না। এছাড়া আমেরিকান ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্সের কমিটি দেশীয় প্রকৌশলীদের রাখলেও অ্যাকর্ড তা করেনি। তা ছাড়া, বড় ধরনের কোনো পরীক্ষক দল ছাড়াই প্রতিমাসে প্রায় আড়াইশ’ গার্মেন্ট কারখানা কীভাবে পরীক্ষা করে একের পর এক সিদ্ধান্ত জানাল, সে বিষয়টাও রয়ে গেছে ধোঁয়াটে। আবার পরীক্ষক টিমে বুয়েটের প্রকৌশলীদের রাখার সুপারিশ করা হলেও অ্যাকর্ড তাতে কান দেয়নি। জোটগুলো ইউরোপীয় প্রকৌশলীদের দিয়েই পর্যবেক্ষণের কাজ সারছে।

তবে অ্যাকর্ড বলেছে, যেসব কারখানা স্থানান্তরে তিন মাসের বেশি সময় লাগবে ওইসব কারখানার নির্মাণ ও স্থানান্তরে তারা সহযোগিতা করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নামমাত্র পর্যবেক্ষণ করে কোনো কারখানা বন্ধ করে দেওয়াটা একদিকে যেমন হাস্যকর, তেমনি অবৈধও। কেননা, বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী- এভাবে চোখের দেখা দেখে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার নেই। আইনানুযায়ী যেখানে এ ধরনের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত কেবল সরকারের প্রধান পরিদর্শক বা তার সহকারী বা ডেপুটি পরিদর্শক দিতে পারেন সেখানে দেশীয় পর্যবেক্ষক তো দূরের কথা, নিজেদের মতো গুছিয়ে ‘কোনো এক পক্ষ’র হয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে চলেছে একটি বিদেশি জোট! বাংলাদেশের শ্রমিকদের স্বার্থের কথা বলেই কারখানা বন্ধের সুপারিশ করে যাচ্ছে অ্যাকর্ড। অথচ পাঁচ লাখ শ্রমিক ও তাদের ওপর নির্ভর করে থাকা ৫০ লাখ মানুষ নিয়ে বিদেশি প্রকৌশলী ও কর্তাব্যক্তিরা কী আদৌ চিন্তিত? বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫