বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দিয়ে ‘একশ ভাগ প্রিজারভেটিভমুক্ত’ ও ‘মানবদেহের জন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদান নেই’ বলে ঘোষণা দেয় হাসেম ফুড প্রডাক্টসের পণ্য সেজান জুসের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান সজীব কর্পোরেশন।
কিন্তু সায়েন্স ল্যাবরেটরির ল্যাব টেস্টে স্বাভাবিকের চেয়েও মাত্রাতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ও ক্ষতিকর ফরমালিন পাওয়া গেছে সেজান জুসে।
বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত সঙ্গত কারণেই ভোক্তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর সেজান-পণ্যের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে সজীব কর্পোরেশনকে। তবে অপরাধ স্বীকার করে নি:শর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করায় আদালত এক লাখ টাকা জরিমানা করে এযাত্রা রেহাই দিয়েছেন সজীব কর্পোরেশন ও হাসেম ফুড প্রডাক্টসের মালিক আবুল হাসেমকে।
২৯ মে বৃহস্পতিবার বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আব্দুল হালিম এই রায় দেন। এ সময় বিবাদী আবুল হাসেম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সায়েন্স ল্যাবরেটরির ল্যাব টেস্টে সেজান জুসে সোডিয়াম বেনজেট নামের প্রিজারভেটিভ পাওয়া যায় ১৪৬.০ ভাগ ও এরই সাথে ছিল মারাত্মক মাত্রায় ফরমালিন।
এছাড়াও সজীব কর্পোরেশনের রেডিমিক্স মামলায়ও এদিন রায় দেন আদালত। এ মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ক্ষতিকর পণ্য বাজারজাত করা ও উৎপাদন বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ায় শাস্তি কমিয়ে দেয় আদালত।
উল্লেখ্য ‘সেজানদ ব্র্যান্ডের বাজারজাতকারী সংস্থা সজীব করপোরেশন সজীব রেডিমিক্স রসগোল্ল ’ নামে যে পণ্যটি বাজারজাত করছে, তা আসলে রসগোল্লাই নয়।পরীক্ষাগারে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রাসায়নিক পরীক্ষার পর এ ঘোষণা দেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এই খাদ্যপণ্যটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এপণ্যে ভয়াবহ মাত্রার ক্ষতিকর উপাদান বিদ্যমান থাকায় তা বাজার থেকে তুলে নিতে মত দেওয়া হয়েছে।
পণ্যটি উৎপাদনের জন্য সজীব করপোরেশনের বিরুদ্ধে দেশের একমাত্র বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা দায়ের করে ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ।
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) অঞ্চল-১-এর স্বাস্থ্য বিভাগের নমুনা সংগ্রহকারী কুটি মিয়া সজীব রেডিমিক্স রসগোল্লার নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর সংগৃহীত নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য ডিসিসির জনস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়।
প্রধান পাবলিক অ্যানালিস্ট সারোয়ার হোসেন রাসায়নিক পরীক্ষার পর ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তাতে দেখা যায়, এ রসগোল্লায় আর্দ্রতা আছে মাত্র ৪ দশমিক ১৭ শতাংশ। ল্যাকটিক অ্যাসিডের অম্লতা শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ। এছাড়া রসগোল্লায় দুগ্ধ-চর্বির পরিমাণ ১০ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও এতে পাওয়া গেছে ২৪ দশমিক শূন্য শতাংশ। এছাড়া এ পণ্যে কঠিন বস্তুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৯৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
এ পরীক্ষার পর পাবলিক অ্যানালিস্ট তার প্রতিবেদনে লেখেন, ‘এটা রসগোল্লার নিজস্ব স্বাদ, গন্ধ ও আকৃতি থেকে ভিন্ন। এটা শুকনো পাউডার জাতীয় খাদ্যদ্রব্য; রসগোল্লা নয়।’
মামলার নথিতে দেখা যায়, নমুনা আটক করা হয় গত ২৯ মার্চ। ল্যাবে পরীক্ষার পর পাবলিক অ্যানালিস্ট ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগে প্রতিবেদন দাখিল করেন ৫ এপ্রিল। এরপর ৫ মে ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের ফুড অ্যান্ড স্যানিটারি পরিদর্শক কামরুল হাসান বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করেন। মামলানম্বর বি. শু. আ. ১৩৬/২০১২।
এরপর স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা ইউপিএইচসিএসডিপির সহকারী পরিচালক (পাবলিক হেলথ) ডা. সমীর কান্তি সরকার অধিকতর পরীক্ষা করে প্রতিবেদন তৈরি করেন। এতে তিনি লেখেন, ‘অতিরিক্ত চর্বির কারণে শরীরে অতিরিক্ত মেদ জমতে পারে, এই রসগোল্লা গ্রহণকারী ব্যক্তি অতিরিক্ত মোটা হয়ে যেতে পারেন, রক্তে চর্বি ও কোলেস্টরেলের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।দ
সজীবের ভেজাল হট টমেটো সস এখনো বাজারে:
ভেজাল টমেটো সস বাজারজাত করার জন্য সজীব কর্পোরেশনের নামে ২০১১ সালের মাঝামাঝি একটি মামলা দায়ের হয় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে। পরীক্ষণাগারে ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় কোম্পানিটি আদালতে মুচলেকা ও জরিমানা দিয়ে পার পায় কিছুদিন আগে।
এরপরও সজীব হট টমেটো সসের মানোন্নয়ন করেনি কোম্পানিটি। উপরন্তু ভেজাল সস বাজারজাত করে যাচ্ছে আগের মতোই। নতুন পরীক্ষায়ও এ পণ্যটি ভেজাল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
আদালতের নথিতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল শ্যামপুর বাজারের সৈকত ট্রেডার্স নামক এক প্রতিষ্ঠান থেকে সজীব হট টমেটো সস জব্দ করেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নমুনা সংগ্রহকারী নাজিম উদ্দিন। ওইদিনই তিনি জব্দ সজীব হট টমেটো সস পরীক্ষণাগারে রাসয়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠান।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের জনস্বাস্থ্য পরীক্ষণাগারে পরীক্ষার পর পাবলিক অ্যানালিস্ট সারোয়ার হেসেন ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগে পরীক্ষাণাগারের প্রতিবেদন জমা দেন একই মাসের ২৬ তারিখে। পরীক্ষণাগারে সজীব টমেটো সস ভেজাল প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।
এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ফুড অ্যান্ড স্যানেটারি ইন্সপেক্টর কামরুল হাসান বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে সজীব হট টমেটো সসের উৎপাদক, মোড়কজাতকারক, বাজারজাতকারী ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সজীব কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলানম্বর বি. খা. আ. ৮১/২০১১।
পাবলিক প্রসিকিউটর কামরুল হাসান আদালতে উল্লেখ করেন জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করে সজীব কর্পোরেশন বিশুদ্ধ খাদ্য আইন ১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫) এর ৬ এর (১) ও (৭) ধারা লঙ্ঘন করেছে। এই কাজ ৪৪ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মামলার আসামি করা হয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (উৎপাদন) বেল্লাল হোসেন, ঠিকানা ২ ইন্দিরা রোড ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড প্রডাক্টসের মালিক আবুল হাসেম, ঠিকানা ২ ইন্দিরা রোড, তেজগাঁওকে।
পাবলিক এনালিস্ট তার পরীক্ষণাগার-প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, সজীব কর্পোরেশনের সজীব হট টমেটো সসে এসিটিক অম্লতা হিসেবে পাওয়া গেছে কমপক্ষে ১.২ ভাগের স্থলে শূন্য দশমিক ৪৪ ভাগ।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ দ্রবণীয় কঠিন বস্তু পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ২৫ ভাগের স্থলে ৩১ দশমিক ৫ ভাগ। যা ১০৬৭ সালের বিশুদ্ধ খাদ্য রুলস অনুযায়ী কারখানা থেকেই বের হয়েছে সম্পূর্ণ ভেজাল হিসেবে।
তিনি বলেন, এ ধরনের সস জনস্বাস্থ্যের জন্য কেবল হুমকিই নয়, নানা জটিল রোগের কারণও। এরপর আদালত আসামিদের আদালতে তলব করে। আসামিরা কিছুদিন আগে আদালতে এসে মুচলেকা দিয়ে ভেজাল পণ্য বাজার থেকে তুলে নেওয়ার এবং পণ্যের মানোন্নয়নের অঙ্গীকার করে জরিমানা গুনে রেহাই পায়।
এরপর আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে চূড়ান্ত সতর্ক করে দেয়।
কিন্তু এরপরও ভেজাল সস বাজার থেকে তুলে নেয়নি সজীব কর্পোরেশন। করেনি ভেজাল সসের মানোন্নয়নও।
ডিসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের মতে এ মাসেই ডিসিসির নমুনা সংগ্রহকারীর মাধ্যমে জব্দ আরো একটি সস পরীক্ষা করে একই নমুনা পাওয়া গেছে।
এই মামলা দায়ের হওয়ার পর বাংলানিউজ কথা বলে প্রতিষ্ঠানের মালিক আবুল হাসেমের সঙ্গে। খাদ্যপণ্যে ভেজাল থাকার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি সে-সময় বলেছিলেন, বাংলাদেশে ভেজালের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। একেক ধরনের পণ্যে একেক ধরনের এলিমেন্ট পাওয়া যায়। এমনকি আমরা যে চিনি ব্যবহার করি সেখানেও রয়েছে উপাদানের হারে বিভিন্নতা। একেক ব্যাচের চিনির মিষ্টতা একেক রকম। আমাদের একটি একক (স্ট্যান্ডার্ড)মান ঠিক করে দিলে আমরা তা মেনে চলতে পারি। তাছাড়া বিএসটিআই, ডিসিসি ও সায়েন্স ল্যাবের এক এক ধরনের মান সম্পর্কে ধারণাও বিভ্রান্তিকর।
অথচ এবার আদালতে গিয়ে তিনি ঠিকই অপরাধ স্বীকার করে নিলেন।
রায় ঘোষণার পর সজীব কর্পোরেশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।প্রতিবারই সংশ্লিষ্টদের সেলফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
