Skip to content

মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি, সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা দুর্নীতিবাজ কাস্টম কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে এসব অবৈধ মালামাল নিয়ে আসছে দেশে।

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণ ও সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই প্রতিদিন মিথ্যা ঘোষণায় আসছে শত শত কোটি টাকার পণ্য।

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউসের ঘুষখেকো-দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়মিত কোটি কোটি টাকায় আপসরফায় মালামাল খালাস করা হচ্ছে।

তাদের এ ঘুষ-বাণিজ্যের ফলে বছর শেষে এসব পণ্যের আমদানিকারকরা সরকারের প্রাপ্য হাজার হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ এসব দেখেও না দেখার ভান করছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোনো ধরনের ব্যবস্থা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে চার প্রক্রিয়ায় শুল্ক ফাঁকির মহোৎসব চলছে। প্রথমটি হলো পণ্যমূল্যে ফাঁকি। অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম-বেশি প্রদর্শন করা। দ্বিতীয় প্রক্রিয়া হলো পণ্যের গুণগত মান নিয়ে জালিয়াতি। তৃতীয় প্রক্রিয়া হলো পরিমাণ ও ওজনে কম দেখানো। আর চতুর্থ প্রক্রিয়া পণ্যের এইচএস কোড জালিয়াতি। তবে এ সবই ঘটে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে আনা আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে।

কিন্তু এসব পণ্যের অনিয়ম ও মিথ্যা ঘোষণার চালান আটক করতে গেলে চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ ও কাস্টমসের কিছু অসৎ কর্মকর্তা বাদ সাধেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা আবার কাস্টম কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে হইচই করেন। স্বার্থ আদায়ে কখনো কখনো ধর্মঘটেরও ডাক দিয়ে বসেন তারা।

দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে কাস্টমসের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মাসুদ সাদিক বলেন, চট্টগ্রাম কাস্টমসে আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে চার হাজারেরও বেশি বিল অব এন্ট্রি করা হচ্ছে। তার মধ্যে আমদানিতে এক হাজার, আর রপ্তানিতে তিন হাজার বিল অব এন্ট্রি হচ্ছে। আমদানিতে গড়ে প্রতিদিন শতকরা তিন ভাগ বিল অব এন্ট্রিতে অনিয়ম পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের সঙ্গে আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমসের লোকজন জড়িত রয়েছে।

তিনি বলেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি কাস্টমসের যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক এম এ সালাম বলেন, ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম সবখানেই রয়েছে। কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না, তারা দুর্নীতি করেন না। আগে পণ্য চালান শুল্কায়নে কাস্টমসের ৬৫টি টেবিলে যেতে হতো। এখন যেতে হয় ২২টি টেবিলে। তিনি শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজীকরণের দাবি জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসা বাণিজ্যিক পণ্যের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পণ্যে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটে। বছর শেষে কয়েক হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি হচ্ছে। এ শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে কাস্টম কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, বন্দরের নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় প্রভাবশালী অসৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জড়িত বলে জানা গেছে। প্রতিদিনই সেখানে অনিয়ম ও মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য ধরা পড়ে।

গত এপ্রিলে মিথ্যা ঘোষণা ও অনিয়মের এ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধায় আনা শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেই বেশি অনিয়ম ও মিথ্যা ঘোষণার আশ্রয় নিয়েছেন এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এ ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িত রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্প মালিকরা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন- এমন শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামে কাজ করতে গেলে অনেক কিছুই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে থেকেই করতে হয়। সে ক্ষেত্রে সৎ কর্মকর্তারা পড়ে যান বিপদে। তবে সব কথার শেষ কথা, কাস্টমস যেখানেই আপস করে, সেখানেই দুর্নীতি হয়। কাস্টম দুর্নীতি না করলে কারো সাধ্য নেই মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করবে।

ওই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা আরো বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা নমনীয় না হলে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটবে না। অনিয়মের সঙ্গে কাস্টমস ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়ন করে বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি নিতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পদে পদে হয়রানি আর ঘুষ-বাণিজ্য ছড়িয়ে পড়ায় আমদানি-রপ্তানিকারকরা তাদের সামগ্রী নিয়ে বিপাকে পড়ছেন হরহামেশাই।

দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ায় প্রকৃত ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা হয়রানির পাশাপাশি চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। তা ছাড়া সংঘবদ্ধ অসাধু চক্র ও দুর্নীতিবাজদের সহায়তায় শত শত কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকির ঘটনাও ঘটছে। সাম্প্রতিককালে এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা।

পণ্য চালান আটকে রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে সময়ক্ষেপণ করার অভিযোগে ভুক্তভোগী এক ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার-১ নেয়াজুর রহমান বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

এর আগে আরেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ এনে কাজ বন্ধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট কর্মচারীরা। পরে ওই ঘটনায় কাস্টম কর্তৃপক্ষ দুঃখও প্রকাশ করেছে।

অভিযোগে জানা গেছে, কাস্টমসের নিলাম শাখায় টেন্ডার সেল ০১/১৪, ক্যাটালগ ক্রমিক নম্বর-৮১-এর রিজার্ভ মূল্যের সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ বিড মূল্য প্রদানের পরও পণ্য খালাসের অনুমোদন মেলেনি। বিডার মোহাম্মদ ইকবালের অভিযোগে জানা গেছে, নিলাম শাখার সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার সোহরাব হোসেন মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার ফয়সাল মুরাদের বিরুদ্ধেও ঘুষ দাবি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীরা। এ নিয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কর্মচারীদের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে।

অপরদিকে আরেকটি অভিযোগে জানা গেছে, কাস্টমসের নিলাম শাখায় টেন্ডার সেল ০৭/১৩, ক্যাটালগ নম্বর-২৮ ক্যাপিটাল মেশিনারি নিলামে অনুমোদন মেলার পরও ঘুষ না দেওয়ায় দীর্ঘ সাত মাস পর্যন্ত খালাস নেওয়া যাচ্ছে না।

জানা গেছে, কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা একের পর এক আইনি মারপ্যাঁচ দেখিয়ে আমদানি চালান খালাসকে বিলম্বিত করার ঘটনা অহরহ ঘটাচ্ছেন। এ যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। অবশ্য ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে অ্যাসাইকুডা নামে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বসালেও তার অপব্যবহারও শুরু হয়ে গেছে।

অভিযোগ আছে, কম্পিউটার সার্ভার থেকে ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে ছাড়পত্র বের করে বন্দর থেকে বহু মূল্যবান পণ্য চালান পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ধরা পড়লেও কাস্টম কর্মকর্তারা জড়িত থাকায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫