বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ১০ থেকে ১২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে রাজধানীর রাজপথ। সৃষ্টি হচ্ছে যানজট আর জনদুর্ভোগ। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর নগরবাসী এমন দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছেন। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিল থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, নিচু এলাকা মুগদা, মানিকনগর, বাসাবো, সর্বত্র প্রায় একই অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। ভরা বর্ষায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করেছেন নগরবাসী। তবে এর থেকে নিস্তার পাওয়ার আপাতত কোন উপায় নেই বলে জানিয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, রাজধানীর পানি নিষ্কাশনের বিভিন্ন খাল ও নিম্নাঞ্চল ভরাট এবং দখল হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পাম্পিং করা ছাড়া স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পানি সরে যাওয়ার কোন পথ নেই। এভাবে পানি সরাতে গিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
নগরীতে ওয়াসার পানি নিষ্কাশনের ২৯০ কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে। তা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ মিলিমিটার বৃষ্টির পানি ধারণ করতে পারে। অথচ বর্ষা মওসুমের শুরুতেই এখন প্রতিদিন গড়ে ১৮ থেকে ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হচ্ছে। আর এই সীমিত বৃষ্টিতে রাজধানীর অনেক এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীর। সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে এই সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এছাড়াও প্রতিবছর কার্পেটিং করার কারণে বেশির ভাগ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উঁচু হচ্ছে। অন্যদিকে বাসাবাড়িগুলো নিচু হচ্ছে। এছাড়া, জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে রাজধানীর অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজকে দায়ী করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীবাসীর দুর্দশা আরও বাড়বে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবদুল আলিম জানান, গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীতে ১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। দুপুরের পর থেকে নগরীতে মোট ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। আর তাতেই ঢাকার অনেক এলাকায় পানি জমে যায়।
আবহাওয়া অফিসের হিসাবে আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রতিদিনই গড়ে সারা দেশে এখন ৭/৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও ৩০ থেকে ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় ও আশেপাশের এলাকাতে এবার যে পরিমাণ বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে তা অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি বলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান। গতকালের ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর মতিঝিল, আরামবাগ, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, শ্যামপুর, জুরাইন, ডেমরা, পোস্তগোলা, ফরিদাবাদ, মিরপুরের রোকেয়া সরণি, আজিমপুরের নিউ পল্টন, মানিকনগরসহ নিচু এলাকাগুলোতে এক থেকে দেড় ফুট পানি জমে যায়। এছাড়াও রামপুরা, বাসাবো, গোড়ান, হাজারীবাগ, ঝিগাতলা, নিমতলী, আশেক লেন, আলাউদ্দিন রোড, নাজিমউদ্দিন রোড, বকশিবাজার, মিরপুর কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, শুক্রাবাদ, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, গুলশান-বারিধারা-বাড্ডা ও রায়সাহেব বাজার, মৈশু-ি, লক্ষ্মীবাজার, নারিন্দা, নয়াবাজার, মিটফোর্ড, লালবাগ, গে-ারিয়াসহ পুরান ঢাকার বেশকিছু এলাকা পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। জমে যাওয়া পানি ২/৩ ঘণ্টা এমনকি কোথাও কোথাও আরও অধিক সময় স্থায়ী হচ্ছে। এ কারণে নগরবাসী পড়েছেন চরম দুর্ভোগে। রাতভর বৃষ্টির পর গতকাল সকালে কথা হয় রাজধানীর ফকিরেরপুলের পানির ট্যাংকের সামনে কাজের সন্ধানে অপেক্ষমাণ কয়েকজন ভ্যানচালকের সঙ্গে। তারা জানালেন মাসিক চুক্তিতে মালিকদের কাছ থেকে ভ্যান ভাড়া নেয়া হয়। তবে সামান্য বৃষ্টি হলেই আর কোন কাজ পান না। কারণ পুরো রাজধানীর চিত্র তখন উল্টো হয়ে যায়।
রাস্তাঘাটের অবস্থা দেখে মনে হবে এ যেন ছোটখাট খাল কিংবা নদী। নৌকা ভাসিয়ে দিলে তাও চলবে। নিজের ভ্যানগাড়িটির সিটে বসে থাকা চালক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা শহর এখন আর আমাদের উপযোগী নয়। বর্ষা এলেই রিকশা-ভ্যানের পরিবর্তে নৌকা চালানো যাবে। তাছাড়া, রাস্তার মধ্যে রয়েছে ছোট-বড় ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ও গর্ত। এর ওপরে পানি জমে থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তাই মালামাল আনা-নেয়ায় কেউ আমাদেরকে কাজে লাগান না। ‘তিনি ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল ও রাস্তা সংস্কারের দাবি জানান। এদিকে পুরানা ঢাকার বনগ্রাম, শশীমোহন বসাক লেন, উত্তর মৈশু-ি, লালবাগ, সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী, ধলপুর এবং হাজারীবাগের অনেক রাস্তারও ঠিক একই অবস্থা। গুলশান-শাহজাদপুরের কিছু রাস্তায়ও পানি জমেছে।
স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রীরাও বিপাকে পড়ে। অনেকে হাঁটু পানি ভেঙে গন্তব্যে পৌঁছান। মানিকনগরের নিচু এলাকায় বস্তি আদলে গড়ে তোলা টিনশেড বাড়িগুলোতে পানি ঢোকে। দুর্ভোগ বাড়ে দরিদ্র মানুষের। ভুক্তভোগীরা জানান, পানি জমে যাওয়ার কারণে নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা দৈনন্দিন জীবনধারণে নানা দুর্দশায় পড়েছেন। জলজটের সঙ্গে রয়েছে যানজট। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে অনেক গাড়ি রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে।
এ কারণে বেড়েছে যানজট। বিভিন্ন অঞ্চলের প্রধান সড়কসহ অলিগলিও ডুবে গেছে। অপ্রতুল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি নামছে না। রমজানের আগে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সঙ্কট ঘনীভূত হবে বলে জানান তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় ওয়াসা ও ডিসিসি’র ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ডিসিসি ও ওয়াসার কাজে সমন্বয়হীনতা ও ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। দুই ডিসিসি বলতে গেলে অভিভাবকহীন। এমনকি ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এখনও ভালভাবে পানি নিষ্কাশন পাম্প স্থাপন করেনি। কল্যাণপুর ও নারিন্দায় ওয়াসার স্থায়ী নিষ্কাশন কেন্দ্র রয়েছে। বর্ষা আসার আগে সব ধরনের নর্দমা ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং খালগুলো পুরোপুরি খনন করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে ভরা বর্ষায় পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, রাজধানীর রাস্তাগুলোর দুই ধারে ডিসিসি’র ভূ-উপরিস্থ প্রায় আড়াই হাজার নর্দমার বেশির ভাগ অংশই ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় নি। এ কারণে ওয়াসার নিষ্কাশন নালা-নর্দমাও ভরাট হয়ে পানি জমে যাচ্ছে। বেশির ভাগ এলাকার নর্দমায় পলিথিন, জালি ও অন্যান্য বর্জ্য জমছে। ডিসিসি সময়মতো সেগুলো পরিষ্কার না করায় ওয়াসার ভূগর্ভস্থ নর্দমায় গিয়ে পড়ছে। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনায় তারা সজাগ ও তৎপর আছেন। তবে পানি নিষ্কাশনের পথ দখল মুক্ত না করে কোনভাবেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
