বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এরপরও কিছু কিছু ব্যাংকের নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আর এ সঙ্কট মেটাতে গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক সাত বাণিজ্যিক ব্যাংককে ধার দিয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরো একটি ব্যাংককে ৩০ কোটি টাকা ধার দেয়া হয়েছে সোয়া ১০ শতাংশ সুদে।
বলা চলে ব্যাংকিং খাতে এখন অলস টাকার পাহাড় রয়েছে। এর মধ্যে নগদ টাকার সঙ্কট হওয়ার কারণ কী এমন এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতে যে উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে তার বেশির ভাগই সরকারের ঋণ আকারে রয়েছে। বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যে ব্যাংকগুলো সরকারের বাধ্যতামূলকভাবে ঋণের জোগান দিয়েছে। সরকার তার ঋণের বিপরীতে বন্ড ও বিল নামক ব্যাংকগুলোকে কাগুজে মুদ্রা ধরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে নেয়া ঋণের বেশির ভাগই দীর্ঘ মেয়াদে নিয়েছে। সরকারের দেয়া দীর্ঘ মেয়াদের বন্ড নগদায়ন করার মতো তেমন কোনো কার্যকর পদ্ধতি নেই। সেকেন্ডারি বন্ড মার্কেট নামে আছে। এর ফলে নগদ অর্থের সঙ্কটে পড়া বেশির ভাগ ব্যাংকই সরকারের ঋণের জোগান দিতে গিয়ে বিপদে পড়েছে।
এ দিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে ব্যাংকগুলোর বাধ্যতামূলক বিধিবদ্ধ নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণ করতে হয় প্রতিদিন। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কাছ থেকে ১০০ টাকার আমানত সংগ্রহ করলে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে প্রতি দিন ৬ টাকা এবং ১৫ দিন অন্তর সাড়ে ৬ টাকা সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো দিন সিআরআর সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জরিমানা গুনতে হয়। আর এ জরিমানা এড়ানোর জন্যই কোনো কোনো ব্যাংকের নগদ টাকার সঙ্কটে পড়তে দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোকে বিশেষ তারল্য সহায়তার আওতায় তিন দিনের জন্য ব্যাংকগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী ধার দিয়ে থাকে। এ কারণেই মূলত কোনো কোনো ব্যাংক মাস শেষে বা মাসের মাঝখানে সিআরআর সংরক্ষণ করতে গিয়ে নগদ টাকার সঙ্কটে পড়ে।
কয়েক ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপকদের সাথে গতকাল আলাপ করে জানা গেছে, মারাত্মক নগদ টাকার সঙ্কটে পড়েছে কোনো কোনো ব্যাংক। নগদ টাকার সঙ্কটের কারণে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে পারছে না অনেক ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতের এ পরিস্থিতির জন্য ব্যাংকাররা চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের বেশি মাত্রায় ব্যাংক ঋণ নেয়াকে দায়ী করছেন। চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কারণে ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক আমানত কমে গেছে। কিন্তু ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যয় কমেনি। বরং ক্ষেত্রবিশেষ বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, এক দিকে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে আমানত বাড়ছে না। কেননা, বিনিয়োগ স্থবিরতার মাঝে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমিয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আসায় ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যান মতে, গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সরকারের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১৩ গুণ। গত ১১ মাসে সঞ্চয়পত্রে সুদ ব্যয় বাদে নিট বিনিয়োগ হয়েছে ১০ হাজার ১৮ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৭৩৫ কোটি টাকা। ব্যাংকের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সঞ্চয়পত্রে মুনাফা বেশি হওয়ায় আমানতকারীরা ছুটছে এখন সঞ্চয়পত্রের দিকে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, এক দিকে আমানতের পরিমাণ কমে গেছে, পাশাপাশি সরকারের ঋণের জোগান দিতে হচ্ছে। সব মিলে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
সরকারের ঋণের জোগান দেয়, এমন একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, সরকারের সাথে চুক্তির মারপ্যাঁচে সরকারকে বাধ্যতামূলক ঋণের জোগান দিতে হচ্ছে। কিন্তু বিনিময়ে সরকার ব্যাংকগুলোকে বন্ড নামক কাগুজে মুদ্রা ধরিয়ে দিচ্ছে। এসব বন্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে তারল্য বলে গণ্য হচ্ছে। সাধারণত, ট্রেজাারি বিল ও বন্ড দিয়ে আমানতের বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে বাধ্যতামূলক বিধিবদ্ধ তহবিল (এসএলআর) সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু মোট আমানতের বিপরীতে যে পরিমাণ এসএলআর সংরক্ষণ করার কথা ছিল, ব্যাংকগুলোর হাতে তার চেয়েও বেশি পরিমাণ ট্রেজারি বিল ও বন্ড রয়েছে। এসব বিল ও বন্ড নগদায়ন করতে না পারায় তারা নগদ টাকার সঙ্কটে পড়েছেন।
অন্য এক এমডি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যের বরাদ দিয়ে জানিয়েছেন, গত মে মাস শেষে ব্যাংকগুলোর হাতে এ রকম বন্ড রয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে উদ্বৃত্ত তারল্য হিসেবে দেখাতে হচ্ছে। এসব কাগুজে তারল্য ব্যাংকগুলোর কোনো কাজে আসছে না, বরং বিনিয়োগকে সঙ্কুচিত করে ফেলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত মে মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আমানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর ৭০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে দুই লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে ব্যাংকগুলোর নগদ হিসাবে রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। আর ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। উদ্বৃত্ত তারল্যের বাকি প্রায় এক লাখ কোটি টাকাই রয়েছে বিল ও বন্ড আকারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণের জন্য বিশেষ করে মাসের শেষ ও মাঝে তার ব্যাংক গ্রাহকদের বড় অঙ্কের কোনো চাহিদা মেটাতে পারছেন না। কারণ হিসেবে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর জন্য যে পরিমাণ নগদ টাকা হাতে থাকার কথা তা থাকছে না।
বাধ্য হয়ে অনেক ব্যাংক কলমানি মার্কেটের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নিচ্ছে। হাত পাতছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব বিল ও বন্ড বন্ধক রেখে মাত্র তিন দিনের জন্য ধার দিচ্ছে। এতে সাড়ে সাত শতাংশ থেকে সোয়া ১০ শতাংশ সুদ গুনতে হচ্ছে।
দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, বর্তমান সময়ের মতো ব্যাংকিং খাতের এমন দুরাবস্থা অতীতে কখনো হয়নি। ব্যাংকের মূল আয় হলো বিনিয়োগ। ব্যাংকগুলো কম সুদে আমানত নিয়ে বেশি সুদে বিনিয়োগ করে থাকে। ঋণ ও আমানতের সুদের হারের ব্যবধানই হলো ব্যাংকের মুনাফা। এ মুনাফা দিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের পরিচালন ব্যয় অর্থাৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, পানি, ভবনভাড়াসহ যাবতীয় ব্যয় মিটিয়ে থাকে। পরিচালন ব্যয় মেটানো পর অবশিষ্ট অর্থ সরকারের ট্যাক্স পরিশোধের পর শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করে থাকে। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ মন্দা চলছে। ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। ব্যাংকগুলো লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নানা পন্থা অবলম্বন করছেন। কেউ বা খেলাপি ঋণ কমাতে ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে খেলাপি ঋণ পরিশোধ করছেন। আবার ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ নবায়ন করা হচ্ছে। গত ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকতো রীতিমতো এ ধরনের নীতিমালাই শিথিল করেছিল, যা গত ৩০ জুনে শেষ হয়েছে। ওই এমডি জানিয়েছেন, অনেক ব্যাংকই এখন কাগজ নির্ভর হয়ে পড়ছে। কাগজে কলমে ঋণ আদায় হচ্ছে। বাস্তবে ভিন্ন চিত্র। এর ওপর সরকারি ব্যাংক থেকে জালজালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াতো অব্যাহত রয়েছেই। হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারির পর হালে বেসিক ব্যাংক থেকে চার হাজার কোটি টাকার ওপরে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ধরা পড়েছে।
ওই এমডির মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতের এমন দুরাবস্থা অতীতে আর কখনো ঘটেনি। তিনি বলেছেন, শক্ত ভিতের ওপর গড়ে উঠা দেশের ব্যাংকিং খাতের এসব ধকল সহ্য করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নতি না হলে সামনে কী হবে তা বলাই মুশকিল। কেননা, ইতোমধ্যেই আমানতের সুদ কমে যাওয়ায় আমানতকারীরা তাদের অর্থ তুলে নিচ্ছে। বেশি লাভের আশায় সরকারের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। ফলে ব্যাংকে কমে যাচ্ছে আমানতের পরিমাণ।
বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে সঙ্কট চলছে, এটি অব্যাহত থাকলে সামনে ব্যাংকিং খাতের জন্য দুর্দিন বয়ে আনবে। কেননা, ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিআরআর হার বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্য দিকে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নিচ্ছে। সব মিলে আগামীতে ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে যাবে। আর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে গেলে বছর শেষে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে। এটি অর্থনীতিতের জন্য মোটেও সুখকর হবে না।
আড়াই হাজার কোটি টাকা ধার করল সাত ব্যাংক
আপডেট :August 3, 2014
0
সম্পর্কিত আরও সংবাদ
সাম্প্রতিক সংবাদ
আর্কাইব
প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার
ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।
সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫
