বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ বার বার সুপারিশ তৈরি হয়। কিন্তু আদেশ জারি হয় না। কেনো হয় না তার উত্তর নেই। আর তা জানতে চাওয়ার ক্ষমতাও নেই আমাদের। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। জন প্রশাসন যেনো নিজেদের প্রশাসন, জনগণের নয়। তাই এক চেয়ারে কেটে যাচ্ছে ১৮ বছর।
এক ঘনিষ্ঠ জনের কাছে এভাবেই নিজের অনুভূতি আর কষ্টের কথাগুলো বলছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা। সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের শাপলা ক্যান্টিনের সাংবাদকর্মীদের ছেড়ে যাওয়া টেবিলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কথাগুলো বলতে থাকেন ওই কর্মকর্তা।
কারোর দিকে খেয়াল নেই যেনো। চায়ে চুমুক দিয়ে উদাসভাবে তাকিয়ে থাকেন কয়েক মুহূর্ত।
আবার বলতে থাকেন ‘দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে চাকরি শুরু করি ১৯৯০ সালে। চার বছর পর একবার পদোন্নতি পাই। এরপর আমি এক পদে চাকরি করছি ১৮ বছর। আর সচিবালয়ের প্রথম শ্রেণির অন্যান্য নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ থাকায় অনেকেই উপসচিব হয়েছেন। আর তাদের যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
এরপর কয়েক মুহূর্ত থেমে থাকলেন মো. মোন্নাফ নামের ওই কর্মকর্তা। আবারো চায়ে চুমুক দিলেন। এরপর উদাস চোখে চাইলেন জানালার দিকে।
হঠাৎ সংবাদকর্মীর আগমন সহকর্মী টের পেলেও টের পাননি মোন্নাফ। তাই আরো কিছু তথ্য অনায়াসেই বেরিয়ে পড়ে তার মুখ থেকে।
চা-চক্র শেষে উঠে যাবার সময় তার নাম আর পদবি জানার চেষ্টা চলে মিনিট খানেক। কোনো মতেই নিজের পুরো নাম আর পদবি বলতে রাজি নন সাংবাদিকদের কাছে।
সচিবালয়ের ওই কর্মকর্তার নাম-পদবি জানতে পিছু নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। ভবনের সিঁড়ি দিয়ে তিন তলায় উঠে নিজের কক্ষে ঢোকেন মোন্নাফ। বাইরে নেমপ্লেটে লেখা মো. আব্দুল মোন্নাফ মিঞা। পদবি- হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা। তারপর শাখা থেকে বাকিটা জেনে নিতে আর কষ্ট হয়নি।
চার বছর সেশন জটের ধকল কাটিয়ে ১৯৮৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাকাউন্টিং বিষয় নিয়ে পাশ করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা। ১৯৯০ সালে হিসাব রক্ষক পদে চাকরি শুরু করেন এই মন্ত্রণালয়ে।
এরপর চার বছরের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এভাবে একই চেয়ারে কেটে গেছে ১৮ বছর।
মোন্নাফের পদোন্নতি না পাওয়ার সূত্র ধরে জানা গেলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ৫২টি হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা পদের লোকজনের অবস্থা একই রকম।
হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার উপরে আর পদ নেই। তবে পদ না থাকলেও সিনিয়র স্কেল পাওয়ার সুযোগতো সরকারি চাকরিতে রয়েছে। সচিবালয়ের ক্যাডার ও নন-ক্যাডার সব প্রথম শেণির কর্মকর্তাদের পাঁচ বছর চাকরি পূর্তিতে সিনিয়র স্কেল (ষষ্ট গ্রেড) পাওয়ার বিধান থাকলেও সচিবালয়ের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তাদের সে বিধান নেই। আর তাই ১৮ বছরই এক চেয়ারে।
এই পদ থেকে অবসরে না গেলে অথবা মারা না গেলে নিচের কেউ এই পদে আসার সুযোগ পাবে না। তাই নিচের পদের কর্মকর্তারাও পদন্নোতি বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন।
সচিবালয়ের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি থেকে পাওয়া কাগজপত্রে দেখা গোলো, এ সমিতির সভাপতিও তিনি।
সর্বশেষ ২০১২ সালে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তাদের সিনিয়র স্কেল (ষষ্ঠ গ্রেড) দেওয়ার আবেদন করেন সভপতি হিসেবে।
তাতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সচিবালয়ের হিসেব কোষের নিয়োগ বিধি অনুযায়ী প্রতিটি মন্ত্রণালয়/বিভাগে একটি করে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার (প্রথম শ্রেণি, নন-ক্যাডার) পদ রয়েছে। যার সংখ্যা সর্বাধিক ৫০। সরকারের মূল চালিকাশক্তি অর্থ প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন এই কর্মকর্তারা। কিন্তু প্রথম শ্রেণির চাকরির অধিকাংশ সুযোগ সুবিধাই পান না তারা।
সচিবালয়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার অন্যান্য প্রথম শেণির কর্মকর্তাদের তুলানায় হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলনায়মূলকভাবে বেশি হলেও সমান সুযোগ সুবিধা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণির এই কর্মকর্তারা দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের চেয়েও কম বেতন-ভাতা পান।
কল্যাণ সমিতির আবেদনে নন-ক্যাডার অন্যান্য প্রথম শেণির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেতন স্কেল ও পদোন্নতি বৈষম্যের তথ্য স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয় সরকারের কাছে। তাতে বলা হয় পদোন্নতিপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার অন্যান্য কর্মকর্তাদের (সহকারি সচিবদের) তৃতীয় গ্রেড স্কেল পর্যন্ত পদোন্নতি ও অর্থিক সুযোগ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অপরদিকে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তাদের পদোন্নতির কোনো সুরাহা না থাকায় চাকরি জীবনে নবম গ্রেডের পদে থেকেই অবসরে যান।
কল্যাণ সমিতির আবেদনের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ২০১৩ সালে পদ সৃজন, পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে বলা হয়, যেসব মন্ত্রণালয়/বিভাগে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার প্রথম শ্রেণির পদ বিদ্যমান রয়েছে সেখানে পাঁচ বছর চাকরি পূর্তিতে সিনিয়র স্কেলের (ষষ্ঠ গ্রেড) পদ সৃজন করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে বলা যেতে পারে।
যেসব মন্ত্রণালয়ে বিদ্যমান পদ নেই, সেসব মন্ত্রণালয়/বিভাগে যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা থাকলে পদ সৃজনের জন্য প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে বলা যেতে পারে। আর যে সব মন্ত্রণালয়ে দুইটি পদ রয়েছে, সেসব মন্ত্রণালয়ে একটি পদ সিনিয়র স্কেলে (ষষ্ঠ গ্রেড) আপগ্রেড করা যেতে পারে।
এই সুপারিশ পর্যন্তই শেষ। আর কোনো পদক্ষেপ নেই সরকারের। আর এ কারণে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা ছাড়া নিচের পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পদোন্নতি পাচ্ছেন না। দীর্ঘকাল এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি বঞ্চিত থাকলেও তাদের দেখার কেউ নেই।
অপরদিকে সচিবালয়ের নন-ক্যাডার অন্যান্য পদে এইচ এসসি পাশ কর্মচারী স্টেনোগ্রাফার হিসেবে চাকরিতে প্রবেশ করে পদোন্নতি পেয়ে উপসচিব পর্যস্ত হয়েছেন অনেকেই। তাদের জন্য সুযোগ রয়েছে যুগ্মসচিব হওয়ার।
স্টেনোগ্রাফার হয়ে চাকরিতে ঢুকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (নন-ক্যাডার) হিসেবে চাকরি করে অবসরেও গেছেন মোখলেসুর রহমান নামে একজন।
আর হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘকাল চাকরি করে পদোন্নতি পাওয়ার আগেই চাকরির শেষ সময়ে মারা গেছেন বেশ কয়েকজন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা আবুল হাসেম এবং আবুল কাসেমসহ অনেকেই।
শেষ পর্যন্ত পদোন্নতির মুখ দেখতে না পেয়েই অবসরে গেছেন এদের সংখ্যাও কম নয়। আর জীবিত থেকে পদোন্নতির অপেক্ষায় অর্থ বিভাগের বজলুর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাইদুর রহমানসহ গণপূর্ত, শিক্ষা, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এক চেয়ারে পুরো চাকরি জীবন কাটিয়েই অবসরে গেছেন।
