বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা : যে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের দায়ে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম চলছে, শাস্তি হচ্ছে, ফাঁসিও কার্যকর হচ্ছে, সেই জামায়াত ইসলামীই এখন রাজাকারের তালিকা তৈরি করতে মাঠে নেমেছে। নিজেদের দল এবং আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের তালিকা তৈরি করছে জামায়াত।
রাজাকারদের তালিকা করতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি প্রতিটি জেলা জামায়াতের আমিরের কাছে পাঠানো হয়েছে। শুধু তাই নয়, জামায়াত-শিবির, আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ বা বিএনপি-ছাত্রদলের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলা অথবা সন্ত্রাস দমন আইনের মামলাসহ অন্যান্য আলোচিত মামলার তথ্যও সরবরাহ করতে বলা হয়েছে তাঁদের।
গত আগস্ট মাসের শেষের দিকে পাঠানো ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় জামায়াতের নেতা-কর্মীরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শান্তি কমিটির সব পর্যায়ের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের নামের তালিকা তৈরি করছেন। গত দুই মাস ধরে এ কাজ করছেন দলটির নেতারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষের আইনজীবীদের পরামর্শে দলটি এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
চিঠিতে ডা. শফিকুর রহমান দায়িত্বশীলদের (জেলা ও মহানগর আমির) উদ্দেশে বলেন, ‘বর্তমান জালিমশাহী সরকার দেশ থেকে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করার ঘৃণ্য এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারই অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে জমা দিয়েছে।’
ধর্মভিত্তিক এ দলটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হাইকোর্ট জামায়াততের নিবন্ধন অবৈধ করে রায় দেওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে দলটি। বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে। আগামীতে যদি দলটিকে নিষদ্ধি করার বিষয়টি সামনে আসে, তখন রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করবে জামায়াত। ওই সূত্রের দাবি, রাজাকারের এই তালিকায় দেখা যাবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির লোকজনই বেশি।
জামায়াতে ইসলামীর একটি সূত্র জানায়, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশের শান্তি কমিটি ও রাজাকারদের তালিকা সংশ্লিষ্ট জেলার নেতারা তৈরি করছেন। এরই মধ্যে অনেক জেলার পক্ষ থেকে সেই তালিকা কেন্দ্রীয় জামায়াতের দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে।
ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘তাদের (তদন্ত সংস্থার) ওই কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ডিফেন্স টিমের (জামায়াতের আইনজীবী) নির্দেশনার আলোকে কেন্দ্রীয় গবেষণা বিভাগের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে আপনার জেলায় সফর সম্পন্ন হয়েছে। উক্ত সফরকালে তারা আপনাদের সাথে ১৯৭১ সাল সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ব্যাপারে আলোচনা করে এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে ওই কাজগুলো অনতিবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে।’
তালিকা করতে গিয়ে কী কী বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে ওই চিঠিতে তার ৬টি নির্দেশন দেন ডা. শফিকুর রহমান। প্রথমেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে নিজ নিজ জেলায় সংঘটিত ঘটনাসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনাসহ তালিকা প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট জেলায় শান্তি কমিটি/রাজাকার বাহিনীর সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য সদস্যদের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়। চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ‘পূর্বে প্রদত্ত নির্দিষ্ট ফরমেট অনুযায়ী নতুন ভাবে তালিকা তৈরি করতে হবে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে জেলা পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ অথবা কোনো ব্যক্তি প্রকাশিত জেলার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংক্রান্ত বইসমূহ থেকে।
১৯৭২ থেকে ‘৭৪ সালের সংশ্লিষ্ট জেলার জিআর বই, দালাল আইনের জিআর বই, ‘জামায়াত-শিবির, আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ বা বিএনপি-ছাত্রদলের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অস্ত্র মামলা, হত্যা মামলা অথবা সন্ত্রাস দমন আইনের মামলাসহ অন্যান্য আলোচিত মামলার তালিকা তৈরি করার নির্দেশনা দেওয়া হয় ওই চিঠিতে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া শহর জামায়াতের সেক্রেটারি মো. জুয়েল হোসেন বলেন, ‘আমরা আমাদের জেলায় প্রকৃত রাজাকারদের তালিকা তৈরি করে ফেলেছি। আমাদের তালিকা ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছেও প্রকাশ করা হয়েছে।’ জামায়াতের এ নেতা বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আমাদের জোট হওয়ার কারণে আমরা এই তালিকা এখনো প্রকাশ করছি না। তবে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া যাবে। কারণ, তাঁরা তো দেখেছেন ওই সময় (মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে) কারা শান্তি কমিটিতে ছিলেন এবং রাজকারদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, যখন বিএনপির সঙ্গে আমাদের জোট থাকবে না তখন এ তালিকা প্রকাশ করা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগে রাজাকার ছিলেন, এমন অনেকে এখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনীতি করছেন। সময় হলে সবই প্রকাশ করা হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নেতা বলেন, ‘বগুড়া জেলায় বিএনপির সাবেক সাতজন এমপির মধ্যে পাঁচজনের পিতাই মুক্তিযদ্ধের সময় রাজকার ও শান্তি বাহিনীর সদস্য ছিলেন।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আবু মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের মামলা পরিচালনা করেন, জামায়াতের এমন আইনজীবীর পরামর্শেই আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। সেই চিঠিতে উল্লেখ আছে, স্বাধীনতার পর যেসব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, সেই মামলায় যাদের সাজা হয়েছিল সেই তালিকা তৈরি করা এবং এখন যাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে তাদের তালিকা তৈরি করার কাজ চলছে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।
ফরিদপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি বদর উদ্দিন চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন ফরিদপুর অঞ্চলে কার কী ভূমিকা ছিল, তা বিভিন্ন বইয়ে বর্ণনা রয়েছে। আমরা সে বইগুলো সংগ্রহ করছি। এসব বইয়ে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যদের নাম রয়েছে।’
জানতে চাইলে যশোর জেলা জামায়াতের নেতা আব্দুস সামাদ মাষ্টার বলেন, কেশবপুর উপজেলায় তারা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের রাজাকারদের একটি তালিকা তৈরি করেছেন। তবে সেটা আরো আগে। সেই তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা এখন বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এই তালিকা তৈরির বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘এ রকম একটি চিঠি আমরা পেয়েছি, সেই অনুযায়ী কাজ চলছে।’
জামায়াতের কেন্দ্র থেকে রাজাকারের তালিকা তৈরির চিঠি পাওয়ার কথা একাধিক জেলা জামায়াত নেতারাও স্বীকার করেন।
-কালের কণ্ঠ
জাকারের নতুন তালিকা করছে জামায়াত!
আপডেট :October 19, 2014
0
সম্পর্কিত আরও সংবাদ
সাম্প্রতিক সংবাদ
আর্কাইব
প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার
ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।
সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫
