বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ সিধুলী গ্রামের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে টিনের ছাউন দিয়ে তৈরি এক কক্ষের একটি বাড়ি। গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে লাবুর (৩৫) বাড়ি এটি। বাড়িটিকে ঘিরে গতকাল মঙ্গলবার সকালে জটলা করে ছিল শখানেক নারী-পুরুষ। বারান্দায় বসে আর্তনাদ করছিলেন লাবুর স্ত্রী রাশিদা বেগম। মায়ের অশ্রুর দিকে নির্বাক তাকিয়ে ছিল তাঁদের চার বছরের মেয়ে নিশি। আর বারান্দার নিচে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল বড় মেয়ে সাথী (৬)। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়ে অথৈ জলে পড়েছে পরিবারটি।
গ্রামের মুনসুর আলী বলেন, ‘লাবুকে মাটি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবারের সব আশা-ভরসাকেও মাটি দেওয়া হলো। কারণ পরিবারটির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিই ছিল লাবু। দুমুঠো চালও রেখে যায়নি লাবু, যা দিয়ে দুটি দিন পার করতে পারবে তাঁর স্ত্রী।’
এলাকাবাসী জানায়, শুধু রাশিদাই নন। তাঁর মতো এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে সিধুলী গ্রামের আরো ১৩টি পরিবারের। একই অবস্থা গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলায় আরো ২০ পরিবারে। সোমবারের দুর্ঘটনায় এসব পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিই চিরতরে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আর আহত হয়ে পঙ্গু হতে বসেছেন এমন লোকও রয়েছে অন্তত ১০ জনের মতো। যাঁদের পরিবারেও একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাঁরাই।
বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে সিধুলী গ্রাম, মাঝে একটি বিল। গতকাল সকাল ৯টার দিকে গ্রামে ঢোকার একমাত্র ইট বিছানো ভাঙাচোরা রাস্তার কাছে যেতেই চোখে পড়ল বিভিন্ন বয়সের শত শত নারী-পুরুষ। সবাই গ্রামের নিহত ১৪ পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে যাচ্ছিলেন, কেউ কেউ সমবেদনা জানিয়ে ফিরে আসছিলেন।
সবার মুখে প্রায় একই প্রশ্ন ‘হতদরিদ্র পরিবারের এ সদস্যদের এখন কী হবে? কে তাদের দেখবে?’
রাজশাহী থেকে মোটরসাইকেলে করে সিধুলী গ্রামে ঢোকার আগেই অনেকটা দূর থেকে কান্নার শব্দ কানে ভেসে আসছিল। কয়েকটি বাড়ি পেরোতেই দেখা গেল একটি টিনের বাড়ি, একটি আধাপাকা দুই রুমের বাড়ি আর একটি মাটির তৈরি দুই কক্ষের মোট তিনটি বাড়ি ঘিরে শত শত মানুষের জটলা। কেউ আহাজারি করছেন, কেউ চোখের পানি মুছতে মুছতে বাড়ির ভেতর থেকে বের হচ্ছিলেন। এই তিন বাড়ির তিন ভাই মারা গেছেন সোমবারের দুর্ঘটনায়। তাঁরা হলেন কহির মণ্ডল, সহির মণ্ডল ও আতাহার মণ্ডল। তাঁদের আরো তিন ভাই রাহেন, রব্বেল ও সোহরাব মারা গেছেন একই সঙ্গে। গ্রামের মধ্যে অন্য আরেক জায়গায় বাড়ি করেছিলেন তাঁরা। আরেক ভাই আব্দুর রহমান ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে নাটোরের চিকিৎসাধীন।
পারিবারিক সূত্র মতে, সাত ভাইয়ের সবাই দিনমজুর। কহিরের সংসারে রয়েছে স্ত্রী মেহেরা বেগম ছাড়াও সাত বছরের ছেলে শামিম। সহিরের সংসারে স্ত্রী নাসিরা ছাড়াও রয়েছেন দুই ছেলে রাজীব (১১), নাজমুল (১২)। আতাহারের সংসারে রয়েছে তিন ছেলে এক মেয়ে। সবার বিয়ে হয়ে গেছে। আতাহারের ছেলে সুমন হোসেন জানান, তাঁরা বাপ-চাচারা সবাই দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন। এর মধ্যে যা আয় হয়, তার একটি অংশ গত প্রায় দুই বছর ধরে প্রতি মাসে ওই হত্যা মামলার পেছনেই খরচ করতে হয়েছে। তারপরেও তাদের সংসার চলছিল কোনো মতে। কিন্তু ছয় সংসারের উপার্জনক্ষম ছয় ভাই মারা যাওয়ায় এখন তাঁদের সংসারে অন্ধকার নেমে এসেছে।
সিধুলী গ্রামের নিহত দিনমজুুর, শরিফ উদ্দিন, আলাল, তোফাজ্জল হোসেন তিনু, এবাদ আলী, আয়নাল, আব্দুল আলীম এবং শাহিন ওরফে বাহাদুরের পরিবারেও প্রায় একই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। পাশের সোনাবাজু গ্রামের হানিফ শেখ, পলসূরা পাটপাড়া গ্রামের জবের আলী, বামনবাড়িয়া গ্রামের রেজাউল করিম, আবুল খায়ের, পুঠিমারী গ্রামের রেজাউলও ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
এর বাইরে বড়াইগ্রামের আব্দুর রহমান, বাজিতপুরের কিসমত আলী, আয়নাল হক, পিংগইনের আব্দুল কুদ্দুস, চামটা গ্রামের চান মোহাম্মদ, খোকসা গ্রামের কৃষ্ণপদ সরকার, জোনাইলের রহমত, তারানগরের জামাল উদ্দিন, এবং ইকুরী গ্রামের মশিউর রহমান মনি ছিলেন নিজ নিজ পরিবারের প্রধান কর্মক্ষমও ব্যক্তি। তবে কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি সোমবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিহত ব্যক্তিদের প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসা খরচ বহনের ঘোষণা দেন। তবে গতকাল পর্যন্ত কোনো পরিবার ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের দাবি, ক্ষতিপূরণের টাকা যেন নিহতদের পরিবারের সদস্যদের হাতেই দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আহতদেরও যেন কিছুটা হলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। ক্ষতিপূরণের টাকা দ্রুত না দিলে ওই সংসারগুলো পথে বসবে।
অথৈ সাগরে ৩৩ পরিবার
আপডেট :October 22, 2014
0
সম্পর্কিত আরও সংবাদ
সাম্প্রতিক সংবাদ
আর্কাইব
প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার
ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।
সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫
