বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা : আজ ২ ডিসেম্বর। পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের ১৭ বছর পূর্তি। দিবসটি ঘিরে পার্বত্য অঞ্চলে আজ চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষে বিভিন্ন মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা না করা নিয়ে পাহাড়িদের মাঝে যেমন রয়েছে হতাশা, তেমনি পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালিদের মাঝে চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে প্রবল বিরোধিতা।
পাহাড়ে চুক্তি বাস্তবায়ন করা আর না করার দাবিসহ নানা ইস্যুতে পুরো বছরই হরতাল অবরোধ পালন করেছে পার্বত্য চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষরা।
এদিকে, ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সময়সূচিভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ১ মে থেকে সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সন্তু লারমা।
তৎকালীন ও বর্তমান ক্ষতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পাহাড়ের বিরাজমান পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে শান্তিবাহিনী নামক আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রধান প্রাক্তন গেরিলা নেতা সন্তু লারমার সঙ্গে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন।
তখন চিরস্থায়ী শান্তির আশায় বুক বেঁধেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারীরা। কিন্তু চুক্তির ১৭ বছর পরেও পাহাড়ে থামেনি অস্ত্রের ঝনঝনানি। এখনও গোলাগুলির শব্দে গভীর রাতে ঘুম ভাঙে এখানকার মানুষের। সশস্ত্র সংঘর্ষে পড়ছে লাশের পর লাশ, অপহরণ, অহরহ ঘটছে গুম ও চাঁদাবাজির ঘটনা। অব্যাহত রয়েছে (পার্বত্য চুক্তির পূর্বে শান্তি বাহিনী নামক) উপজাতীয় সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই। থেমে নেই পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল (সন্তু লামার গ্রুপ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, (মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা গ্রুপ) পার্বত্য জনসংহতি সমিতি সংস্কারপন্থী ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামের সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড।
নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, চুক্তি স্বাক্ষর হলেও শান্তি চুক্তির পর থেকে এ বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩জন। আহত হয়েছে ৯৩২জন, অপহরণ হয়েছে ১৩৬৫জন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার, জেএসএস-ইউপিডিএফের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫বার। ২০১৪ সালে শুধুমাত্র রাঙ্গামাটিতে নিহত ১৬ জন, অপহরণ ৩৭ জন, বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে শতাধিকেরও বেশি।
প্রতিবছর দেশি-বিদেশি প্রভুদের অর্থায়নে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে ২ ডিসেম্বর বিতর্কিত শান্তি চুক্তির ১৭তম বর্ষপূতি উদযাপন করলেও পার্বত্যাঞ্চলে কখনোই স্থায়ী শান্তি ফিরবে কিনা তা নিয়ে উপজাতীয় সংগঠনগুলোর মধ্যেও সংশয় রয়েছে।
এদিকে, আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, সরকার একদিকে যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে টালবাহানা করে চলেছে, অন্যদিকে তেমনি চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে দেশে-বিদেশে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য প্রচার করে আসছে।
প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের অনেক মন্ত্রী-আমলারা প্রচার করে আসছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, অবশিষ্ট ধারাগুলোর মধ্যে ১৫টি ধারার আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে এবং বাকি ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বস্তুত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে সরকারের উক্ত বক্তব্য বা প্রতিবেদন সর্বাংশে সত্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মূল্যায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। আর অবাস্তবায়িত রয়েছে ৩৪টি ধারা এবং আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে ১৩টি। এর অর্থ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। বাস্তবায়িত ২৫টি ধারার মধ্যে উপজাতি শব্দটি বলবৎ রাখা, পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের পরিবর্তে পার্বত্য জেলা পরিষদ নামকরণ করা, ডেপুটি কমিশনারের পরিবর্তে সার্কেল চিফ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা, চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে বা অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে পরিষদের সভায় একজন উপজাতীয় সদস্যের সভাপতিত্ব করা, পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, সরকার শব্দের পরিবর্তে ক্ষেত্র বিশেষে পরিষদ বা মন্ত্রণালয় শব্দটি প্রতিস্থাপন করা, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৭০ ধারা বাতিল করা, জনসংহতি সমিতির সদস্যদের অস্ত্র জমাদান ইত্যাদি বিষয়গুলো উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে চুক্তির ১৭ বছর পূর্তি আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমার অসহযোগ আন্দোলনকে রাজপথে মোকাবিলা করা হবে বলে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রাক্তন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি দীপংকর তালুকদার।
তিনি বলেন, অসহযোগ আন্দোলনের নামে সহিংসতা করে পাহাড়ে অশান্তি আর অরাজগতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা প্রতিহত করবে।
সোমবার রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য চুক্তির ১৭তম বর্ষপূর্তি প্রাক্কালে জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দীপংকর তালুকদার এ কথা বলেন।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন না হওয়ায় ১৭ বছর ধরে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ জনসংহতি সমিতির দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, পার্বত্য চুক্তির অধিকাংশ ধারা সরকার বাস্তবায়ন করলেও জনসংহতি সমিতির অসহযোগিতার কারণে চুক্তির অনেক ধারাই এখনো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
পার্বত্য চুক্তি নিয়ে জনসংহতি সমিতি ক্রমাগত সত্য গোপন করে অসত্য তথ্য দিয়ে জনমনে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করে চলেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
দীপংকর তালুকদার পাহাড়ে চলমান সন্ত্রাস-চাঁদাবাজী ও অপহরণ বন্ধে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ব্যবস্থা নিতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিরূপা দেওয়ান হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, শান্তি চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসেনি। পাহাড়ের পাহাড়ি বাঙালি সকলের মাঝে হতাশা বাড়ছে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে দোদুল্যমান পাহাড়ের মানুষ। তিনি বলেন, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে শান্তি ফিরে আসবে। তিনি সরকারের কাছে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও প্রাক্তন ছাত্র নেতা জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, সরকার পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেছিলো পাহাড়ের শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য। পাহাড়ের দীর্ঘ ২৫ বছরের সশস্ত্র সংগ্রামকে বন্ধ করে শান্তি ফিরে আনতে সন্তু লারমার সঙ্গে চুক্তির এ উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু দেখা গেলো তাদের মাঝেই তারা বিভক্ত। তারা চুক্তির বিরোধিতা করছে। পাহাড়ের সশস্ত্র সংঘাত চালিয়ে যাচ্ছে। সশস্ত্র সংঘাতের ফলে পাহাড়ের মানুষ আজ তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা সংঘর্ষের মাঝে থেকে পাহাড়ের মানুষের সাথে জুলুম করছে। সরকার যেই অর্থে এই চুক্তি করেছিলো তা কখনোই সফল হবে না বলে তিনি মনে করেন। বেঙ্গলিনিউজটোয়েন্টিফোর.কম
