বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা : বহুল আলোচিত ১২৪ কেজি সোনা পাচারের ঘটনায় দীর্ঘ ১৬ মাস পর মামলা দায়ের করেছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ। এতে আসামি করা হয়েছে বাংলাদেশ বিমানের ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দুই বিদেশি নাগরিকসহ ১৪ জনকে। ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মোস্তফা জামাল বাদী হয়ে গত শুক্রবার রাতে বিমানবন্দর থানায় মামলাটি দায়ের করেন। যে বিমানে করে সোনা আনা হয়েছিল সেই বিমানটি কাস্টমসের জিম্মায় নেওয়া হলেও পরে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার আসামিরা হলেন ভারতীয় নাগরিক জেসন প্রিন্স, নেপালের নাগরিক গৌরাঙ্গ রোসান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জুনিয়র সিকিউরিটি অফিসার কামরুল হাসান, সুইপিং অফিসার মো. আবু জাফর, এয়ারক্রাফট মেকানিক মো. মাসুদুর রহমান, এয়ারক্রাফট মেকানিক অ্যাসিস্ট্যান্ট আনিস উদ্দিন ভূঁইয়া, হ্যাঙ্গার শাখার মেকানিক ওসমান গণি, ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসার সালেহ আহমেদ, মেকানিক মজিবর রহমান, জুনিয়র ইন্সপেকশন অফিসার শাহজাহান সিরাজ, রায়হান ও মাকসুদুর রহমান এবং খিলক্ষেত কুড়াতলীর এসএস কার্গোর চেয়ারম্যান মিলন সিকদার ও কক্সবাজারের চকরিয়ায় বসবাসকারী টেইলর জসীম উদ্দিন। আসামিদের মধ্যে মাসুদুর রহমান, আনিস উদ্দিন ভূঁইয়া, শাহজাহান সিরাজ, কামরুল হাসান, আবু জাফর ও মজিবর রহমান সোনা চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে আগেও বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হন এবং পরে জামিনে মুক্তি পান। অন্যদিকে মো. মাসুদ ও আনিস উদ্দিন ভূঁইয়া আরেকটি সোনা চোরাচালান মামলারও এজাহারভুক্ত আসামি। গত ২৬ এপ্রিল শাহজালালে ১০৫ কেজি সোনা আটক করার ঘটনায় ওই মামলাটি হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সোনা পাচারের সঙ্গে জড়িত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম পুলিশ মৌখিকভাবে আমাদের অবহিত করেছে। আমরা তাদের বলেছি, লিখিতভাবে জানাতে। তার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৫০ সালের আমদানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩(১) ধারা অনুযায়ী জারি করা আমদানী নীতির সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ না করে লুকিয়ে ওই সোনা নিয়ে আসে চোরাকারবারিরা। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শুল্ক আইনের ২ এফ ২ এল ২ জি ধারায় বলা আছে, যেখানে চোরাই পণ্য পাওয়া যাবে সেই সময় তা আটক করতে হবে। সে অনুযায়ী আমরা বিমানের ভেতর থেকে সোনার বার আটক করি। ওই সময় বিমানটি আমরা জব্দ করি। কিন্তু বিমানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা ফেরত দেওয়া হয়। শুক্রবার রাতে মামলা করার পর বিমানটি আবারও জব্দ করা হয়। পরে বিমান কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়।’
শুল্ক গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানে করে সোনার চালান এ দেশে পৌঁছলে নিরাপদে তা পার করে দেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন বিমানের প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যাত্রীরা নামার পর বিমানটি যখন হ্যাঙ্গারে যেত তখনই সেখানকার বিমানের কর্মীরা জোট বেঁধে চোরাই সোনা বাইরে খালাস করত।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজের কার্গো হোল থেকে ১২৪ কেজি ওজনের এক হাজার ৬৫টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এর বাজারমূল্য ৫৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় চোরাচালানের ঘটনা এটি। ওই চোরাচালানের রহস্য উদ্ঘাটনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মইনুল খানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মংলা শুল্ক ভবনের কমিশনার কে এম অহিদুল আলম, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক উম্মে নাহিদা আক্তার, বাংলাদেশ বিমানের সিকিউরিটি ম্যানেজার মো. নুরুজ্জামান মণ্ডল ও সিভিল এভিয়েশন অথরিটির চিফ সিকিউরিটি অফিসার ইফতেখার জাহান। কমিটি প্রায় ১৬ মাস ধরে তদন্ত চালায়।
অন্যদিকে বিমান কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় বাংলাদেশ বিমানের জেনারেল ম্যানেজার মমিনুল ইসলামকে (নিরাপত্তা)। কমিটি বিমানের তৎকালীন এমডির কাছে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ওই সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নয়। তবে শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে বেরিয়ে আসে সোনা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে নানা তথ্য। শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে গঠিত কমিটির সদস্যরা বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, সিভিল এভিয়েশন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ১৪ জনকে শনাক্ত করে। সোনা চোরাচালানের হাট হিসেবে পরিচিত দুবাই গিয়েও বেশ কয়েকটি সংস্থা ও ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলেন কমিটির সদস্যরা। ওই সময় শাহজালাল বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারসহ কিছু এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজও তাঁরা সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় দুবাই বিমানবন্দরে কর্তব্যরত বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তদন্ত শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে রিপোর্ট হস্তান্তর করা হয়। পরে অর্থ এবং বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি মেলে। সেই সুবাদে শুক্রবার রাতে বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সূত্র মতে, ১২৪ কেজি সোনা আটক হওয়ার কিছুদিন পর ওই সোনার মালিকানা দাবি করেন নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর বাসিন্দা গৌরাঙ্গ রোসান। ওই সময় রোসানের পক্ষ হয়ে বাংলাদেশের এসএস কার্গোর চেয়ারম্যান মিলন সিকদার ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার জাকিয়া সুলতানার কাছে একটি লিখিত আবেদন করেন। ওই আবেদনে বলা হয়, ১২৪ কেজি সোনার মালিক রোসান। শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে আটক সোনার বারগুলো রোসানকে ছাড়িয়ে দেওয়া হোক।
শাহজালালে পৌনে ৪ কেজি সোনা আটক : শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিন কেজি ৮০০ গ্রাম সোনার বারসহ এক যাত্রীকে আটক করেছে ঢাকা কাস্টম হাউস। আটক ব্যক্তির নাম এ কে এম গোলাম কবির সিকদার।
ঢাকা কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার কাজী মো. জিয়া উদ্দিন জানান, গতকাল শনিবার সকাল ১১টার দিকে মালয়েশিয়া থেকে এমএইচ-১০২ ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন কবির। বিমানবন্দরের বোর্ডিং লাউঞ্জ পার হওয়ার সময় তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে তাঁর লাগেজ ও শরীর তল্লাশি করে পৌনে চার কেজি ওজনের আটটি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা সোনার বাজারমূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকা। কবিরকে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলাও হয়েছে।
-কালের কণ্ঠ
