বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
কুমিল্লা: ‘দেশের লাগি কেউ কান্দে না, সব্বাই খালি নিজের লাগি কান্দে। দেশের লাইগা কানলে আজগা এই অবস্তা অইত না, বুজ্জেন?’
রোববার সকালে পাশদিয়ে ভ্যানগাড়ি ঠেলে যেতে যেতে এভাবেই বলছিলেন সবজি ফেরিওয়ালা হাওলাদার।
তার কাছে যেতেই তিনি বলেন, ‘আজকা কাঁচা মইচের দাম দুইশ’ টেকা, যেই মইচের দাম কয়দিন আগেও আছিল ষাইট টেকা, আমরা সাদারণ মানুষ কেমনে বাচুম? আবার নির্বাচন অউক, অইয়া সাইরা যে ফাস (পাস) করে হে অই দেশ চালাক।’
সকালে বাসা থেকে বের হয়েই রাস্তায় দেখা ষাটোর্ধ্ব এক প্রৌঢ়ের সঙ্গে। প্রাতভ্রমণ শেষে বাসায় ফিরছিলেন তিনি।
দেশের পরিস্থিতি কেমন চাচা ? প্রশ্ন করতেই তিনি বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ, অত্যন্ত দুঃখজনক। জন সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত হইতাছে, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হইতাছে। দুই নেত্রীর কাছে ক্ষমা চাই, অনুরোধ করি ওনারা যেন মিল-মহাব্বত সৃষ্টি কইরা দেশটারে শান্তি করেন।’
তার মতে আজকাল দেশের যা পরিস্থিতি গণমাধ্যমের কাছে কথাবলাও নাকি নিরাপদ নয়। তাই বিদায় নেবার সময় নিজের নামটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন তিনি।
নগরীর কান্দিরপাড়ে দেখামেলে একদল দিনমজুরের। কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা এসব দিনমজুররা নিজের শ্রম বিক্রির উদ্যেশ্যে প্রতিদিন ভোর বেলা কান্দির পাড়ের এ স্থানটিতে ঠাই দাঁড়িয়ে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেন। কিন্তু দেশের চলমান এ পরিস্থিতিতে কাজের বাজার খুবই মন্দা।
উত্তরবঙ্গ থেকে আসা দিনমজুর হোসেন মিয়া বলেন, ‘গরীব মানুষ, তাই কাজের খোঁজে কুমিল্লা আইসেছি কিছুদিন হলো। কিন্তু কাজ পাইতেছিনা। প্রতিদিন এখানে আইসে দাঁড়ায়ে থাকি। দিন গেলেই এক-দেড়শো’ টেকা খরচ। এইযে ঘাটতি অইতেছে তা পুরণ করমু কি করে; এই জন্যে মাথা নষ্ট।’
দিনমজুর আখলাকের ভাষায়, ‘হেতারা দুইজনে বইসা একটু সংলাপের দরকার। কারণ দেশেতো শান্তি সৃষ্টির দরকার আছে। যাতে আমরা গরীব মানুষ বাঁচতে পারি। গাড়ি-গুড়ি চললে মালামাল আইব, আমার কাজ কর্ম কইরা খাইতাম পারাম।’
রিকশাচালক ফুল মিয়া এভাবে বলেন, ‘হাসিনা সরকার যদি মাইনে নিতো তাইলে কিচ্ছু অইতো না। এখন দেশের মানুষ বিপাকে পইড়েগেলো। যেদিকে যায় সেদিকে গেনজাম; যেদিকে যায় সিদিকেই মাইরপিট। গণ্ডগোল-মারামারি এসব ফাছাদ লইগাই আছে। এইবাবেকি দ্যাশ চলে? নিরপেক্ক নির্বাচন হইলে এসব থাকপে না।’ঈড়সরষষধ-চড়ষরঃরপধ
সাংবাদিক দেখে এগিয়ে আসেন দিনমজুর ইব্রাহিম। উচ্চকণ্ঠে বলতে থাকেন ‘আমার কষ্ট কইরা বোট দিছি কি জন্য? দেশে যা গটনা গটতাছে; অহন আমরা তাগো ফক্কে (পক্ষে) নাই। তত্ত্বাবদক সরকার অইলেই আমাগ লাইগা বালো।’
দিনমজুর ইব্রাহিমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিনমজুর ইসহাক নিজের পেটের দিকে হাতি দিয়ে বলেন, ‘হরতালে আমাগো পেটে লাথি। আমার নিরপেক্ষ সরকার চাই, শান্তি চাই।’কিভাবে শান্তি আসবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবদক সরকার দিলে খালেদাও মানবো, হানাহানি অইব না।’
শাসগাছা বাসটার্মিনালে কথা হয় কজন বাসচালক, হেলপার ও যাত্রীর সঙ্গে। চলাক বিল্লাল বলেন, ‘গাড়িগোড়া বন্দ কইরা বইয়া রইছি। লছ অইতাছে। আসলে আমডাতো ফাঁকে ফাঁকে গাড়ি লইয়া বাইর অই। আমডা রিকশা লইয়াঅই বাইর অই।’
ঢাকার উদ্দেশ্যে টার্মিনালে এসে বাস না পেয়ে চিন্তিত হাসমত আলী। তিনি বলেন, ‘মনে করেছিলাম সকালে যাবো, কিন্তু যাওয়াতো হলো না। বিপদে পড়েগেছিতো ঢাকা থেকে এসে, অফিসতো খোলা।’
কথা হয় দেশের অন্যতম পাইকারী কাঁচা বাজার নিমসার কাঁচা বাজারের কয়েকজন খুচড়া ও পাইকারী বিক্রেতার সঙ্গে।
নিজের জমিতে চাষ করা বেগুন বাজারে বেচতে এনে লোকসানের মুখে পড়েন মতিন মিয়া। তিনি বলেন, ‘নিজের খেতের বাইয়ুন লইয়াইছি, হরতালের কারণে বাইয়ুন বেচতাম পারি না। বেফারী নাই, মাল বাইরে যাইতো ফারে না।’
নিজের জমিতে চাষকার ডাটা শাক বিক্রি করতে না পেড়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন আছির উদ্দিন। তিনি বলেন. ‘আগে হারে তিনাজার টেহা বেচা অইছে তিনশ’ মোডা মাইলা, বুজ্জেন? অহন তিনশ’ মোডা মাইলা মুলায় দুইয়াজার-আড়াইয়াজার টেহা। আমরার নিজের ক্ষেতের মাল, বদইল্লা দিয়া তুইল্লা এই দামে বেইচ্চা লছ অইতাছে। আজকা বেফারী কম, খালি হরতালের লাইগা।’
কাঁচামালবাহী পিকাপভ্যান চালক দিদাস হোসেন বলেন, হরতালের কারণে আমরা অবাদে গাড়ি নিয়ে যাতায়ত করতে পারছি না। এতে আমদের এবং বাজার ইজারদারদেরও লস হচ্ছে।
পাইকারী আরদদার রাসেল বলেন, ‘স্থানীয় আরতদার হিসেবে আমার বেশ সমস্যার মধ্যে আছি। ঠিক মতো গাড়ি আনতে পারতোছিনা হরতালের কারণে। এ কারণে পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায়ী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
হরতাল অবরোধে স্থবির হয়ে পড়েছে কুমিল্লার পর্যটন কেন্দ্রগুলোও। যেখানে প্রতিদিন পর্যটকদের পদচারনায় মুখরিত হয়েউঠতো সেখানে আজ শোনসান নীরবতা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন এলাকাকে কেন্দ্রকরে গড়েউঠা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো।
কথা হয় দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র শালবন বিহারের পাশের ছোট্ট একটি খাবারের হোটেল মালিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগে লোকজনও বেশি হতো, বেচা-বিক্রও বেশি হতো। এখন গাড়িঘোড়াও আসেনা বেচা-বিক্রিও বন্ধ প্রায়।’
কথা হয় কাশবন রিসোর্টের সত্তাধিকারী হাজী আবুল কাশেমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেশের চলমান রাজনৈতিক সমস্যার কারণে আমরা খুব ক্ষতিগ্রস্ত। সারা বর্ষায় আমাদের তেমন কোনো ব্যবসা থাকে না। মূলত: জানুয়ারি থেকেই আমাদের রিসোর্ট ব্যবসা শুরু হয়।’
শালবন বিহারে সময় কাটাতে আসা স্থানীয় একটি এনজিও প্রতিনিধি শামীম বলেন, ‘এখনই কিন্তু পিকনিকের সিজন, কিন্তু লোক কম হওয়ার একমাত্র কারণ হরতাল-অবরোধ।’
এব্যপারে প্রতœতত্ত্ব বিভাগের কুমিল্লা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ভিজিটর আসতে পারছেন না, সেহেতু এবছর রাজস্ব আয় টার্গেটে পৌঁছানো হয়তো সম্ভব হবে না।’ বাংলামেইল২৪ডটকম
