বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে নব্বই দশকের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আদনান বাবুকে কঠোর গোপনীয়তায় গ্রেফতার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)। বর্তমানে দুদকের মামলার এ আসামি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
শিল্পী আদনান বাবু নিজেকে মাহবুব নামে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেকশন অফিসার পরিচয় দিয়ে ফোনে মানিকগঞ্জের বারাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে বরাদ্দপত্র পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন।
প্রধান শিক্ষক এ বিষয়টি শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খানকে অবহিত করেন। প্রতারক চক্রের সদস্যদের ধরার জন্য টেলিফোনে দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের সহায়তা চান সচিব। এরপর মোবাইল ট্র্যাক করে গত ২ এপ্রিল আদনানসহ তার সহযোগীকে গ্রেফতার করেছে দুদক।
তাকে গ্রেফতার প্রক্রিয়া থেকে কারাগারে প্রেরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি অজ্ঞাত কারণে এতদিন গোপন রেখেছে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি দমন সংস্থাটি।
দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ঠ সূত্র রোববার জানায়, গ্রেফতারের পর দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন প্রতারক বনে যাওয়া নব্বই দশকের জনপ্রিয় এ গায়ক। এ শিল্পীর গায়কী নাম ছিল আদনান বাবু। প্রকৃত নাম শরীফ হোসেন। প্রতারণা করতেন মাহবুব নামে।
নব্বইয়ের জনপ্রিয় শিল্পী আদনান বাবুর জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে-‘রং নাম্বার টেলিফোনে নাম না জানা কে বললো হ্যালোৃ হ্যালোৃলাইনটা কেটে গেলো’ ‘মৌচাক মার্কেটে হলো দেখা, নিউ মার্কেটে পরিচয়’ ‘যদি তোমায় আমি চাঁদ বলি’ ‘ও পরানের পাখিরে দিলি তুই ফাঁকিরে’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান।
দুদক সূত্র জানায়, মানিকগঞ্জের বারাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের চার তলা ভবন নির্মাণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর প্রথম পর্যায়ে ফাউন্ডেশনসহ এক তলা পর্যন্ত নির্মাণের জন্য ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আদনান বাবু নিজেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সেকশন অফিসার মাহবুব পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ভবন নির্মাণে বরাদ্দপত্র পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন।
প্রধান শিক্ষক ঘুষ দিতে অপারগতা জানালে তিন লাখ টাকার কম দিলে বরাদ্দ বাতিলের কথা জানান। ঘুষের প্রথম কিস্তি হিসেবে ৫০ হাজার দিলে বরাদ্দপত্রের ফটোকপি এবং বাকি আড়াই লাখ টাকা দেওয়ার পর মূল বরাদ্দপত্র দেওয়ার কথা জানিয়ে দেন। টাকা না দিলে বরাদ্দ বাতিল ও প্রধান শিক্ষককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করারও হুমকি দেন।
শিক্ষাসচিব নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘প্রতারক চক্র বিভিন্ন স্কুলে কাজ করে দিবে বলে ঘুষ চেয়ে আসছিলো। দুদকের তৎপরতায় অবশেষে অপরাধীকে পাকড়াও করা সম্ভব হয়েছে।
যেভাবে গ্রেফতার
ফেব্রুয়ারিতে অভিযোগের পর দুদকের পরিচালক তাহিদুল ইসলাম ও উপ-পরিচালক এসএম রফিকুল ইসলামের সমন্বয়ে একটি টিম কাজ শুরু করে। অভিযানের প্রথম পর্যায়ে তারা ফোনে কথোপকথনের রেকর্ড সংগ্রহ করে। মাহবুব নামীয় আদনান বাবুর মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে ট্র্যাকিং চালাতে থাকেন দলের সদস্যরা।
প্রধান শিক্ষক ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দেবেন বলে কৌশলে রফা করেন আদনানের সঙ্গে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে টাকা দেওয়া হবে বলে রফা হয়। স্বরাষ্ট্রসচিবের অনুমতি নিয়ে ওই দিন সচিবালয়ে ফাঁদ পাতে দুদকের দলটি। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সচিবালয় থেকে সরে পড়ে প্রতারকেরা। অভিযান ব্যর্থ হলেও মুঠোফোন ট্র্যাকিং করে আদনানের ওপর নজর রাখে দুদকের দলটি।
এরই ধারাবাহিকতায় ২ এপ্রিল রাতে রাজধানীর বিজয়নগর থেকে আদনান বাবু ও তার সহযোগী শরিফুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন রাতেই দুদকের ঢাকা-১ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আশীষ কুমার কণ্ডু বাদী হয়ে আদনান বাবু ও তার সহযোগী মোশাররফ হোসেনকে আসামি করে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন।
এজাহারে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পর বারাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে ঘুষ চাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন আদনান বাবু। আদনান বাবু ও তার সহযোগী মোশাররফ হোসেন বিভিন্ন স্কুলের নামে নামে ভবন নির্মাণের বরাদ্দপত্র সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বরাদ্দপত্র পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ আদায় করে আসছিলেন।
এ পর্যন্ত বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন আদনান। যার মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা তার সহযোগী মোশাররফ হোসেনকে দিয়ে বাকি এক লাখ টাকা তিনি নিজে নিয়েছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট জানায়, এসব ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের কেউ জড়িত কি-না তাও খতিয়ে দেখছে দুদক। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
