সৈয়দ মোকছেদুল আলম
প্রথমত তিনি শিক্ষক ছিলেন। দ্বিতীয়ত এই মানুষ গড়ার কারিগর জাতীয় শ্রমিক লীগের শীর্ষ নেতা আহ্সান উল্লাহ মাস্টার। ইউপি চেয়ারম্যান থেকে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
উপজেলা নির্বাচনে গণসংযোগ করতে গাজীপুরের উত্তর ছায়াবীথিতে একটি বাসায় থাকছিলেন। এই সময়টার কোন একদিন তাঁকে প্রথম দেখি। ইনিই তিনি! বঙ্গবন্ধুর চিরচেনা সফেদ ‘পায়জামা-পাঞ্জাবী’। ‘মুজিব-কোট’ Ñযেন ফুটে ফুটে সুন্দর শিশুর কপালে মায়ের আদুরে কাজলের টিপ। কারও খারাপ নজর থেকে ‘রক্ষা-কবচ’ হয়ে আছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান আহ্সান উল্লাহ মাস্টার যখন এমপি’র মনোনয়ন পেলেন; তখনও ভেতরের মানুষটাকে চেনা হয়নি।
ক্ষাণিকটা চেনা হলো- যখন ত্রিখন্ডিত গাজীপুর প্রেসক্লব ও সাংবাদিক-স্রোতকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিলেন। বড় কথাÑ জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আ.ক.ম মোজাম্মেল হক (বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী) আহ্সান উল্লাহ মাস্টারকে আন্তরিভাবে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেন।
মনে আছে, ২০০০ সালে দৈনিক ভোরের কাগজে আমি যোগদানকালে ক্লাবটির দুঃসময়ের কথা। ভাওয়াল রাজবাড়িতে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। এই কালেক্টরেট ভবনের একটি কক্ষ প্রেসক্লাবের জন্য বরাদ্দ। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে আনুমানিক এক / দেড় শ’ ফুট পশ্চিমে প্রেসক্লাব। ক্লাবঘরের সামান্য পশ্চিমে ঐতিহ্য মন্ডিত সীমানা প্রাচীর। প্রাচীর ঘেঁষে সুশীতল রাজদিঘি। আছে বাঁধানো ঘাট। দক্ষিণে- কোর্ট জামে মসজিদ। উত্তরে- মুখোমুখি ‘মাধব-মন্দির’।
অব্যবহারে প্রেসক্লাব ভবনে মাকড়-তেলেপোকার বসবাস তখন। দরোজায় জং ধরা তালা। হৃদয় বিদীর্ণ করা জরাজীর্ণ দশা। মামলা-মোকাদ্দমা, পাল্টাপাল্টি কমিটি নিয়ে ত্রিধাবিভক্ত সাংবাদিক সমাজ। সাংবাদিকদের অন্যান্য ধারার সংগঠন এই লেখার প্রসঙ্গ নয়। ছিল হয়তো ভিন্ন পরিচয়ে আরও কোন সংগঠন। তবে তদানিন্তন সংসদ সদস্য আহ্সান উল্লাহ মাস্টার সবাইকে মূল স্রোতে নিয়ে আসার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালান। সাবির্ক কল্যাণ বিবেচনায় ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজকে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।
কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ মনে প্রাণে গ্রহণ-ধারণ ও লালন-পালন করার শিক্ষাই গড়ে তুলতে পারে তাঁর মত একজন উদারনৈতিক খাঁটি রাজনীতিবিদকে।
ইতিহাস বলছে, বঙ্গবন্ধুও সাংবাদিকদের সঙ্গে গভীর সু-সম্পর্ক রেখে এগিয়েছেন। সাংবাদিক বিশেষগণও একইভাবে দেশ গড়তে বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছেন। দৈনিক ইত্তেফাক -পত্রিকা’র প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তাঁদের অন্যতম। রাজনৈতিক সংগঠন ও জনকল্যাণে’র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে, রাজনীতিবীদ-সাংবাদিক পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করা একান্ত প্রয়োজন। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার দ্বারাই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির সফল বিজয় গোটা বিশ্ব দেখেছে ‘বিস্মিত-চোখে’। এর মর্ম উপলব্ধি করেই এমপি আহ্সান উল্লাহ মাস্টার দেশ, মাটি ও মানুষকে অকৃত্তিমভাবে ভালবাসতে শিখেছিলেন। সেই ভালবাসা থেকেই ২০০০ সালে খুব সম্ভব মার্চ-এপ্রিলের কোন একদিন গাজীপুর সাকির্ট হাউজে এক বৈঠক করেন তিনি। বিষয়ঃ সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ করা। এই বৈঠকে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ.ক.ম মোজাম্মেল হক -সহ গাজীপুর জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা ও মূলধারার স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ঐক্যবদ্ধ থাকার গুরুত্ব ও মর্ম যাঁরা আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন; তাঁরা এ সভায় মিলিত হন সেদিন।
গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আহ্সান উল্লাহ মাস্টার প্রথমেই প্রেসক্লাবের তিন স্রোতের নেতাদের বিশেষ অঙ্গিকারে আবদ্ধ করালেন। প্রথমে সরু মিয়া, এরপর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও একই সঙ্গে গাজীপুর প্রেক্লাবে’র একটি কমিটির নেতা মোঃ আব্দুস সামাদ এবং অপর কমিটির সভাপতি মোঃ লুৎফর রহমানকে ঐ অঙ্গিকার করতে বললেন তিনি। প্রত্যেককে দিয়ে একে একে নিজেদের দাবিকৃত কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার অঙ্গিকার করিয়ে নিলেন। (ইতোমধ্যে আমাদের থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন উল্লিখিত তিনজন সিনিয়র সাংবাদিক। তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও মন থেকে আত্মার শান্তি কামনা করছি।)
তিনটি কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার ঘোষণায় সবার জন্য সমতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এবং সেদিনই একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করে দেন তিনি। সাত সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির আহবায়ক ছিলেন, গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ শফিকুল ইসলাম। সদস্য সচিব করা হয়, তখনকার জেলা তথ্য কর্মকর্তা স. ম. গোলাম কিবরিয়াকে। সদস্য ছিলেন- মোঃ শফিকুল ইসলাম, অনিল মন্ডল, মোঃ আতাউর রহমান, ইকবাল সিদ্দিকী, মোস্তাফিজুর রহমান টিটু (সূত্র: ১ম সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, গাজীপুর। দেঃ মোঃ নং ২৪৭/২০০০ ও ক্লাবের গঠনতন্ত্র)
এই সাত সদস্য বিশিষ্ট কমিটিকে গাজীপুর প্রেসক্লাবের জন্য গঠনতন্ত্র প্রস্তুত, সেই আলোকে সদস্য পদ প্রদান ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য তিন মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়। নানা প্রতিকূলতা, বিরোধিতা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে এ দায়িত্বটি সম্পন্ন হয়। ৫১ জনকে সদস্য পদ দেওয়া হয়।
২০ জুলাই, ২০০০ খ্রিঃ। সদস্য সচিব স. ম. গোলাম কিবরিয়া গাজীপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সদস্যদের পরবর্তী ০৪ আগস্ট, রোজ শুক্রবার সকাল ৯টায় গাজীপুর জেলা পরিষদ মিলানায়তনে সাধারণ সভায় উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি বিতরণ করেন। আলোচ্য সূচী ছিল ঃ গঠনতন্ত্র সংশোধন ও বিবিধ।
গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে দুই তৃতীয়াংশ সদস্যর সম্মতি স্বাক্ষরের প্রয়োজন ছিল। ৫১ জনের মধ্যে ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) জনের স্বাক্ষরে সংশোধনী পাশ হয় (সূত্র: সাধারণ সভায় সদস্যদের স্বাক্ষর)। এরপর নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ১৯ জন সদস্য ১৭ সদস্য বিশিষ্ট পাল্টা কমটি ঘোষণা করেন। তা পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থাও করেন। তাছাড়া প্রেসক্লাবের নির্বাচিত ১৭ কর্মকর্তা, আহবায়ক কমিটির সিংহভাগ সদস্য, প্রধান নিবার্চন কমিশনার তথা জেলা প্রশাসন কার্যালয় গাজীপুর -এর সহকারী কমিশনার ও ম্যাজিস্ট্রেট মির্জা তারিক হিকমতসহ মোট ২৩ জনের বিরুদ্ধে প্রথম সিনিয়র সহকারী জজ আদালত গাজীপুর -এ দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ২৪৭/২০০০ দায়ের হয়। গাজীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে যথাক্রমে নাছির আহমেদ ও মোঃ মাজহারুল ইসলাম মাসুম এই মামলার বাদী ছিলেন। মোট ২৩ জন বিবাদীর মধ্যে আমি ১৩নং পক্ষ হিসেবে প্রতিপক্ষ/বাদীগণের দায়েরকৃত ওই মোকদ্দমার সমন নোটিস হাতে পাই।
যদিও পরে নিজ নিজ তাগিদ থেকে দু’পক্ষই পুনরায় একত্রিত হন। এবং নিবার্চনের মধ্যে দিয়েই একটি ঐক্যবদ্ধ কার্যনিবার্হী পরিষদ গঠিত হয়। এর মূলভিত্তি ছিল আহ্সান উল্লাহ মাস্টারের উদ্যোগে শুরু হওয়া নিয়ম-শৃংখলার ভেতর দিয়ে চলার জন্য তৈরি করে দেওয়া পথ নির্দেশনা। এর পেছনে সাংবাদিক মোঃ আতাউর রহমান বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাঁর বারংবার তাগাদায় সাংবাদিকদের ঐক্যবব্ধ করতে অত্যন্ত ব্যস্ততম সময় উৎসর্গ করেন আহ্সান উল্লাহ মাস্টার।
গাজীপুর পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান আ.ক.ম মোজাম্মেল হকসহ তাঁর কার্যালয় ও গাজীপুর রেডক্রিসেন্ট কার্যালয়েও একাধিকবার এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন আহ্সান উল্লাহ মাস্টার। আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিলাম কিছু সময়ের জন্য। সুফল পাওয়ার আগেই বিভক্তও হয়েছি। এই বিভক্তি ১৯৮৩ সালে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে শুরু হয় বলে শুনে আসছি। আহ্সান উল্লাহ মাস্টার সিংহভাগ স্থানীয় সাংবাদিককে এক প্লাটফর্মে দাঁড় করানোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালান। ফলে প্রতিবছর গাজীপুর প্রেসক্লাবের শান্তিপূর্ণ নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত কমিটি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।
এরপরও বারবার একটি পাল্টা প্রেসক্লাব ও কমিটি ঘোষণা করা হয়। নিজেদের বিভক্তি নিজেরাই নানা কারণে সৃষ্টি করে যাচ্ছি। নিজেদের কল্যাণ থেকে নিজেরাই নিজেদের বঞ্চিত করে চলেছি।
এখন সাংবাদিক সংগঠনের সংখ্যা, বহুবিধ নাম, নেতৃত্ব সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হলে রীতিমত জোরালো জরিপ চালাতে হবে।
গাজীপুর প্রেসক্লাবের নামে যেন পাল্টা কমিটি কিংবা অন্য কেউ এই নাম ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য জেলা সমাজ সেবা থেকে নিবন্ধন নং গা-০৭৭০ তাং ০৩-০৬-২০১৪ খ্রিঃ নেওয়া হয়। তখন এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৯ (ঊনচল্লিশ) জন।
গঠনতন্ত্রের ধারা ১৫ -এর উপধারা (ঙ) অনুযায়ী নির্বাহী পরিষদে গৃহীত সকল সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম পরবর্তী সাধারণ সভায় অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। কিন্তু ২০১৩-২০১৪ সালে পুরাতন সদস্য বাতিল ও নতুন সদস্য পদ প্রদান এর মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সাধারণ সভা আহবান করে অনুমোদন করিয়ে নেয়নি কার্যনির্বাহী পরিষদ। একই ভাবে নির্বাচন কমিশন গঠন, ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট ভোটার তালিকা প্রস্তুত ইত্যাদি কার্যক্রমের অনুমোদন নেওয়া হয় নি। এরই মধ্যে কার্যনির্বাহী পরিষদ নিবার্চন- ২০১৫ -এর আয়োজন করা হয়। এই নির্বাচন বয়কট করে অপর একটি পক্ষ। প্রতিপক্ষের কার্যক্রম অবৈধ ও বাতিল ঘোষণার ডিক্রি দাবি করে ১ম সিনিয়র জজ আদালত, গাজীপুর -এ দেওয়ানী মোকাদ্দমা নং ৬২/২০১৫ দায়ের হয়। এই মামলার বাদী- মোঃ আতিকুর রহমান গং। বিবাদী/প্রতিপক্ষ- মুজিবুর রহমান গং।
বিভক্তি -ই গাজীপুর প্রেসক্লাবের সাংবাদিক মহলকে মর্মান্তিক বঞ্চনাময় নিয়তির নাগপাশে বেঁধে রেখেছে। যেভাবে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের সংখ্যা বেড়েছে সে হারে বিভক্তি ও মতভেদও বেড়েছে। নানাভাবে সৎ সাংবাদিকতা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে; নামধারী সাংবাদিকের সংখ্যাধিক্য এবং বিতর্কিত কর্মকান্ডের দ্বারা। মূলস্রোত ধারার বিভক্তির ফাঁক গলে এটা হতে পারছে সহজে।
২০০০ সালে দূরদর্শী জননেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি এই দেউলিয়াত্ব থেকে প্রকৃত সাংবাদিকদের রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি অনেকটাই করতে পেরেছিলেন। মূল ভিত্তিটুকু গড়ে দিয়েছিলেন অন্তত। বাকি পথটুকু ঐক্যবদ্ধভাবে চলার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই কাঁধে তুলে নিতে হবে।
কিন্তু তা যখন পারছি নাÑ বারবার মনে পড়ছে সুদৃঢ়-ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সেই নেতাকে। মনে পড়ছে, গাজীপুরের হায়দরাবাদ -এর কৃতিসন্তান আহ্সান উল্লাহ মাস্টারের সেই সব কর্মকান্ড; যা তিনি শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ করতে পারেন নি। অল্পদিনেই সাদামাটা চলাফেরায় সাধারণ মানুষের মনে ভালোবাসা ও গভীর সমীহের স্থান দখল করে নিয়েছিলেন তিনি। মানুষের অকৃত্তিম ভালবাসা ছিল তাঁর প্রতি।
৭ মে, ২০০৪ খ্রি:। প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে জনদরদী নেতা আহ্সান উল্লাহ মাস্টারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা ও অন্যান্য জাতীয় নেতা হত্যার মতই আহ্সান উল্লাহ মাস্টারকে হত্যার মধ্যে দিয়ে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। যা কোনদিনই পূরণ হবার নয়। আমরা মেধাবী ও যোগ্য নেতৃত্বকে হারিয়েছি। কিন্তু তাঁদের কর্মকান্ড ও আদর্শ আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।
আহ্সান উল্লাহ মাস্টারের মৃত্যু বার্ষিকিতে প্রতিবছর সিনিয়র সাংবাদিক আতাউর রহমানের সম্পাদনায় একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয়। ‘শহীদ আহ্সান উল্লাহ মাস্টার এমপি স্মৃতি পরিষদ’ মৃত্যু বার্ষিকিতে মরহুেেমর স্মরণে নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে। স্মৃতি পরিষদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলেন- আহ্সান উল্লাহ মাস্টারের কনিষ্ঠ তনয় যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেল, এমপি। তিনি তাঁর পিতার অসমাপ্ত কাজগুলোর সিংহভাগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট কর্তৃক টঙ্গীতে গত ০৯-১১ এপ্রিল, ২০১৫ খ্রি: পর্যন্ত সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত ‘বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে’র সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব জানান তিনি। বক্তৃতার সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড তুলে ধরেন। এর মধ্যে আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু, টঙ্গীর কয়েকটি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের ব্যবস্থা ও স্টেডিয়াম, টঙ্গী-জয়দেবপুর রেললাইনের পাশ দিয়ে সড়ক নির্মাণ সহ প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণের জন্য অনুদান প্রদান, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাস্তা-ঘাট নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া সাংবাদিকদের পেশাগত মান বৃদ্ধির জন্য যা করণীয় তাও করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন তিনি।
কিন্তু আজ সাংবাদিকদের অবস্থানগত নানা বিভক্তি ও অবহেলার নদী-তীরে দাঁড়িয়ে মনে পড়ছেÑ বড় প্রিয়, বড় আপনজন মনে হওয়া একজন মানুষকে। তিনি ‘আহসান উল্লাহ মাস্টার’। যিনি অল্প সময়ে গাজীপুরবাসীর মনের মনি কোঠায় অন্যরকম ভালবাসার স্থানটি দখল করে নিয়েছিলেন নিজ কর্মগুনের দ্বারা। সাংবাদিকদের দুর্দিনে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই সাংবাদিকদের বড় ভালোবাসতেন। ব্যক্তিগতভাবে প্রায় সব সাংবাদিককেই নামে চিনতেন। সুখে-দুঃখে খোঁজ খবর নিতেন। তাঁর শূন্যতা আজ বড় করুণ সুরে বুকের ভেতর কান্না হয়ে বাজছে।
গাজীপুরে সাংবাদিকগণ ছোট-খাট নানা মতভেদ নিয়ে টুকরো-টুকরো হয়ে আছে। নানা দল-উপদলে বিভক্ত থেকে মন কষ্টের রক্ত ক্ষরণে নিজেরাই ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছেন। এই সময়টায় একজন আহ্সান উল্লাহ মাস্টারকে খুঁজে পাচ্ছি না। মাস্টারের মত সাংবাদিকদের আন্তরিক ভালবাসা দেখাবেন কে? জানি না। হয়তো আছেন কোন ভক্ত বা অনুসারী কিংবা উত্তরসূরি। সময় হলেই এর সঠিক উত্তর জানা যাবে। আমরা কেবল আহসান উল্লাহ মাস্টারের সৎ কর্মগুলোর মূল্যায়ন করার চেষ্টা করতে পারি।
এমপি হয়েও সুযোগ পেলেই রাস্তায় একা হেঁটে চলতেন তিনি। সাধারণের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় করতেন। কোন সমস্যা থাকলে সমাধানের চেষ্টা করতেন দ্রুত। নিজ এলাকার জন-দুর্ভোগ কমাতে মাস্টার সাহেব যেমন সক্রিয় ও আন্তরিক ছিলেন; তেমন নেতার সংখ্যা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। গাজীপুর প্রেসক্লাবের দুর্দিনে তাই বারবার মনে পড়ছে তাঁকে। কারণ, তিনি দেশ ও মানুষকে মনপ্রাণে ভালোবাসতেন। সাংবাদিকদের সহজেই আপন করে নিতেন। সবাইকে একই চোখে দেখতেন।
সৃষ্টিকর্তা তাঁর আত্মার শান্তি দিন। মরহুমের পরিবার-পরিজন যেন মাস্টারের আদর্শকে বুকে ধারণ করে সার্বিক কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করতে পারেন সেই প্রার্থনা করি।
লেখক: প্রধান সম্পাদকÑ সাপ্তাহিক বাংলাভূমি
( ‘ব্র্যাক এ্যাওয়ার্ড-২০১৫’ প্রাপ্ত )
সেল: ০১৭২৬-২০ ৫৩ ০২
E-mail: liton.news@gmail.com
