বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
কয়রা: ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র ছোবলে খুলনার কয়রা উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আজও সে ক্ষতি বয়ে বেড়াচ্ছেন এ জনপদের মানুষ। বিশেষ করে কয়েক হাজার কৃষক পরিবারের দুর্দশা আজও ঘোঁচেনি।
ওই দুর্যোগে পাউবো’র বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানিতে তলিয়ে যায় ফসলের ক্ষেত, চিংড়ি খামার ও বসত বাড়ি। ধ্বংস হয় রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দুর্যোগে প্রাণ হারান ৪১ জন।
ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধসহ অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে কিছুটা সফলতা এলেও আজ অবধি কয়রার কৃষিখাতে তেমন কোন উন্নয়ন ঘটেনি। অধিকাংশ জমিতে ফসল ফলাতে না পেরে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন এলাকার ৩০ হাজার কৃষক পরিবার।
কয়রা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দফতর সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে ঘটে যাওয়া দুর্যোগের আগে এ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে ২৬ হাজার ৬শ’ ২৩ হেক্টর জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষাবাদ হতো। আইলার পরের বছর অর্থাৎ ২০১০-২০১১ অর্থবছরে একটি ইউনিয়ন (আমাদি) বাদে অন্য ৬টি ইউনিয়নে ফসল উৎপাদন শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এর পরের অর্থবছরে ৪ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ সম্ভব হয়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ হাজার ৩শ’ ৭০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এবার বোরো চাষাবাদ হয়েছে ২ হাজার ২শ’ হেক্টর জমিতে। অথচ আইলার আগে চাষাবাদ হতো সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে। উপজেলায় খাদ্য চাহিদা রয়েছে ৩৮ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন (বীজসহ)। খাদ্য উৎপাদন ১০ হাজার ৮শ’ ২৬ মেট্রিক টন (আইলার আগে)। বর্তমানে উৎপাদন ব্যহত হওয়ায় খাদ্যঘাটতি রয়েছে ২৭ হাজার ৪৫৯ মেট্রিক টন।
কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মহসীন আলী জানান, বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা (স্লুইসগেট) সচল না থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ কারণে অনেক আবাদযোগ্য জমিতে চাইলেও কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে পারছেন না। তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও পানি স্বল্পতার কারণে বোরো আবাদও আগের মত হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় খাদ্যঘাটতি কমান সম্ভব হয়ে উঠছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই দুর্যোগে কয়রা উপজেলায় পাউবোর ১২টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১২১ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে ৮০ কিলোমিটার। এছাড়া ১৬৩ কিলোমিটার পাকা রাস্তা, ৬৮০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পর্যায়ক্রমে সেসব সড়ক ও বাঁধ সংস্কার বা মেরামত কাজ সম্পন্ন হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি স্লুইসগেট সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কৃষকদের অভিযোগ, হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ হলেও কৃষিখাতের উন্নয়নে নেওয়া হয়নি কোন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।
আইলায় কয়রা উপজেলার ৫২ হাজার ৬ শ’ পরিবারের মধ্যে ৪৩ হাজার ৬শ’ ১৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে বসতবাড়ি হারায় ৪২ হাজার ৪৪০ পরিবার।
২০১০ সালের ২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপজেলার বাগালি ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে এসব গৃহহীন মানুষের গৃহনির্মাণ সহায়তার জন্য ২৭ হাজার ৪শ’ পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে অনুদানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এলাকার কৃষিখাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সব ধরনের সহযোগিতার কথাও বলেন তিনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের চার বছর পরও কৃষি জমির সমস্যা সমাধানে তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ এনামুল কবির এসব বিষয়ে জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদের উন্নয়নে এ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারিভাবে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এলাকার মূল সমস্যা পাউবোর বেড়িবাঁধ সংস্কার ও মেরামত করা হয়েছে এবং কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া দুর্যোগে মানুষের আশ্রয় গ্রহণের ব্যবস্থা সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কৃষি জমির পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত স্লুইসগেটগুলো সচলের জন্য সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
