Skip to content

কষ্টের শেষ নেই ছিটমহলবাসীর

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: ‘হামার ছিটমহলে আস্তা-ঘাট (রাস্তা-ঘাট) পুল কিছুই নাই। ঝড়ির দিন আসলে এক হাঁটু কাদো হয়, হামরা চলা ফেরবার করবারই পারি না। হামার গুলার কষ্টের শেষ নেই। বর্তমানত ছিটমহল বাংলাদেশ হইল, সরকারের কাছি দাবি জানাই, হামার এই জঞ্জালগুলো যেন পার করি দেই।’ কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চগড়ের শালবাড়ি ছিটের বাসিন্দা আমেনা বেগম। তার বয়স ৮০ বছর। ১৮ মে নিজ বাসায় কাছে বর্ণনা করার সময় খানিকটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। আমেনা বেগমের মতো এমনই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলায় অবস্থিত ছিটমহলের হাজারও বাসিন্দা।
বিভিন্ন ছিটমহল সরেজমিন ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কার্যত ছিটমহলে রাস্তা-ঘাট না থাকার কারণে ৬৮ বছর ধরে কয়েক হাজার বাসিন্দা সীমাহীন কষ্টের মধ্যে বসবাস করে আসছেন। বর্ষার সময় ছিটমহলের কথিত রাস্তাঘাটে হাঁটু-সমান কাদা তৈরি হয়। আবার কোনো কোনো বছর বন্যায় তলিয়ে যায় এসব ছিটমহল। তখন আরও বেশি কষ্ট ভোগ করতে হয় ছিটমহলবাসীর।
অন্যদিকে, ভালো রাস্তা-ঘাট না থাকায় ছিটমহলের কৃষকরা তাদের ফসল বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারেন না। তাই মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম মূল্যে ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। শুধু তাই নয়, রাস্তা না থাকায় রাতে অনেকে গুরুতর অসুস্থ হলেও তাকে হাসপাতালে নিতে পারেন না তারা। এভাবে বিনা চিকিৎসায় ছিটমহলের অনেক নারী-পুরুষ অকালে মারাও গেছেন- এমন অনেক ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ প্রসঙ্গে কুড়িগ্রামের দাসিয়েরছড়া ছিটমহলের বাসিন্দা বনিজ ব্যাপারী বলেন, ‘ঝড়ির দিন আসলে হামার খুব কষ্ট হয়। নাও দিয়া কলার গছের ভুড়া তৈয়ার করিয়া পারাপার হই। মাঝে মাঝে ওইল্যা যখন থাকে না নদী সতরিগে পার হই।’
ঘোড়া-ভেলা-নৌকা-বাঁশের সেতু : লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলায় অবস্থিত ছিটমহলগুলো সরেজমিন দেখা যায়, ছিটমহলে নামেমাত্র রাস্তা রয়েছে। বাস্তবে কোনটি রাস্তা তা বোঝার কোনো উপায় নেই। তবে কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত হাজারও ছিটমহলবাসীর নিত্যসঙ্গী ঘোড়া আর গরুর গাড়ি। মাঠ থেকে ধান আনা-নেয়ার কাজে ঘোড়া ও গরুর গাড়ি ব্যবহৃত হয়।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলায় অবস্থিত উপেন চৌকি ছিটমহলের বাসিন্দা আবদুল জব্বার বলেন, ‘ঝড়ির দিনে ছোট ছোট ছোয়া-পোয়া নিয়ে খুব কষ্টে পারাপার হই ব্যাহে। হামরাগুলো যখন বাজারত যাই কাদো-রাস্তা চ্যাড়াৎ করিয়া গাত উঠে। তাকে ধরিয়া বাজারত যাইয়া জিনিস কিনিয়া আনি ব্যাহে।’
ছিটমহলবাসীর ভাষ্যমতে, বর্ষাকালে ছিটমহলগুলো একেবারে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। শিশুদের নিয়ে চরম বিপদে থাকেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতেও ছিটমহলের বাসিন্দাদের অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করতে হয়।
জানতে চাইলে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের সভাপতি মইনুল হক বলেন, ‘যুগের পর যুগ ছিটমহলগুলোতে রাস্তা-ঘাট নেই। নেই কোনো সেতু-কালভার্ট। বর্ষাকালে ছিটের মানুষের কত যে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয় তা বাস্তবে না দেখলে বোঝানো যাবে না। আমাদের দাবি, অবিলম্বে সরকার যেন ছিটমহলের রাস্তা-ঘাট, সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করে দেয়।’
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় যুগের পর যুগ গরিবানা হালে বসবাস করতে হচ্ছে ৩৭ হাজার ছিটমহলবাসীকে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পঞ্চগড়ের শালবাড়ি ছিটের বাসিন্দা আতিয়ার রহমান বলেন, ‘রাস্তা না থাকার কারণে আমাদের ছিটের কোনো উন্নয়ন হয় না। ধান উৎপাদন করলেও তা বাজারে নিয়ে যেতে পারি না। যে কারণে বাজার দর থেকে অনেক কম দামে ধান বিক্রি করে দিতে হয়। বছরের পর বছর এমন কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে।’
ছিটমহলবাসীর ভাষ্য, শুধু রাস্তা না থাকার কারণে ছিটের অনেক লোক বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। রাতে কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে অবর্ণনীয় কষ্ট করতে হয়। কারণ ছিটের মধ্যে কোনো অ্যাম্বুলেন্স কিংবা কোনো ধরনের যানবাহন প্রবেশ করতে পারে না।
নীলফামারী জেলায় অবস্থিত বড় খানকি ছিটমহলের বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, ‘আইতর বেলা যদি কোনো ব্যাডি ছোয়া মানুষের প্রসব বেদনা উঠে তাহলে ব্যায় হামরা রাস্তা-ঘাটের খারাপ যাবারই পারি না। রাস্তাঘাট খারাপ থাকার কারণে সময়মতো ডাক্তার না দেখবার কারণে অনেকে মারাও গ্যাছে ব্যাহে। ছিটমহল কুড়িগ্রামের দাসিয়ের ছড়া ছিটের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বলেন, যুগের পর যুগ আমাদের ছিটমহলে রাস্তা-ঘাট নাই। আর এটাই ছিটের মানুষের বড় দুঃখ।
-যুগান্তর।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫