বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ।।
ঢাকা : পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি আবারো নারায়ণগঞ্জের দিকে। আবারো লাশ, আবারো রক্তের স্রোত। আবারো কান্না। আবারো স্বজন হারানো মানুষের গগণবিদারী চিৎকার। শোকের মাতম।
মেধাবী ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা কেউ-ই এখানে নিরাপদ নয়। ঘাতকের হিংস্র থাবার বাইরে এখানে কেউই নয়। ঘর থেকে বেরিয়ে আবারো ঘরে ফিরতে পারা নিয়ে নিশ্চিত সংশয়।
খুনের ব্যবসা এখানে জমজমাট। রাষ্ট্রীয় এলিট বাহিনী থেকে শুরু করে টোকাইরা পর্যন্ত খুনি হিসেবে ভাড়া খাটেন। এক হাতে টাকা দাও, আরেক হাতে লাশ নাও। তা সে সবচেয়ে মেধাবী নিষ্পাপ ছাত্রই হোক কিংবা হোক ত্যাগী কোনো রাজনৈতিক নেতা। হোক নিষ্পাপ শিশু কিংবা তরতাজা যুবক। ধারালো অস্ত্র কিংবা গুলির ক্ষুধা মেটাতে প্রস্তুত থাকতে হয় সবাইকেই।
কারণগুলো কিন্তু সাধারণ। সেই জমি আর পারিবারিক বিরোধ, অর্থ লেনদেন, জমি দখল ও পাল্টা দখল। এর সঙ্গে রয়েছে পরকীয়া প্রেম-বিয়ে। কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। এর জের ধরেই চলছে অপহরণ, গুম ও হত্যাকাণ্ডের ‘উৎসব’। রক্তের এ হলিখেলা চলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকা, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও, বন্দর আড়াইহাজারে। আর লাশের ভাগার হিসেবে তো ভালোই পরিচিতি পেয়েছে শীতলক্ষ্যা নদী।
এসব হত্যাকাণ্ডের কুলকিনারা করতে প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেখা গেছে শম্বুক গতিতে কাজ করতে। তারা না পারে অপহৃত ব্যক্তিদের ‘আস্ত’ উদ্ধার করতে, না পারে দোষীদের টিকিটি ধরতে।
আজ থেকে কুড়ি বছর আগে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে ২২ জনের প্রাণহানি ঘটে। তত্কালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে টানা ২২ দিনের অসহযোগ আন্দোলনে সরকার ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটে। গড়ে প্রতিদিন একটি করে লাশ পড়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকেই সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে দেশব্যাপী চিহ্নিত হয় নারায়ণগঞ্জ।
এরপর ধীরে পদক্ষেপে লাশের মিছিলে কেটে যায় দেড় যুগ। ১৯১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঘটে আরেকটি রেকর্ডভাঙা ঘটনা। পৌর কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত জনকে অপহরণ করে র্যাব সদস্যরা। তিনদিন পর ২৯ এপ্রিল সাত জনেরই মৃতদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে। বিপুল টাকার বিনিময়ে র্যাব-১১ এর অধিনায়ককে ভাড়া করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। সন্ত্রাসের জনপদের খেতাব থেকে আরেক ধাপ ‘এগিয়ে’ এক সময়ের প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত রায়ণগঞ্জ।
২০১৩ সালের ৮ মার্চ মেধাবী স্কুলছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ বস্তবন্দি করে ভাসিয়ে দেয়া হয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। সম্ভাবনাময় এ মেধাবী কিশোর খুনের ঘটনায় নগরের সর্বস্তরের মানুষ শোকে পাথর হয়ে যায়। আর এ খুনের মধ্য দিয়েই ঘটতে থাকে নৃশংসভাবে স্কুলছাত্র হত্যার ধারাবাহিক ঘটনা।
একই বছরে (২০১৩) ১৯ এপ্রিল রাতে সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়নের ঝাউগড়া এলাকার নিজ বাড়িতে খুন হন পিরোজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের স্ত্রী, শ্যালক ও বাড়ির দুই গৃহপরিচারিকা। ওই ঘটনায় শামীম আহমেদ নামে এক আসামি সোনারগাঁ থানায় নির্যাতনের কারণে নিহত হয়।
তবে শিশু-কিশোরদের রক্তে নারায়ণগঞ্জ সবচেয়ে বেশি সিক্ত হয়েছে ২০১৪ সালেই। বছরের শুরুর দিকে মার্চ-এপ্রিল মাসেই চার স্কুলছাত্র খুন হয়। অপরণের পরে মুক্তিপণ আদায়, পূর্বশত্রুতা ও তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে তাদের প্রাণ দিতে হয়।
গত ২৯ জানুয়ারি মোটা অংকের মুক্তিপণের জন্য স্কুলছাত্র ইমনকে (১৪) অপহরণ করে তারই চাচাতো ভাই আল আমিন। ৩৫ দিন পর ডোবা থেকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার হয়। ২ ফেব্রুয়ারি একটি মোবাইল ফোন নিয়ে মোস্তফা (১২) নামে স্কুলছাত্র খুন হয় তারই বয়সী খেলার সঙ্গীদের হাতে। আগের দিন ১ ফেব্রুয়ারি রূপগঞ্জ থেকে নাঈম (১৪) নামে অপর ছাত্রের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
একই বছরের ২১ জানুয়ারি কাঁচপুর থেকে অপহরণের শিকার হয় স্কুলছাত্র জাহিদুল ও সাকিন। পরদিন ভারগাঁও বেড়িবাঁধ থেকে জাহিদুলের লাশ উদ্ধার হয়। পাঁচদিন পর ২৬ জানুয়ারি মোল্লা বাড়ির বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে সাকিনের গলাকাটা বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার হয়।
২০১৩ সালের ১৩ জুন ফতুল্লার দুর্গম চরাঞ্চলে স্কুলছাত্র ইমনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে লাশ ৯ টুকরা করে ধঞ্চে ক্ষেতের পানিতে লুকিয়ে রাখা হয়। ২৩ নভেম্বর শহরের মাসদাইর আদর্শ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সিয়ামকে হত্যার পর লাশ মুন্সিগঞ্জে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়। ৮ নভেম্বর গভীর রাতে স্কুলছাত্র সালমান খুন হয়। ৭ সেপ্টেম্বর সিদ্ধিরগঞ্জে ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র রমজানকে খুন করা হয়। ২২ জুলাই আড়াইহাজারে স্কুলছাত্র মাহাবুবকে হত্যার পর নাক ও কান কেটে নেয়ার পাশাপাশি চোখ উপড়ে ফেলা হয়। ৯ জুলাই ফতুল্লায় নবম শ্রেণির ছাত্র নাজমুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রেম নিয়ে বিরোধে ৩ জুলাই দ্বাদশের ছাত্রী মৌসুমীকে (১৮) পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
কোনো সমাজে যখন অবাধে শিশুখুনের ঘটনা ঘটে তখন ধরে নিতে হবে মূল্যবোধের চরম বিপর্যয় ঘটেছে। আর তখন দেখা যায় এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিতে থাকে পুলিশ। খুনিরা যখন প্রকাশ্যে ঘুরে বড়ায় তখন বিচার চাওয়ার প্রবণতাও কমে আসে। আর সে কারণেই জনগণ হাতে তুলে নেয় আইন। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জে গণপিটুনিতে ৮ ডাকাত নিহতের ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত।
তবে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিককে প্রকাশ্যে অপহরণের পর তাকে উদ্ধারের ঘটনাটিকে ব্যতিক্রম হিসেবেই মনে করেছেন অনেকে।
২০১৪ সালের ২৮ মার্চ সোনারগাঁওয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেনকে। ওইদিনই রূপগঞ্জের স্কুলশিক্ষক মেহেদী হাসানকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এর সাতদিন পর ৪ এপ্রিল রূপগঞ্জের বালু নদী থেকে নিখোঁজ এশিয়ান ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার শিক্ষক রাজীব আহাম্মদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দুদিন পর ৬ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শহরের ব্যবসা কেন্দ্র নিতাইগঞ্জের নায়না ফ্লাওয়ার মিলের ভেতর থেকে গলাকেটে হত্যা করা নৈশ প্রহরী আবদুল আজিজ ও হেলপার হোসেন মিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া একই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ব্যবসায়ী, গৃহবধূ, ছাত্রসহ অর্ধডজন লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ডোবা আর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে। এসব লাশের মিছিলে রয়েছে অজ্ঞাত পরিচয় শনাক্তহীন অসংখ্য লাশ।
অজ্ঞাত পরিচয় অনেক লাশের মধ্যে সিংহভাগই কিশোরী কিংবা তরুণীর। বেশিরভাগই ধর্ষণ, গণধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধ করে হত্যা। যার মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিকরাও।
পুলিশ, র্যাব আর গোয়েন্দাদের দাবি, জেলার বাইরে হত্যা করে লাশ নারায়ণগঞ্জ জেলা হাইওয়ে এবং নদী এলাকায় ফেলে রাখা হচ্ছে। অপরাধীরা ওই স্থানগুলোকে লাশ ফেলার নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচনা করছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, জেলায় সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হয় সিদ্ধিরগঞ্জ, রূপগঞ্জ, ফতুল্লা ও সোনারগাঁও থানায়। একশ্রেণির মিল কারখানার মালিকদের দখলদারিত্বের লড়াই, ভুমিদস্যুদের দৌরাত্ম্য, জাল-জালিয়াত চক্র, তাদের গডফাদারদের ইশারায় এসব এলাকায় অপরাধ বেশি হচ্ছে। তাছা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে অপরাধীদের বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ তো রয়েছেই।
পাশাপাশি, অপরাধ রোধে নিজেদের দায়িত্ববোধ নিয়েও ধীরে ধীরে উদাসীন হয়ে পড়ে জেলার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। জনগণকে নিরাপত্তা দেয়ার ব্যাপারে তারা যে মোটেই সিরিয়াস নয়, তা প্রমাণ পাওয়া যায়।
এমন অভিযোগের সত্যতা দেখা গেছে শনিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ সদরের বাবুরাইলে একই পরিবারের পাঁচ জনকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায়। রক্তাক্ত লাশ দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়া এক ব্যক্তি থানায় ফোন করলে, চরম ঠাট্টার সুরে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা সাফ বলে দেন, আগে হাফানো বন্ধ করেন, তারপর ফোন দেন। একথা বলেই ফোন কেটে দেন পুলিশ কর্মকর্তা। ঘটনা ছোট্ট হলেও এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে নারায়ণগঞ্জে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ।
এসব কারণেই কি ভীতি আর আতঙ্কের নগরীর পর রক্তের নগরীর হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ? প্রতিদিনই দেখতে হচ্ছে রক্ত। শুনতে হচ্ছে গুম আর অপহরণের শিকার ব্যক্তির আত্মীয় স্বজনদের হাহাকার। সারাক্ষণই থাকতে হচ্ছে আতঙ্কে। এই বুঝি দুঃসংবাদ এলো।
নারায়ণগঞ্জের সুশীল সমাজের নেতারা বলছেন, একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও কোনো ঘটনার বিচার হচ্ছে না। আর এতে পরবর্তী অপরাধ ঘটাতে খুনিরা উত্সাহিত হচ্ছে।
