বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: দেশের অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের পথে অংশীদার হতে এগিয়ে আসেছে পৃথিবীর অনেক অর্থনৈতিক শক্তি। এদের সবাই হয়তো মেগা শক্তি নয়, তবে জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ। তেমনই দুই দেশ পূর্ব ইউরোপের পোলান্ড ও ও আলবেনিয়া। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার জার্মানি ও ফ্রান্স থেকে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে নিতে দেশ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কেবল ইউরোপকে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার তৈরিতে সহায়তাই নয়, দেশ দু’টি এবার বাংলাদেশের অর্থনীতির ভীত মজবুত করতে অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরের সময় পোল্যান্ডের ডেপুটি অর্থমন্ত্রী রাদোস্লাভ দোমাগালস্কি লেবেদস্কি বাংলাদেশের খনি শিল্পের উন্নয়নে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ইচ্ছা পোষণ করেন। বিশেষ করে জ্বালানি শক্তির বিকাশে দেশটি বাংলাদেশের কয়লা খনিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহ প্রকাশ করে।
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এ বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, বংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মকাল থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে পোল্যান্ডের সাথে আমাদের সম্পর্ক রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর স্বাধীন পোল্যান্ড ৯০ দশক থেকেই বিভিন্ন ভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশটি আমাদের কয়লা খনির উন্নয়নে সব ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়েছি। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে পোল্যান্ড খনি, জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ ভারী শিল্পে সমৃদ্ধ। আমরা অবশ্যই তাদের অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ব্যবসা সম্প্রসারণে পোল্যান্ড এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এরইমধ্যে আমাদের বাণিজ্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারে পৌছেছে- যা কয়েক বছরের মধ্যে কয়েক গুণ বাড়বে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৯২ সালের ২১ জুন স্বাধীন পোল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক চুক্তি সই হয়। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অন্যতম সদস্য দেশ হিসেবে পোল্যান্ড বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধাসহ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। এসব সুবিধার কারণে ব্যবসা বর্তমানে বাংলাদেশের অনুকূলে রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, ২০১০-১১ সালে পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১৭৫ কোটি মিলিয়য়ন ডলারের বেশি। আর সে দেশ থেকে আমদানি ছিল ৫০ মিলিয়ন ডলারের। ২০১২-১৩ সালের হিসেব অনুযায়ী, দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৪৩০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ৫৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে এটা দাঁড়িয়েছে রপ্তানিতে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলার ও আমদানিতে মাত্র সাড়ে ৩৯ মিলিয়ন ডলার।
পোল্যান্ডের সহকারী ডেপুটি অর্থমন্ত্রী রাদোস্লাভ দোমাগালস্কি লেবেদস্কি তার বাংলাদেশ সফরের সময় বাণিজ্যমন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ার সমুহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক শক্তি ও রপ্তানির হাব হতে চায় পোল্যাণ্ড। দেশটির ভৌগলিক অবস্থান ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাই এই ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে সেক্ষেত্রে বেসরকারি রপ্তানিকারকদেরই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে হবে। বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের নিয়মিত পোল্যান্ড ভ্রমণেরও আমন্ত্রণ জানান তিনি।
তিনি জানান, ২০০৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দেওয়া ১৫টি দেশের মধ্যে ১৪টির সমান এখানকার জনসংখ্যা। পোল্যান্ডের পশ্চিমে জার্মানি, দক্ষিণে চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া, পূর্বে ইউক্রেন ও বেলারুশ, উত্তরে বাল্টিক সাগর, লিথুনিয়া ও রাশিয়া। বাল্টিক সাগরের সাথে, আবার ডেনমার্কের সাথে পোল্যান্ডের নৌ-সীমান্ত রয়েছে। ফলে, এ অঞ্চলে দেশটির বাংলাদেশের রপ্তানি হাব হওয়ার সব সুযোগই রয়েছে। ওয়ারশ’ (পোল্যান্ডের রাজধানী)ঢাকাকে সাথে নিয়ে এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।
রাদোস্লাভ দোমাগালস্কি লেবেদস্কি সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে বাংলাদেশের কয়লা খনিতে তার দেশের আগ্রহের কথা জানিয়ে বলেন, পোল্যান্ড ইউরোপের প্রধান কয়লা উৎপাদনকারী দেশ। কয়লা শিল্পে আমাদের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা প্রাচীন। বাংলাদেশের খনিগুলোতে মজুদ কয়লার মান খুবই উন্নত হওয়ায় এই কয়লা এদেশের বিদ্যুৎ খাতকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করাতে সক্ষম। আমরা এক্ষেত্রে বিনিয়োগের মাধ্যমে আমাদের দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরো গভীর করতে চাই।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কেবল কয়লা খনির উন্নয়নই নয়, পোল্যান্ড বাংলাদেশের টেক্সটাইল, সিরামিকস, চামড়া, ফার্মাসিউটিক্যাল ও শিল্প প্রযুক্তি খাতেও বিনিয়োগ করতে চায়।
কেবল পোল্যান্ডই নয়, বাংলাদেশের অবকাঠামো ও ভারী শিল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছে পূর্ব ইউরোপের আর এক দেশ আলবেনিয়াও। দেশটির প্রধান বেসরকারি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান সলিলারী লিমিটেড। গত সপ্তাহে (১ মার্চ) শিল্প মন্ত্রণালয়ে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সাথে দেখা করে বাংলাদেশের নদী খনন, বন্দর উন্নয়ন, রেল ও সড়ক খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে দেশটির প্রধান বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি।
সলিলারী লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী পিলাম্ব সলিলারী, মহাব্যবস্থাপক আরজান স্কেনদেরি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ব্যবস্থাপক এরভিস সলিলারী, সড়ক যোগাযোগ ও রেলওয়ে অবকাঠামো বিভাগের পরামর্শক ড. ফারুক কাবা, মহাপরামর্শক হিমেল জাংশি বিনিয়োগের এই আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আলবেনিয়ার উদ্যোক্তারা বলেন, সলিলারি লিমিটেড আলবেনিয়ার একটি শীর্ষ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় শিল্প খাতেও বিনিয়োগ করবে।
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের ছোট একটি দেশ আলবেনিয়া। বলকান উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে দেশটির অবস্থান। আলবেনিয়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ঘিরে রেখেছে মন্টিনেগ্রো, উত্তর-পূর্বে কসোভো, পূর্বে মেসিডোনিয়া এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গ্রিসের অবস্থান। আলবেনিয়ার পশ্চিমে রয়েছে অ্যাড্রিয়াটিক সাগর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে আয়োনীয় সাগর। আলবেনিয়ার বেশির ভাগ এলাকাই পার্বত্যভূমি। অবশিষ্ট সমভূমির খুব অল্প অংশই কৃষিকাজের উপযোগী। ফলে, দেশটি শিল্প ও অবকাঠামো খাতে উন্নয়নের মাধ্যমে ইউরোপে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। আলবেনিয়া জাতিসংঘ, ন্যাটো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) সদস্য।
পোল্যান্ড ও আলবেনিয়ার বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং দেশ দুটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন প্যারিসে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত শহীদুল ইসলাম খান।
বাংলানিউজকে তিনি বলেন, এখনো ফ্রান্স ও জার্মানি বাংলাদেশের রপ্তানির বড় বাজার। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষাপটে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। ফ্রান্স থেকে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো তাদের বাংলাদেশ ভিত্তিক ব্যবসা পোল্যান্ডে স্থানান্তর করছে। অন্যদিকে আলবেনিয়া তাদের অর্থনৈতিক শক্তি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ফলে দেশ দুটির বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক আগ্রহ ইউরোপে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক স্বার্থকে মজবুত করবে। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
