বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পড়ছে নিত্যনতুন সফটঅয়্যার। আর এ চাহিদার ভিত্তিতে দিন দিন দেশে গড়ে উঠছে সফটঅয়্যারের একটি বিশাল বাজার। কিন্তু এ বাজারের সিংহভাগই দখল করে আছে বিদেশি কোম্পানি। অনেক ক্ষেত্রে দেশি কোম্পানিগুলোর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও নানা শর্তের মারপ্যাঁচে তারা সফটঅয়্যারের জোগান দিতে পারছে না। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সফটঅয়্যার কেনার দরপত্রে এমন সব শর্তারোপ করে, যার ফলে দেশি কোম্পানিগুলো চাইলেও ওইসব দরপত্রে অংশ নিতে পারে না। এদিকে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও দেশ থেকে না কিনে বিদেশ থেকে সফটঅয়্যার আমদানিতে আগ্রহী বেশি। কারণ এর মাধ্যমে সহজেই দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করা যায় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণত বিদেশ থেকে সব ধরনের কোম্পানির সফটঅয়্যার আমদানি করা হয়। কিন্তু এসব সফটওয়্যার ব্যবহারে রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। কারণ আমদানিকৃত অনেক নামিদামি কোম্পানির সফটওয়্যারেই সোর্স কোড থাকে না। এতে সফটওয়্যারে কোনো জটিলতা দেখা দিলে বা কাজের প্রয়োজনে এটি সংশোধন বা পরিবর্ধন করতে হলে সংশ্লিষ্টদের ওই কোম্পানির শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। আর নামহীন কোম্পানি হলে ভোগান্তি আরও বাড়ে। মূল কথা হলো, এ নিয়ে সময় ও অর্থ দুই-ই অপচয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে দেশি কোম্পানিগুলোকে সুযোগ দিতে হবে সরকারকে। এ জন্য প্রচলিত নীতিমালা পরিবর্তন করলেই এগিয়ে যাবে দেশের সফটঅয়্যার খাত।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটঅয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) জরিপমতে, দেশ যত ডিজিটাল হচ্ছে, সফটওয়্যারের ব্যবহার তত বাড়ছে। দেশে এখন বছরে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার সফটঅয়্যারের বাজার আছে। প্রতিবছরই এ বাজার বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে সফটঅয়্যার আমদানি। বর্তমানে মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ সফটঅয়্যারই আমদানি করা হচ্ছে। এ হিসাবে বছরে আমদানি হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার সফটঅয়্যার। বাকি ৬৪০ কোটি টাকার সফটঅয়্যার দেশীয়ভাবে জোগান দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আরও সফটঅয়্যার আসছে। এদিকে স্থানীয় বাজারে চাহিদা থাকলেও দেশি কোম্পানিগুলো তাদের তৈরি সফটঅয়্যার বিদেশে রপ্তানি করে বছরে প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা আয় করছে। এই আয় প্রতিবছরই বাড়ছে। জানা গেছে, ২০২১ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার বা ৪০ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
দেশের সফটঅয়্যার খাত প্রসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলেন, এ শিল্প যে হারে বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হতে পারেনি নীতিগত ও কৌশলগত কারণে। অভ্যন্তরীণ বাজারে সফটঅয়্যারের চাহিদা বাড়লেও দেশি কোম্পানিগুলোকে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা করে না সরকার। কারণ সরকার সফটঅয়্যার কিনলে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে কেনে। এতে দেশি কোম্পানিগুলো বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ শিল্প মেধাভিত্তিক। মেধা সংরক্ষণ না করতে পারলে এর বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা কমে যায়।
সফটঅয়্যার খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে জানিয়ে মোস্তাফা জব্বার বলেন, এটি করতে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে না। স্কুল-কলেজ ও পলিটেকনিকগুলো থেকেই এ বিষয়ে মেধা তৈরি করা সম্ভব। বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে পুরো দেশ কম্পিউটারাইজড করা সম্ভব। আর মেধা তৈরি করতে হলে অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। বর্তমানে যারা এ খাতে কাজ করছেন, তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই দক্ষ হয়েছেন।
সূত্র জানায়, সরকারের জোরালো সহযোগিতা পেলে এ শিল্প থেকে বছরে ১০০ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব। কিন্তু দেশের সফটঅয়্যার বাজার আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশি কোম্পানিগুলোকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। দেশে মোবাইল ফোন কোম্পানি, ব্যাংক, স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে বেশিরভাগ বড় বড় করপোরেট হাউস ব্যবহার করছে বিদেশি সফটঅয়্যার। তবে সীমিত আকারে কিছু দেশি সফটঅয়্যারও তারা ব্যবহার করছে। এসব সফটওয়্যারের দাম পড়ে এক কোটি থেকে শুরু করে শত কোটি টাকার ওপরে। ফলে ফি-বছর হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিদেশে।
এ খাতের উদ্যোক্তারা জানান, সরকারের কোনো কাজ পেতে হলে আগে দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে হয়। কিন্তু দরপত্রে এমন কিছু কঠিন শর্তারোপ করা হয়, যাতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর পক্ষে দরপত্রে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তারা বলেন, এ অবস্থার নিরসনে এবং দেশি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে নিতে হলে অবশ্যই পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসে (পিপিআর) সংশোধনী আনতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি দেশি কোম্পানিগুলো যেন ৫০ শতাংশ কাজ পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া যেসব বিদেশি কোম্পানি সফটঅয়্যার সরবরাহ করার দরপত্রে অংশ নেবে তাদের স্থানীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথ মালিকানা থাকতে হবে। তাহলেই বিকশিত হবে দেশি কোম্পানিগুলো। প্রতিবেশী দেশ ভারত এ ধরনের নীতিমালা করেই তাদের আইটি খাত অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ১ হাজার ১০০ কোম্পানি সফটঅয়্যার তৈরি করছে। সরকার উৎসাহমূলক পদক্ষেপ নিলে এই উদ্যোক্তারা আরও এগিয়ে যাবেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটঅয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি শামীম আহসান বলেন, বেসিসের জরিপ অনুযায়ী নিজস্ব সফটওয়্যারের চাহিদার ৮০ শতাংশই মেটাতে সক্ষম বাংলাদেশ। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবিসহ বিদেশি অর্থায়নে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, সেখানে এমন সব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়, যে কারণে দেশি কোম্পানিগুলো দরপত্রে অংশ নিতে পারে না। এ নীতি সংশোধন করে দেশি কোম্পানিগুলোকে সুযোগ দিলে এই শিল্প দ্রুত এগিয়ে যাবে।
