Skip to content

তনুর মাথার আঘাত লুকানোর চেষ্টা!

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥

কুমিল্লায় নিহত কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মাথায় আঘাতের চিহ্ন নিয়ে চলছে লুকোচুরি। তার বাবা ইয়ার হোসেন গতকাল মঙ্গলবার টেলিফোনে সমকালকে জানান, তিনি যখন প্রথম মেয়ের মরদেহ দেখেন, তখন তার মাথার পেছনের দিকে ফোলা ও থেঁতলানো ছিল। রক্ত ছিল নাকের নিচে। তনুর মরদেহ উদ্ধারের দু’দিন পর তার বন্ধুরা তনুর বাবার বক্তব্য রেকর্ড করেন। সে রেকর্ডেও দেখা যায়, তনুর বাবা বুক চাপড়িয়ে জোর দিয়েই বলছেন, তনুকে মাথার পেছন থেকে আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু সুরতহাল রিপোর্টে মাথায় আঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়নি। গতকাল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান কে পি সাহাও সাংবাদিকদের জানান, তনুর মাথায় আঘাতের কোনো চিহ্ন তারা পাননি। সাংবাদিকরা তনুর বাবার বক্তব্য উল্লেখ করে জানতে চাইলে কে পি সাহা বলেন, তিনি আইনগত অনেক বাধার মধ্যে আছেন। যেহেতু আদালত নতুন করে ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, সে কারণে তিনি এ মুহূর্তে প্রথম সুরতহাল কিংবা ময়নাতদন্ত নিয়ে এর বেশি মন্তব্য করতে পারবেন না।

তদন্ত সূত্রগুলো বলছে, তনুর মৃত্যু কোথায় এবং কীভাবে আঘাতের ফলে হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া গেলে চাঞ্চল্যকর এ হত্যারহস্য উন্মোচন সহজ হবে। সূত্রগুলো জানায়, গোয়েন্দা পুলিশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে রেখে তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু ঘটনাস্থল সংরক্ষিত হওয়ার কারণে তারা স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যে তদন্ত করতে পারছেন না। যদিও কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ কে এম মনজুরুল আলম সমকালকে জানান, তদন্ত স্বাভাবিকভাবেই হচ্ছে এবং এ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে। অন্যদিকে চাঞ্চল্যকর এ মামলা সিআইডি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে ডিবি মামলার তদন্ত করছিল। সিআইডির তদন্ত দল গতকালই কুমিল্লা পৌঁছেছে। জানা গেছে, পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য আজ বুধবার তনুর মরদেহ কবর থেকে তোলা হতে পারে। এ জন্য কুমিল্লা জেলা সদরের ইউএনওকে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। গতকালও তনুর সহপাঠী ও সতীর্থরা ভিক্টোরিয়া কলেজে বিক্ষোভ করেছেন। তনুর খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে তারা গণস্বাক্ষরও সংগ্রহ করেছেন। ভিক্টোরিয়া কলেজে তনুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে গতকাল মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে যেসব প্রশ্ন :তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, তনুর হত্যাকাণ্ড কীভাবে, কোন ধরনের আঘাতের ফলে হয়েছেথ তা উদ্ঘাটন সবার আগে জরুরি। তনুর বাবা তদন্তকারীদেরও জানিয়েছেন, তনুর মাথার পেছনে আঘাতের দাগ ছিল। নাকেও জখমের দাগ ছিল। কিন্তু প্রথম সুরতহাল রিপোর্টে এ আঘাতের উল্লেখ নেই। সেখানে শুধু বাঁ কানের নিচে, মুখের বাঁ পাশে এবং ডান হাঁটুর ওপরে সামান্য আঘাত ও আঁচড়ের দাগ ছিল। ফলে প্রথম সুরতহাল রিপোর্ট থেকে তনুকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সূত্র জানায়, মাথার পেছনের দিকে আঘাতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পেশাদার খুনিরা সাধারণত হত্যার ক্ষেত্রে মাথার পেছন দিকে আঘাত করে থাকে। এ ক্ষেত্রে একটি আঘাতেই মৃত্যু হতে পারে। এ ছাড়া সামনে থেকে পাকা দেয়ালে জোরে ধাক্কা দেওয়া হলেও মাথার পেছনে আঘাত লেগে মৃত্যু হতে পারে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, একটা বিষয় মোটামুটি নিশ্চিত যে তনুর মরদেহ যেখানে পাওয়া গেছে, সেখানে তাকে হত্যা করা হয়নি। অন্য কোথাও হত্যা করে মরদেহ সেখানে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। কারণ, মরদেহের আশপাশে ধস্তাধস্তি কিংবা একাধিক ব্যক্তির পদচারণা ঘটলে জঙ্গলের ছোট ছোট গাছ এবং মাটিতে তার ছাপ থাকবে; কিন্তু তনুর মরদেহ উদ্ধারস্থলে একটি স্থানেও ছোট গাছে কিংবা মাটিতে সে ধরনের চিহ্ন ছিল না। তনুর মরদেহের পাশে কাটা চুল, স্যান্ডেল ও যে দুটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়, তা-ও নির্দিষ্ট দূরত্বে অনেকটা সাজানোর মতো করেই রাখা ছিল। এ ছাড়া তনুর মরদেহ থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে চারটি কনডমের ছেঁড়া প্যাকেট রাখা হয়, যা অস্বাভাবিক এবং সেগুলোও সাজানো বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। তদন্ত সূত্র জানায়, মরদেহ উদ্ধারের স্থলেই ধর্ষণের পর তনুকে হত্যা করা হয়েছেথ এমন একটি ধারণা দিতেই খুনিরা কনডমের প্যাকেট সাজিয়ে রাখে। সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডটি মরদেহ উদ্ধারের স্থলে না অন্য কোথাও হয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়াও খুবই জরুরি।

সূত্র আরও জানায়, এ পর্যন্ত তদন্তে দেখা যায়, ঘটনার দিন বিকেল ৪টার দিকে তনু বাসা থেকে বের হন। প্রথমে তিনি সৈনিক জাহিদুর রহমানের বাসায় প্রাইভেট পড়ান। সাড়ে ৪টার দিকে সেখান থেকে বের হয়ে পাশের সার্জেন্ট জাহিদ হোসেনের বাসায় পড়াতে যান। সেখান থেকে বের হন সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে। সূত্র জানায়, সৈনিক জাহিদ ও সার্জেন্ট জাহিদ দু’জনই তদন্ত দলকে ওপরের সময় পর্যন্ত তাদের বাসায় তনুর উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন। কিন্তু পৌনে ৭টার পর তনু কোথায় গেছেন, তা জানা যায়নি। কারণ সার্জেন্ট জাহিদের বাসা থেকে তনু বের হয়ে কোথায় গেছেন, তা জানার জন্য পাশের ক্যান্টিন, সৈনিক ক্লাব কিংবা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অথবা সেখানে সে সময় উপস্থিত কারও সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তদন্তে সংরক্ষিত এলাকার ভেতরে কেউই এ সম্পর্কে কিছু জানে না বলে জানিয়েছে। ফলে সার্জেন্ট জাহিদের বাসা থেকে বের হয়ে তনু কোথায় গিয়েছিলেন কিংবা কেউ তার সঙ্গে দেখা করেছিল কি-না, কেউ তাকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল কি-না, তার কিছুই জানা যায়নি।

সূত্র জানায়, যেখানে তনুর মরদেহ পাওয়া যায় সেখানে কিংবা তার আশপাশে কোনো সিসিটিভি নেই। কোনো ওয়াচ টাওয়ারও দেখা যায়নি। তবে এ এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা নিয়মিত টহল দেন। এ ছাড়া আবাসিক এলাকার পথ হওয়ায় অনেকেই চলাচল করেন। এখানে রাস্তার পাশে একটি মেয়েকে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হলে, ধস্তাধস্তি হলে কিংবা হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলেও তা কারও চোখে পড়ার কথা। বিষয়টি প্রমাণ করে, তনুকে অন্য কোথাও হত্যা করে এখানে মরদেহ ফেলে রাখা হয়।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন র‌্যাব কর্মকর্তারা :এদিকে, গতকাল র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা তনুর বাবা, মা, ভাই ও স্বজনদের সঙ্গে কথাও বলেন।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান সমকালকে জানান, তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের মামলায় মূল তদন্ত সংস্থার পাশাপাশি র‌্যাব ঘটনার ছায়াতদন্ত করছে। এরই অংশ হিসেবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও নিহতের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা হয়।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫