Skip to content

ভয়ঙ্কর কিলিং মাস্টার জঙ্গি ‘রাজীব গান্ধী’

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥

পুরনো জেএমবির নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ২০১৩ সালের দিকে। সংগঠনের আমির হতে চেয়েছিল উত্তরবঙ্গের কথিত ডাক্তার নজরুল ইসলাম ও কারাবন্দি তাসনিম ওরফে নাহিদ। ওই সময় নজরুলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সংগঠনে পরিচিতি ছিল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের শিবপুর ইউনিয়নের মালঞ্চা গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী। পরে তাকে নিজের গ্রুপে টেনে নেয় তাসনিম। জেএমবির নেতৃত্ব, আধিপত্য, আদর্শিক বিরোধের জের ধরে তাসনিমের নির্দেশে ২০১৪ সালে নজরুলকে হত্যা করে তারই এক সময়ের শিষ্য রাজীব গান্ধী। ‘গুরু’ হত্যার মধ্য দিয়ে টার্গেট কিলিংয়ের হাতেখড়ি হয় জাহাঙ্গীরের। ২০১৪ সাল থেকে উত্তরাঞ্চলে অন্তত ২২ টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় কোনো না কোনোভাবে তার নাম এসেছে। তার নামে মামলা রয়েছে ১৫-২০টি। তার শিকারের তালিকায় রয়েছেন বিদেশি নাগরিক, পুরোহিত ও খ্রিস্টান যাজক। তামিম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয়ের পর পুরনো জেএমবি ছেড়ে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয় রাজীব। গুলশানে হলি আর্টিসানে হামলার আগে উত্তরাঞ্চল থেকে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ওই হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী বলা হয় তাকে। পুরনো জেএমবির সদস্য জাহাঙ্গীর আলমের ‘রাজীব গান্ধী’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে চমকপ্রদ কাহিনী। পুলিশের দাবি, শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে দুর্র্ধষ এ জঙ্গিকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হয়। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল শনিবার সমকালকে এসব তথ্য জানান।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পুরনো জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমানের জামাতা আবদুল আওয়ালের একান্ত সহকারী ছিল রাজীব। পাচক হিসেবে আওয়ালকে রান্নাবান্না করেও খাওয়াত সে। আওয়ালের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর রাজীব ধীরে ধীরে জেএমবির হাল ধরার চেষ্টা করে। জেএমবির কোনো সদস্য আহত বা অসুস্থ হলে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিত উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা নজরুল। তখন থেকে সে সংগঠনে ‘ডাক্তার’ নজরুল হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালে কানাডা ফেরত তামিম চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয় রাজীবের। এরপর নব্য জেএমবির উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সামরিক কমান্ডার হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার সেলে ১০-১২ জন প্রশিক্ষিত জেএমবি সদস্যকে দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিল বাইক হাসান, রাহুল, ডন, ফারদিন ও বাঁধন। একই গ্রুপে ছিল রিপনও। টার্গেট করা যে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারদর্শী হওয়ায় রাজীব হয়ে ওঠে তামিম চৌধুরীর প্রিয়পাত্র। নব্য জেএমবির উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ডার হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে টার্গেট কিলিংয়ে যোগ দেওয়া জঙ্গিরা রাজীব গান্ধীর হাত ধরেই এসেছে। রাজীব একসময় রঙমিস্ত্রির কাজ করত। লেখাপড়া করেছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। এলাকায় থাকার সময় দিনে খুব একটা বাসায় থাকত না। পুলিশের ভয়ে রাতে গোপনে বাসায় যেত।

সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজীব উত্তরবঙ্গে বেশ কিছু হত্যা-হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এর মধ্যে জাপানি নাগরিক কোনিও হোশি, টাঙ্গাইলের দর্জি নিখিল, পাবনার পুরোহিত নিরঞ্জন পাণ্ডে, রংপুরের মাজারের খাদেম রহমত আলী, কুষ্টিয়ার হোমিও চিকিৎসক সানাউর, পঞ্চগড়ের পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর, দিনাজপুরের হোমিও চিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যা এবং শিয়া মসজিদে হামলার ঘটনা রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলে জঙ্গিদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখেন ঢাকার এমন একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সমকালকে জানান, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মে পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলে একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের পর হলি আর্টিসানে হামলার চূড়ান্ত পরিকল্পনার জন্য তামিম চৌধুরীর নির্দেশে ঢাকায় আসে রাজীব। গত বছরের জুনে ঢাকায় আসার পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জঙ্গিদের একটি আস্তানায় স্ত্রী, দুই সন্তানসহ ওঠে রাজীব গান্ধী। সেখানে আগে থেকে অবস্থান করছিল জেএমবির আরেক শীর্ষ নেতা তানভীর কাদেরীর পরিবারের সদস্যরা। হলি আর্টিসানে হামলার দিন বসুন্ধরার বাসায় ছিল রাজীব। হামলা শেষ হওয়ার পরপরই বাসা ছাড়ে তারা।

জাহাঙ্গীর আলম থেকে রাজীব গান্ধী: গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিরা নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে একাধিক ছদ্মনাম ব্যবহার করে। জাহাঙ্গীর আলমের ক্ষেত্রে ঘটেছে একই ব্যাপার। তার ছদ্মনাম দেওয়া হয় ‘রাজীব গান্ধী’। এর কারণ হিসেবে সে জানিয়েছে, হিন্দু নাম থাকলে কেউ জঙ্গি হিসেবে সন্দেহ করবে না। এই নামটি গোয়েন্দারা জানতে পারলেও খুব একটা সন্দেহের চোখে দেখবে না। রাজীব গান্ধী নামেই সংগঠনের সদস্যদের কাছে অধিকাংশ সময় নিজের পরিচয় দিত সে। ওই নামে বিশেষ অ্যাপসে আইডি খুলে সাংগঠনিক নির্দেশনা দিত। এ ছাড়া সুভাষ, শান্ত, টাইগার, জাহিদ ইত্যাদি নামেও সে কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল।

দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, হলি আর্টিসানে হামলার পর তামিম চৌধুরী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলার জন্য দায়িত্ব দেয় রাজীব গান্ধীকে। তবে গুলশান হামলার পর পুলিশ-র‌্যাবের টানা অভিযানের কারণে ওই হামলার ছক বাস্তবায়ন করতে পারেনি সে। গুলশানে হামলার পর পালিয়ে টাঙ্গাইল, রাজশাহীতে থেকেছে সে।

জানা গেছে, রাজীবের মাধ্যমে গুলশানের হামলায় জড়িত শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিকাশ ও খায়রুল ইসলাম পায়েল ওরফে বাঁধন জঙ্গি কর্মকাে  যুক্ত হয়। কিছুদিন তাদের প্রশিক্ষণও দেয় সে। এ ছাড়া শোলাকিয়ার হামলায় গ্রেফতার শফিউলও তার মাধ্যমে নব্য জেএমবিতে আসে। পরে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শফিউল নিহত হয়। ২০১৫ সালে স্ত্রী-সন্তানসহ নব্য জেএমবিতে ‘হিজরত’ করে রাজীব।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ছানোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ইতিহাসে রাজীব গান্ধী এক দুর্র্ধষ নাম। তার মতো নিখুঁত টার্গেট কিলিং কেউ ঘটাতে পারে না। টার্গেট কিলিংয়ে সে মাস্টার। এরই মধ্যে ২২টি হামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেলেও এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার সমকালকে বলেন, রাজীব গান্ধীর আসল বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটার পশ্চিম রাঘবপুরের ভুতমারিতে। তার বাবা মাওলানা ওসমান গনি দুটি বিয়ে করেন। তিনি একসময় মসজিদে ইমামতি করতেন। তার প্রথম পক্ষের সন্তান রাজীব গান্ধী। জাহাঙ্গীরের বাবা চার বছর আগে মারা যান। তার মা রাহেলা বেগম সন্তানদের নিয়ে ভুতমারা গ্রামে থাকেন। তিনি পেশায় গৃহকর্মী। রাজীবের বিরুদ্ধে গাইবান্ধা থানায় তরুণ ও দেবেশ হত্যার ঘটনায় মামলা আছে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের শিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আজাদুল সমকালকে বলেন, বছর দেড়েক আগে সাঘাটা থেকে শিবপুরের মালঞ্চায় এসে ৫ শতক জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছিল জাহাঙ্গীর। এর কিছু দিন পর থেকে তার কোনো হদিস নেই। শুনেছি সে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে। তবে তার পরিবারের অন্য সদস্যরা সাঘাটায় বসবাস করেন।

সাঘাটার বোনারপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল ওয়ারেছ প্রধান সমকালকে জানান, ৭-৮ মাস ধরে জাহাঙ্গীর ও তার স্ত্রী-সন্তানদের এলাকায় দেখা যায়নি। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে জাহাঙ্গীর তৃতীয়। তার দুই সন্তান রয়েছে।

‘ভাইয়ের কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা করি’: গতকাল গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে জাহাঙ্গীরের বাড়িতে কাউকে পাওয়া যায়নি। তার মা শনিবার মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেছেন। জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধীর বড় ভাই আবু তাহের জানান, তিন থেকে চার বছর আগে স্ত্রী-সন্তানসহ জাহাঙ্গীর এলাকা ছেড়েছে। তার কর্মকাণ্ডের কথা শোনার পর পরিবারের অন্য সদস্যরা তাকে ঘৃণা করেন। অন্যায় করে থাকলে ও জঙ্গিবাদে জড়ালে তার শাস্তিও চান তারা। সমকাল

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫