বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
সরকারকে আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে অনীহা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অর্থ ব্যয়ের নিরীার প্রয়োজনই মনে করে না। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সিদ্ধান্ত নিয়েছে আয়-ব্যয়ের নিরীা প্রতিবেদন জমা না দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা হবে ট্রাস্টিদের।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সম্প্রতি পাঠানো ইউজিসির এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছেÑ ‘নিরীক্ষিত অডিট রিপোর্টের কপি কমিশন ও সরকারের কাছে পাঠানোর জন্য ৩১ জানুয়ারি ২০১৭ পর্যন্ত সময় দেওয়া হলো। এর আগেও ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশনা ছিল। তবে গুটিকয়েক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আয়-ব্যয়ের তথ্য দিলেও অধিকসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের নির্দেশনা অগ্রাহ্য করছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি হলেও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর আয়ের অর্থ ‘পাবলিক মানি’র (জনগণের অর্থ) মধ্যে পড়ে। তাই এর আয়-ব্যয়ের হিসাব সরকারের কাছে অবশ্যই জমা দিতে হবে। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের হিসাব নিরীা করে প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী প্রতিবছর আর্থিক হিসাব সরকারের কাছে জমা দিতে হবে। এটা অমান্য করলে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়াই নয়, বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। বিদ্যমান আইনে তাদের অর্থ বা কারাদন্ড এমনকি উভয় দন্ড দেওয়ার বিধান আছে। আমরা প্রয়োজনে আইনের এসব ধারা প্রয়োগের সুপারিশ করব।
জানা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের কাছে হিসাব নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। দিন দিন আয় বাড়ছে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থ নিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ন্যূনতম অর্থ কমিটির সভা পর্যন্ত করছে না। আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা (অডিট) করাচ্ছে না। কোষাধ্য নিয়োগের প্রয়োজনও মনে করে না। এভাবেই তারা বছরের পর বছর পার করে দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাগাম টেনে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউজিসি।
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, দুই যুগ আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেÑ এমন প্রতিষ্ঠানও আজ পর্যন্ত হিসাব নিরীক্ষা করানো হয়েছে কিনা, সে তথ্য পর্যন্ত আমাদের জানা নেই। এ ধরনের কাজ আইনবিরোধী। যারা এসব করছেন, শিগগির তাদের তালিকা প্রকাশ করব।
আবদুল মান্নান জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৪৫ ধারা অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা করাতে হবে। এ প্রতিবেদন পরবর্তী আর্থিক বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। এ ধারার নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে তদন্তসােেপ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বাতিলের নির্দেশনা আছে। ৪৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী ৫ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড দেওয়ার বিধান আছে এই অপরাধে।
কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনের এ নির্দেশনাকে অগ্রাহ্য করছে বলে মনে করে ইউজিসি।
ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনের ২৫৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়, ‘আর্থিক অডিট রিপোর্ট দাখিলযোগ্য ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৩১টি রিপোর্ট প্রেরণ করেছে কমিশনে। এর মধ্যে ২০টি অডিট রিপোর্ট নিরীতি এবং ১১টি অনিরীতি।
নিয়মানুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরক্ষেত্রে কোনো সিএ ফার্মের মাধ্যমে হিসাব নিরীা করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। সিএ ফার্ম নিয়োগ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যে কারণে প্রতিবেদন দাখিল করা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়া অন্য কেউ সিএ ফার্ম চেয়েছে কিনা, তাও ইউজিসির জানা নেই।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, চর্চা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের পছন্দমতো তিনটি সিএ ফার্মের নাম প্রস্তাব করে থাকে। সেখান থেকে মন্ত্রণালয় একটি নিয়োগ দেয়। কিন্তু নিজস্ব ফার্মের প্রতিবেদনেও অনেকক্ষেত্রে আর্থিক ত্রুটি ধরা পড়ে।
জানা গেছে, আইনের ১৪, ২৫ ও ২৬ ধারা অনুযায়ী অর্থ কমিটি গঠন ও পরিচালনা করতে হবে। ৪১ ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের উৎস বলে দেওয়া আছে। ৪৪ ধারায় তহবিল পরিচালনার বিষয় বলা আছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অর্থ কমিটির কোনো সভা করে না। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্য নিয়োগ করেনি। আবার যেখানে কোষাধ্য আছে, সেখানে বেশিরভাগক্ষেত্রে মালিকপরে লোকজন আছেন। মূলত দুহাতে অর্থ লুটপাটের জন্যই এই চারটি ধারার লঙ্ঘন চলছে বলে অভিযোগ আছে। ভাড়াবাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ফলে বছর বছর ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের। এ ছাড়া, সিটিং অ্যালাউন্স, রণাবেণ, নানা কেনাকাটা, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে ইউজিসি প্রশ্ন তুলেছে।
দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৯৫টি। এর মধ্যে গত বছর দেশের ৮৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বমোট আয় ছিল প্রায় দুই হাজার ৭৯১ কোটি টাকা। গড়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় আয় করেছে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা। অপরদিকে গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যয়ও করেছে প্রায় দুই হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। আয়-ব্যয় সমান দেখিয়েছে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়। দৈনিক আমাদের সময়
