বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
২০১০ সালের ধসের ক্ষত শুকিয়ে ফের পুঁজিবাজারমুখী হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের ছোট-বড় বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণে পুঁজিবাজার এখন চাঙ্গা। নতুন করে অর্থ লগ্নি করে শেয়ারবাজারে হারানো পুঁজি ফিরে পেতে অনেকেই তত্পর। ফের মার্জিন ঋণ দিয়ে পুরনো বিনিয়োগকারীদের লেনদেনের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। নতুন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীও আসছে পুঁজিবাজারে। ইতিমধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মূল্যসূচক সাড়ে পাঁচ হাজার পয়েন্ট এবং লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
তবে বছরের প্রথম দিন থেকে একটানা সূচক ও লেনদেন বৃদ্ধিতে অনেকের মনে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে বড় ধরনের ধসের সময়ও লেনদেন ও সূচক ক্রমাগতভাবেই বাড়ছিল। এবার বাজারে চলমান উত্থানের সুুবাদে পুরনো কারসাজি চক্র ফের সক্রিয় হচ্ছে বলে মনে করছে কেউ কেউ। এ অবস্থায় বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরো সক্রিয় হওয়ার পাশাপাশি নতুন শেয়ারের জোগানে বাড়ানো ও বিনিয়োগকারীদের সচেতন করার পরামর্শ দিয়েছেন পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, ইপিএস ও অন্যান্য তথ্য বিবেচনা করে ভালো মৌল ভিত্তির শেয়ারে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে তাঁরা বলেছেন, যারা না বুঝে মুনাফার লোভে সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে পুঁজিবাজারে ঝুঁকছে তাদের জন্য পুঁজিবাজার ভালো কিছু বয়ে আনবে না।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্রমাগতভাবে বাজারের উত্থানে ডিএসইর মূল্যসূচক গত ছয় বছরের মধ্যে শীর্ষে উঠে সাড়ে পাঁচ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করেছে। এ বছরের প্রথম ১৫ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় সাড়ে চার শ পয়েন্ট বেড়েছে। বছরের প্রথম ১২ দিনে বাজার মূলধন বেড়েছে ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত মঙ্গলবার ডিএসইতে লেনদেন হয় দুই হাজার ৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা গত ছয় বছরে মধ্যে সর্বোচ্চ। মঙ্গলবার ডিএসইএক্স সূচক প্রায় ৯৮ পয়েন্ট বেড়ে পাঁচ হাজার ৫৭৫ পয়েন্টে ওঠে। একই দিন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২৮৭ পয়েন্ট বেড়ে ১৭ হাজার ১৫৯ পয়েন্ট হয়েছে।
সিএসইতে সেদিন লেনদেন হয়েছে ১১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার শেয়ার। সর্বশেষ কার্যদিবস গত বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স শূন্য দশমিক ৫৬ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করে পাঁচ হাজার ৫৩৪ পয়েন্টে, লেনদেন হয় এক হাজার ৪০৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকার শেয়ার। আর সিএসই সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৯ দশমিক ১৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২ পয়েন্টে। গত এক সপ্তাহে ডিএসইএক্স বা প্রধান মূল্য সূচক বেড়েছে ১৯১ দশমিক ১৯ পয়েন্ট। সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইতে ২৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ লেনদেন বেড়েছে।
তবে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, সূচক ও লেনদেন দীর্ঘ সময় নিম্নমুখী থাকায় শেয়ারের দর একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। আর বর্তমানে শেয়ারের দর এখন যেখানে অবস্থান করছে তাও অবমূল্যায়িত। পুঁজিবাজারের নির্দেশক হিসাব করে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিএসইর মূল্য আয় অনুপাত (পিই) আগের বছরের তুলনায় ২০১৬ সালে ৬.৫৮ শতাংশ কমেছে। ২০১৬ সালে পিই দাঁড়িয়েছে ১৪.২৯ পয়েন্টে। এ হিসাবে পিই কমেছে ০.৯৪ পয়েন্ট বা ৬.৫৮ শতাংশ। খাতওয়ারি পিই পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতের পিই ৮.১৪ ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের পিই ৯.৫৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে, যা সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে বলে ডিএসই কর্তৃপক্ষের দাবি।
এ ছাড়া সামগ্রিক বাজারের ১৪.২৯ পিই-কে খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে। তাই শেয়ারবাজারের সূচক ও লেনদেন নিয়ে ভয়ের কিছু নেই বলে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন ডিএসইর কর্তাব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, বর্তমানে সূচক যে পর্যায়ে গেছে, সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা যাবে না। সূচক নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। বাজারের লেনদেন যেখানে পৌঁছেছে, তা সামলানোর দক্ষতা ও সক্ষমতা দুটিই রয়েছে ডিএসইর। তবে ধারদেনা করে, জমি কিংবা বউয়ের গয়না বিক্রি করে বাজারে বিনিয়োগ না করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক ও সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, ‘আমি বারবার বলার চেষ্টা করছি বাজার কোনোভাবেই অতিমূল্যায়িত নয়। আমাদের পিই রেশিও অনেক কম। কাজেই বাজার এখনো ঝুঁকিপূূর্ণ নয়। গত পাঁচ বছরে দেশের অর্থনীতিতে যে বিপ্লব ঘটেছে তার প্রতিফলন পড়েছে শেয়ারবাজারে। সরকার, বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ডিএসইসহ সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সমন্বিত উদ্যোগে শেয়ারবাজার এখন গতিশীল। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও গত বছর থেকে বিনিয়োগ শুরু করেছে, এতে লেনদেন হঠাৎ করে কিছুটা বেড়ে গেছে। তবে ভয়ের কিছু নেই। ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা ছিল। ব্যাংকগুলো তাদের নির্ধারিত মাত্রার অনেক বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছিল। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপে ব্যাপক দরপতন হয়েছিল। কিন্তু এখন ব্যাংকের বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার মধ্যে আছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজার উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাও কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করছে। ’
বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দিয়ে রকিবুর রহমান বলেন, ‘পুঁজিবাজারে সব সময় শেয়ারের দাম বাড়বে, এটা কোনো নিয়ম হতে পারে না। যখন শেয়ারের দাম বাড়ে তখন সবাই খুশি থাকে, আর যেই দাম কমে যায় তখন সবাই নাখোশ হবে, এটা অত্যন্ত খারাপ চর্চা। শেয়ারবাজারে মূল্য সংশোধন হবে, এটাই স্বাভাবিক ঘটনা; কিন্তু তা যেসব বিনিয়োগকারী মেনে নিতে পারে না তাদের ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আসার দরকার নেই। কম্পানির মৌল ভিত্তি, পিই রেশিও, আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালক, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি দেখে বিনিয়োগ করতে হবে। ’ সূত্র: কালেরকণ্ঠ
