Skip to content

আইনী চালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন

বাংলাভূমি ডেস্ক ॥
দেশি ও বিদেশী নানা সংগঠনের ও নারী নেত্রীদের আপত্তি ও প্রতিবাদে মুখেই সরকার বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ বিলটি পাস করে ২৭ ফেব্রুয়ারি। বিলটি পাস করার সাতদিনের মাথায় আইনী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লো। এটি সংবিধানের ৭, ১১, ১৫, ২৬, ২৭, ৩১ এই ধারারগুলোর পরিপন্থি বলে আইনটি বাতিল চাওয়া হয়েছে। এই নিয়ে আইনী নোটিশ দিয়েছেন সরকারকে সেই সঙ্গে আইন বাতিল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ২৪ ঘন্টার মধ্যে না নিলে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কথাও বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুস আলী আকন্দ।

বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বিয়ের বৈধতা দিয়ে সদ্য পাশ হওয়া বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭’ বাতিল চেয়ে ওই আইনজীবী আইনি নোটিশ পাঠান সংসদ সচিবালয়ের সচিব, আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর। আইনটি বাতিল করার জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে হাইাকোর্টে রিট করা হবেও উল্লেখ করেছেন।

আইনজীবী তার নোটিশে বলেছেন, সংসদে নতুন পাশ হওয়া আইনটি সংবিধানের ৭, ১১, ১৫, ২৬, ২৭, ৩১ এই ধারারগুলোর পরিপন্থি। মুসলিম বিবাহ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের পরিপন্থি। তিনি মনে করেন এ আইনের ফলে দেশে বাল্য বিবাহ সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। নতুন এ আইনটি হলে জনগণ এটির অপব্যবহার করবে। এতে চরম আকারে নারীদের মানবাধিকার লংঘন হবে।

তিনি নোটেশি সংবিধানের যেসব ধারার কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে দেখা গেছে, সংবিধানের প্রথম ভাগে, প্রজাতন্ত্র বিষয়ে সংবিধানের প্রাধান্য প্রসঙ্গে ৭৷ (১) এ বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে৷(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে৷ বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ       ১ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে[ ৭ক। (১) কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোন অসাংবিধানিক পন্থায় – (ক) এই সংবিধান বা ইহার কোন অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে ; কিংবা (খ) এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে-তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে। (২) কোন ব্যক্তি (১) দফায় বর্ণিত-(ক) কোন কার্য করিতে সহযোগিতা বা উস্কানি প্রদান করিলে; কিংবা (খ) কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করিলে- তাহার এইরূপ কার্যও একই অপরাধ হইবে। (৩) এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দন্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দন্ডেদন্ডি হইবে।

সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশোধন অযোগ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৭খ।সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাববনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমুহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।

দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বিষয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে ১১ তে বলা হয়েছে,  প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে ১[ * * *] ২[ এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে]৷দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির বিষয়ে মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ১৫৷ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়: (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা; (খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার; (গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং (ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পুঙ্গত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার৷

সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার বিষয়ে মৌলিক অধিকারের সহিত অসমঞ্জস আইন বাতিল প্রসঙ্গে বলা হয়, ২৬। (১) এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসমঞ্জস সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে। (২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে। ১[ (৩) সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত সংশোধনের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না।]

আইনের দৃষ্টিতে সমতার বিষয়ে একই ভাবে বলা হয়েছে, ২৭। সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। আইনের আশ্রয়-লাভের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৩১। আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহারলাভ যে কোন স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।

এই অবস্থায় সরকার কি করবে জানার জন্য চেষ্টা করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই আইনটি পাস করা হয়েছে। বাস্তবতার ভিত্তিতেই। এখন এটা বাতিল করার কোন চিন্তাভাবনা নেই সরকারের।

এই আইনটি পাস করার বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন সংগঠনের সমালোচনা করে আসছিল। সংসদে পাসকৃত বিল হিসাবে মেয়ে ও ছেলেদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ ও ২১ বছর রাখা হলেও ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে’ তার চেয়ে কম বয়সেও বিয়ে দেয়া যাবে বলেও উল্লেখ করা হয়। এর আগে ২০১৬ সালের ২৪ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় বিলটি অনুমোদন দেয়।

বিলের ১৯ ধারায় বিশেষ বিধানে বলা হয়, এই আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, বিধি দ্বারা নির্ধারিত কোনো বিশেষ প্রেক্ষাপটে অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশ এবং মাতা-পিতা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতিক্রমে, বিধি দ্বারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিয়ে সম্পাদিত হলে তা এই আইনের অধীন অপরাধ বলে গণ্য হবে না।  এই বিষয়ে দেশের বিভিন্ন নারী সংগঠন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিলটি পাস না করার জন্য আইন প্রনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।  নারী শিশু ও মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, বিশেষ বিধানের এই সুযোগ যে কেউ চাইলেই পাবে না। কোনো অনভিপ্রেত ঘটনার ক্ষেত্রে পিতামাতা বা বৈধ অভিভাবক এবং আদালতের সম্মতি লাগবে। আদালতের অনুমতি ছাড়া কেউ বিয়ে দিতে পারবে না।  পাস হওয়া বিলে বিশেষ প্রেক্ষাপট বিধি দ্বারা নির্ধারিত রাখার কথা বলা হয়। এটি সংসদে উত্থাপিত খসড়ায় উল্লেখ ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বিরোধিতাকারীরা বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞান। সমাজ বাস্তবতার কথা বিবেচনায় রেখেই এই আইন করা হচ্ছে। এইচআরডব্লিউ বলেছিল, এ থেকে মনে হচ্ছে, ধর্ষণের কারণে কোনো মেয়ে গর্ভবতী হলে তাকেও ওই আইন দেখিয়ে ধর্ষকের সঙ্গে বিয়েতে বাধ্য করা হতে পারে। অভিযোগ উঠেছে, বাল্য বিয়ের হার কম দেখাতেই এই আইন সংশোধন করছে সরকার। বাল্য বিয়ের স্বীকৃতি দেওয়ার আইন বলে সমালোচনা উঠলেও বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ। প্রতিমন্ত্রীর দাবি, বাল্য বিয়ে ঠেকাতেই এই আইন করেছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ বিলে’ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের অনুমতির বিশেষ বিধানকে ‘মশা মারতে কামান দাগার’ মতো বিষয় বলে মনে করছেন। মেয়েরা যাতে ভুক্তভোগী না হয় সেজন্য সরকারের প্রতি বিকল্প খোঁজার আহ্বান জানিয়েছিলেন এক অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা বিরল। বিশেষ প্রেক্ষাপটে মেয়েদের বিয়ের বয়সে ছাড়ের বিধান বাংলাদেশে বাল্যবিয়ে বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে বলেও মনে করেন।

এদিকে বিশেষ প্রেক্ষাপটে মেয়েদের বিয়ের বয়সে ছাড়ের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতাকারী ও সমালোচনাকারীদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি ছিল, সমালোচনাকারীরা বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞান। প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, সমাজের প্রতি দায়দায়িত্ব তাদের (যারা সমালোচনাকারী) খুবই কম। কারণ তারা দুটো এনজিও করে পয়সা কামায়, কিন্তু দায়িত্বটা নেয় না। বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিয়ে ঘাবড়ানো বা চিন্তার কিছুই নেই। আমাদের আর্থ-সামাজিক বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। আমাদের সময়.কম

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫