Skip to content

রেইনট্রি হোটেলে ছাত্রী ধর্ষণ > মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে এখনো সংশয়

বাংলাভূমি ডেস্ক ॥
রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণ মামলার পাঁচ আসামির সবাই গ্রেফতার হয়েছেন। প্রধান দুই আসামি অর্থাৎ অভিযুক্ত ধর্ষক আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে সাফাত আহমেদ ও ‘পিকাসো’ রেস্তোরাঁর মালিক ও রেগনাম গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ হোসেন জনির ছেলে সাদমান সাকিফ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন। সর্বশেষ বুধবার রাতে গ্রেফতার হওয়া মামলার দুই নম্বর আসামি নাঈম আশরাফও মুন্সিগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হয়েছে। তিনি পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধষর্ণের কথাও স্বীকার করেছেন। এছাড়া গত সোমবার গ্রেফতার এই মামলার অপর দুই আসামি সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল হোসেন ও দেহরক্ষী রহমত আলীও ধর্ষণের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। তারা সেই রাতে ওই দুই ছাত্রীর ওপর পাশবিক নির্যাতনেরও বর্ণনা দিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় নিজেও ধর্ষণ ঘটনার সত্যতা প্রতীয়মান হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তার পরও এ ধর্ষণ মামলার সুষ্ঠুতদন্ত ও প্রকৃত বিচার নিয়ে বিভিন্ন মহলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আসামিরা বিত্তশালী হওয়ায় ও রাজনৈতিক প্রভাব যুক্ত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আসামিদের প্রকৃত বিচার হবে কি না-তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মহল।

দেশের আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের চোখে এই ধর্ষণ মামলার বেশ কিছু অসংগতি ধরা পড়েছে। তাদের মতে, এ মামলায় আসামিরা বিত্তশালী ও তাদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব যুক্ত রয়েছে। আসামিদের কাছে থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে ধর্ষণ মামলা নিতে গড়িমসি করা ও ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রীকে হেনস্তা করার অভিযোগে অভিযুক্ত বনানী থানার ওসি ফরমান আলীর বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি ধর্ষণ স্থান রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ধর্ষণ সম্পৃক্ত আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। হোটেলে অবৈধ মদ পাওয়া ও হোটেলের বৈধতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা জানতে হোটেল মালিক আওয়ামী লীগের ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য বি এইচ হারুনের ছেলে আদনান হারুনের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কার্যালয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি যাননি। জবাবদিহি করার জন্য ২৩ মে পর্যন্ত সময় দিয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। তেমনি অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলাকে প্রভাবিত করার অভিযোগ যে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে (সাফাত ও সাকিফের বাবা) বুধবার পর্যন্ত এ ব্যাপারে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত করেনি পুলিশ। উল্টো সাফাতের বাবার স্বর্ণ ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগকে। এমনকি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত সেই রাতে ধর্ষণের ভিডিও ফুটেজ, রেইনট্রি হোটেলের সে রাতের সিসিটিভির ফুটেজ ও ধর্ষণে ব্যবহৃত শটগান ও ধর্ষণের পর আসামিদের সঙ্গে দুই ছাত্রীর ফোনালাপ ও মেসেঞ্জার বার্তা জব্দ করার ব্যাপারেও কিছু জানা যায়নি।

অবশ্য সংশয়ের কিছু নেই-উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, কোনো বাহ্যিক শক্তি এই মামলাকে প্রভাবিত করতে কাজ করছে না। পুলিশ কারো নির্দেশে প্রভাবিত হবে না। তদন্ত সঠিক পথেই এগোচ্ছে। দোষী সাব্যস্ত হলে অপরাধীরা অবশ্যই সাজা পাবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযুক্ত ওসি ও রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগেরও তদন্ত হচ্ছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো ছাড় নয় বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একইভাবে বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া দুই তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার প্রধান আসামিরা ধনাঢ্য এবং প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হলেও পুলিশকে নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ ও সংশয়ে না থাকতে অনুরোধ করেছেন কৃষ্ণপদ রায়। তিনি বলেন, তারা তদন্তে নামলে আসামিদের আসামি হিসেবেই দেখেন, তারা কোন পরিবারের সদস্য, সেটা দেখেন না। বনানী ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার তদন্তেও অন্যথা হবে না।

তবে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) নূর মোহাম্মদ বলেন, পুলিশ যদি সঠিক পথে ও কড়াভাবে যায়, তা হলে মামলায় কোনো প্রভাব পড়ার কথা নয়। তবে শুরু থেকেই এই মামলায় আমার কাছে কিছু খটকা লেগেছে। যেমন-হোটেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। দ্বিতীয়ত, পুলিশের কাছে মেয়েরা অভিযোগ নিয়ে গেল। কিন্তু পুলিশ সে অভিযোগ নিতে গড়িমসি করল। অবশ্য এত দেরিতে মামলা করতে এলো বলে তদন্তকাজে বিঘœ ঘটবে, সেটা ঠিক না। এই মামলার তদন্ত সিম্পল। তদন্ত জটিল কিছু না। জটিল মামলা না। ক্লু আছে। আর ভিডিও বা সিসিটিভির ফুটেজ যদি মুছেও ফেলে, সেগুলো পুনরুদ্ধার করার প্রযুক্তি পুলিশের কাছে আছে।

ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ এনে গত ৬ মে বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী। মামলার এজাহারে বলা হয়, ২৮ মার্চ সাফাত ও নাঈম ওই দুই তরুণীকে জন্মদিনের দাওয়াত দেন। এরপর তাদের বনানীর ‘কে’ ব্লকের ২৭ নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বরে রেইনট্রি নামের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হোটেলের একটি কক্ষে আটকে রেখে তারা ধর্ষণ করেন। এ ঘটনা সাফাতের গাড়িচালক বিল্লালকে দিয়ে ভিডিও করানো হয় ও দেহরক্ষী ধর্ষণের পর দুই ছাত্রীর বাসায় গিয়ে হুমকি-ধমকি দেন। মামলার আসামিরা হলেন-আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ, তার বন্ধু নাঈম আশরাফ, সাদমান সাকিফ, সাফাতের গাড়িচালক ও দেহরক্ষী।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুরু থেকেই এই ধর্ষণ মামলায় আসামিদের অর্থ ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওঠে। ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে দুই ছাত্রী বনানী থানায় মামলা করতে যান ৪ মে। সে সময় ওসি ফরমান আলী মামলা না নিয়ে দুই ছাত্রীকে নানাভাবে হেনস্তা করেন। পরে ৬ মে পুলিশের ঊর্ধ্বতন বিভাগের নির্দেশে মামলা নিতে বাধ্য হন। অভিযোগ রয়েছে-ওসি ফরমান আলী মামলার আসামিদের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়েছেন। অবশ্য মামলা নেওয়ার তিন দিন পর হঠাৎ করেই পাঁচ দিনের ছুটিতে যান ওই ওসি। পরে গত রোববার কাজে যোগ দেন। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে গঠিত পুলিশের দল তাকে এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। লিখিত বক্তব্যে ওসি মামলা গ্রহণে বিলম্ব হওয়ার দায় পুলিশের গুলশান বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর চাপান।

এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, সেটির অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। ওই ওসি (ফরমান আলী) বা অন্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা নিতে যে গড়িমসি বা তদন্তকাজ ভিন্ন দিকে নিতে যে অভিযোগ, সেটি প্রমাণ হলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এটা গুরুতর অপরাধ। অন্যায় করেছে। মামলা নেয়নি। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হতে পারে। চাকরি যেতে পারে।

ধর্ষণ মামলায় বিত্তশালী ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠছে শুরু থেকেই। সূত্রগুলো বলছে, বনানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণের মামলার তদন্ত নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে পুলিশ। এ মামলা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তৎপর রয়েছেন। বিশেষ করে সাফাত ও সাকিফের বাবা এবং রেইনট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষ বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর। তাই তদন্তে কিছুটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সাবেক মন্ত্রী ও একজন রাজনৈতিক নেতার প্রভাবে শুরু থেকেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই নেতার সঙ্গে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও আপন জুয়েলার্সের মালিকের সম্পর্ক খুবই ভালো। রেইনট্রি হোটেলের মালিক ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুন (বি এইচ হারুন)। তার ছেলে মাহির হারুন ওই হোটেলের একজন পরিচালক। মূলত তার সুবাদেই সাফাত প্রায়ই হোটেলে বিভিন্ন বয়সী বন্ধু-বান্ধবী নিয়ে আড্ডা জমাতেন। মিরপুর এলাকার এক সংসদ সদস্যের ছেলে সাফাতের বন্ধু। তিনিও আড্ডায় থাকতেন। তারা সেখানে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদকের আসর বসাতেন। বিশেষ করে রেনইট্রি হোটেল কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক আচরণ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত ওই হোটেল কর্তৃপক্ষকে ধর্ষণসংক্রান্ত কোনো জিজ্ঞাসাবাদ না করায় এই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় ও এর সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত হওয়ায় বিচার নিয়ে রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সংশয় প্রকাশ করছেন। উদ্বিগ্ন বিশিষ্টজনেরাও।

এ ব্যাপারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, মানুষের মধ্যে আশঙ্কা ও সংশয় দেখা দিয়েছে যে, বনানীর ধর্ষণকারীরা অনেক শক্তিশালী, তাদের বাবা শত শত কোটি টাকার মালিক। তারা হয়তো টাকার জোরে পার পেয়ে যাবে। তাদের বোধহয় প্রকৃত বিচার হবে না। এ ধরনের নানা আশঙ্কা আমাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে। কারণ অতীতে আমরা দেখেছি, যারা ক্ষমতাশালী তাদের বিচার হয় না। তারা বিচারের আওতার বাইরে থেকে যায়। সে কারণে মানুষের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।

একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, এখন পর্যন্ত মামলার তদন্তে নানা অসংগতি লক্ষ করা যাচ্ছে-জানতে চাইলে এই আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, এর কারণ এই ঘটনার সঙ্গে নানা বিষয় জড়িত। আসামিরা ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী। আসামিদের পক্ষে সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের তৎপরতার কথা শোনা যাচ্ছে। যারা ভিকটিম, তারাও ভয়-ভীতির মুখে দেরিতে মামলা করেছে। এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে যে মেডিক্যাল আলামত গুরুত্বপূর্ণ, সে ব্যাপারেও অনেকে সচেতন নয়। তার ওপর পুলিশের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। প্রথমদিকে রাজনৈতিক প্রভাব তেমনটা না থাকলেও পরে অনেকে যুক্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে একটা সংশয় আছে। ‘তবে সম্ভব নয়’-উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, গণমাধ্যম যেভাবে এগিয়ে এসেছে ও দেশের মানুষ যেভাবে সোচ্চার হয়েছে, তাতে পুলিশ চাপের মুখে আছে। মনে হচ্ছে পুলিশকে সঠিক তদন্তের দিকেই যেতে হবে। সূত্র: প্রতিদিনের সংবাদ

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫