আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টেলিফোনে কাতারের আমিরের সঙ্গে কথা বলে সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কুয়েতের আমির আরব দেশগুলো সফর করছেন একটা সুরাহার জন্যে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঙ্কারায় রয়েছেন সকলের গ্রহণযোগ্য একটা সমাধান পাওয়া যায় কি না তার সন্ধানে। এরই মধ্যে তুরস্ক কাতারে সামরিক ঘাঁটি তৈরির ঘোষণা করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন কাতারের আমিরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সমর্থন জানিয়েছে। তারপরও আমিরাত কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের চিন্তা করছে। অথচ এ সংকট নিরসনে আলোচনার সুযোগ ছিল এবং সে পথে না গিয়ে এখন উপসাগরে সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আশা করি কাতারের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে না।
গত সোমবার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিসর কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তাদের আকাশ কাতার এয়ারলাইন্সের জন্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সন্ত্রাসের পক্ষে কাতারের অবস্থান রয়েছে এমন দাবি তুলে এসব দেশ জানায়, মুসলিম ব্রাদারহুড ও হামাসকে সাহায্য করছে দেশটি। অন্যদিকে কাতার এধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের কথা বলে।
রয়টারকে আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার গার্ভেস বলেছেন, প্রয়োজনে কাতারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে। বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ খালিদ বিন আহমেদ আল খালিফা বলেছেন, কাতার তার অবস্থান পরিবর্তন করবে এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা আমাদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো ইতস্তত করব না, প্রয়োজনে যে কোনো পন্থা অবলম্বন করা হবে। আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কাতারের শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্যে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করা হয়নি। বরং নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনের জন্যেই এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুবাইতে এএফপিকে একথা বলেন গার্ভেস।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গী কি হবে তা চাপিয়ে দেওয়া বা এজন্যে অর্থনৈতিক অবরোধের চিন্তা করে সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে না বলে মনে করছেন আরব দেশের নেতারা। আবার এও বলছে প্রয়োজনে যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যে কোনো পদক্ষেপের মধ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ যদি ইরাক,সিরিয়া, ইয়েমেনের মত পরিণতি লাভ করে কাতার তাহলে এইসব আরব দেশগুলোর নেতাদের কিছুই করার নেই। এরাই গাল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি প্রতিষ্ঠা করে ১৯৮১ সালে। যা আলোচনার পথ ধরে সংকট সুরাহা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ ইসলায়েলের প্রভাব বলয় সৃষ্টির সুযোগও মধ্যপ্রাচ্যে এরফলে আরো তীব্র হয়ে উঠছে। যে কারণে ইসরায়েল কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সৌদি দৈনিক আল-রিয়াদের কলাম লেখক মুসায়েদ আল-আসিমি তার কলামে লিখছেন, আসল শত্রু হচ্ছে ইরান, ইসরায়েল নয়। ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাবাহিনী প্রধান মোশে ইয়ালন বলেছেন, কাতার ছাড়া ইসরায়েলি ও সুন্নি আরবরা এখন এক নৌকায়।
টুইটবার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কাতার ও আমিরাতের আমিরকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রয়োজনে হোয়াইট হাউসে বৈঠকে বসার পরামর্শ দিয়েছেন। এমন বৈঠক কখনো নিজেদের মধ্যে বসার প্রয়োজন বোধ বা আয়োজনের যোগ্যতা রাখেন না মধ্যপ্রাচ্যের শাসকরা। কারণ তারা নিজেদের মেধা, মনন, বুদ্ধি ও বিবেচনা পশ্চিমাদের হাতে বন্ধক দিয়ে নিজেদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে জনগণের ইচ্ছা ও প্রত্যাশার বিরুদ্ধে, তাদের ব্যবসা, বাণিজ্য জীবীকাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে কখনই পিছপা হননি, হবেন না। এসব দেশে বাংলাদেশের মত স্বল্পোপন্নত অনেক দেশের লোকজন কাজ করছে এবং কাতার সহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকিতে পড়লে তা এসব দেশের অর্থনীতিতে যে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনবে তা নিয়েও বাদশা, আমিরদের কোনো খেয়াল নেই।
কাতারের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্রাদারহুডকে অর্থায়নের অভিযোগ তুলছে আরব দেশগুলো এবং তারা আবার প্রকাশ্যে মিসরে সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল সিসিকে বিলিয়ন বিলিয়ন সহায়তা দেওয়ার কথাও ঘোষণা করছে। জেনারেল সিসি মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। নির্বাচন, গণতন্ত্র কখনোই আরব দেশগুলোতে যাতে জনগণের ই”ছার প্রতিফলন না হয়ে উঠতে পারে এবং তাদের রাজতন্ত্র যাতে কোনো হুমকির মুখে না পড়ে সেজন্যে তারা কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ আনছেন। বার্লিনে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল-জুবায়ের বলেছেন, বাইরের সহযোগিতা ছাড়াই আরব দেশগুলো কাতারের সঙ্গে সংকট নিরসন করতে পারবে। কোনো রকমের মধ্যস্থতার প্রয়োজন হবে না।
সৌদি আরব ইতিমধ্যে কাতারের টেলিভিশন আল-জাজিরা অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। কাতারের শেয়ারবাজারে দরপতন চলছে। বিতর্ক এখন অর্থনৈতিক ক্ষতিতে রুপান্তরিত হচ্ছে। গত ১১ বছরের মধ্যে কাতারি রিয়াল এখন সর্বনি¤œ মানে অবস্থান করছে। বিনিয়োগ স্থবিরতার দিকে আগাচ্ছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, দেশটির সৌদি সীমান্তে সর্ব্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি করা হয়েছে। স্থল, আকাশ ও জলে ৩৬০ ডিগ্রি জুড়ে ২৪ ঘন্টার এ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
