আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥
“সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প: ওদের সপরিবারে নির্মূল কর”। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা জোরদার করতে শুরু করেন তখন থেকেই গণমাধ্যমে এ ধরণের সংবাদ শিরোনাম প্রকাশ পেতে থাকে। ট্রাম্প তার শব্দচয়নেও স্পষ্টতই জোরালো অবস্থান নেন; যেমন তার শব্দভান্ডারে জায়গা পেয়েছে এমন সব শব্দ, “সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে আরেকটি বিষয় হলো, ওদের পরিবারকেও নির্মূল করতে হবে। তোমরা যখনই এই সন্ত্রাসীদের দেখবে তখনই তাদের পরিবারকেও নির্মূল করে দাও।” এসব কথা কী কেবলই কথার কথা, নাকি তিনি সত্যিই বেসামরিক নাগরিকদের নির্মূল করতে চান?
প্রেসিডেন্ট হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে ট্রাম্প যখন ইরাক ও সিরিয়ায় বোমা হামলা শুরু করেন তখন খুব শিগগিরই কিছু সাংবাদিক তার নির্বাচনী প্রচারণার প্রতিশ্রুতি এবং যুদ্ধকালীন বক্তৃতার মধ্যে একটি যোগসূত্র খুঁজে পান। ট্রাম্প তার যুদ্ধকালীন বক্তৃতায় বলেন, তিনি আইএস যোদ্ধাদের পরিবারগুলোকেও ধ্বংস করবেন। সিরিয়ায় মার্কিন জোটের বিমান হামলা কি সেই কাজটিই করছে?
মার্কিন হামলার ফলাফল খুব শিগগিরই প্রকাশ পেতে শুরু করে: একটি পর্যবেক্ষণ গ্রুপ জানায়, গত মে মাসে সিরিয়ার একটি শহরে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত জোটের বিমান হামলায় ইরাক ও সিরিয়ার ইসলামিক স্টেট বা আইএসআইএস-এর যোদ্ধাদের বিপুল সংখ্যক আত্মীয়-স্বজন নিহত হয়েছে। এই নিহতরা কি বিমান হামলার স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার নাকি তাদের ওপর সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে?
এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই বেসামরিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধের বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের যুদ্ধাপরাধ তদন্তকারী দলের এক আনুষ্ঠানিক রিপোর্টে বলা হয় যে, আইএসের শক্ত ঘাঁটি রাক্কায় মার্কিন-সমর্থিত জোটের বিমান হামলায় অবিশ্বাস্য পরিমাণে জীবনহানি ঘটেছে।
রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, “গত মার্চ মাসে রাক্কায় মার্কিন জোটের বিমান হামলায় শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়।” শুধু তাই নয়, “ওই হামলায় এক লাখ ৬০হাজার বেসামরিক নাগরিক বাস্তুহারা হয়ে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।”
নিরীহ মুসলিমদের গণহারে হত্যা ও পঙ্গু করে দেয়া, তাদেরকে জীবন নিয়ে পালাতে বাধ্য করা কি যুদ্ধাপরাধ নয়?
এই গণহত্যা কি ইচ্ছাকৃত?
এমনকি মার্কিন সাংবাদিকরাও এখন এই অবধারিত প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করেছেন: “যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়ায় এত বেশি সংখ্যক বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করছে কেন?” গত ১৯ জুন নিউইয়র্ক টাইমস শেষ পর্যন্ত এই শিরোনামে প্রকাশ করে যে, “বেসরকারী পর্যবেক্ষণ গ্রুপগুলো বেশ কয়েক মাস ধরে যে দাবি করে আসছিলো অবশেষে মাত্র দুমাস আগে মার্কিন সেনাবাহিনী তা স্বীকার করে নেয়। সেটা হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী চারমাসে ইরাক ও সিরিয়ায় ২০১৪ সাল থেকে আইএস-এর বিরুদ্ধে লড়াইরত যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট বিস্ময়কর সংখ্যায় বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করছে। এর ফলে বেসামরিক নাগরিকদের জীবনহানি ঘটছে বিপুল সংখ্যায়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ তদন্তে জাতিসংঘের স্বাধীন কমিশনের প্রধান এক সপ্তাহ আগে ঠিক এই কথাটাই বলেছেন।”
ট্রাম্পের সেনাবাহিনীর হাতে বেসামরিক মুসলমানদের গণহারে হত্যার বিষয়টি এখন প্রকাশিত সত্য। কিন্তু যে প্রশ্নের জবাব এখনও মেলেনি সেটা হলো, ট্রাম্প কি বেসামরিক মুসলমানদের হত্যা বন্ধ করতে অসমর্থ নাকি তিনি নিজেই ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন।
“ওদের সপরিবারে নির্মূল করো” এমন কথা বলার পর সেটির ন্যায্যতা প্রতিপন্ন করতে ট্রাম্প বলেন, “আইএস যোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যরা জানে, সত্যিকারের কী ঘটে চলেছে।” তার মতে আইএস যোদ্ধারা তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবন সম্পর্কে যতœশীল।
এসব বক্তব্য থেকে সন্দেহের অবকাশ খুব কমই রয়েছে যে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসাবে ট্রাম্প সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে, সিদ্ধান্ত নিয়ে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে বেসামরিক মুসলিম নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছেন। এটা কি যুদ্ধাপরাধ নয়?
যুদ্ধাপরাধ খুবই গুরুতর বিষয় এবং এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধ বিষয়ক আইনজীবী ও আইন বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব ট্রাম্পের যুদ্ধপরাধের প্রমাণাদি খতিয়ে দেখা এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মতো কোনও বিচারিক আদালতে সুবিচার প্রার্থনা করা। কারণ, মুসলমানদের প্রতি ট্রাম্পের ঘৃণার গভীরতা, তাদের জীবনকে পুরোপুরি তুচ্ছ জ্ঞান করা এবং বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিকের হত্যার খায়েশ এখন জনগণের সামনে স্পষ্ট।
সূত্র: আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন মুজতাহিদ ফারুকী
(লেখক পরিচিতি: হামিদ দাবাশি নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান স্টাডিজ ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক)
