শাহজাহান আলী মূসা ॥
রাজধানীর জীবনযাত্রা উন্নত জীবনযাত্রা। কিন্তু সেই উন্নতির কোনো লক্ষণই রাজধানী ঢাকাবাসীর জীবনে নেই। আছে শুধু ভোগান্তি আর ভোগান্তি। পরিচ্ছন্ন জীবনের জন্য মানুষ ছুটে আসে ঢাকায়। সেই আশায় গুড়েবালি। পরিচ্ছন্নতার বদলে পায় নোংরা আবর্জনা দুর্গন্ধ ও জলাবদ্ধতাপূর্ণ জীবন। একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে সুয়ারেজের পানি, রাস্তার ড্রেনের পানি মিশে একাকার হয়ে যায়। তখন রাস্তায় চলাচল মানে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনা। এতে জনগণের করারও কিছু থাকে না। কারণ জনগণ তো একান্ত প্রয়োজনেই রাস্তায় বের হয়। আর রাস্তায় বের হয়ে যে বাসায় স্স্থুভাবে ফিরে যেতে পারবে তার গ্যারান্টি নেই কারোই।
যানজটের নগরীতে একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় হাঁটু পানি। তাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। গলির রাস্তা থেকে শুরু করে ভিআইপি রোড এমনকি জাতীয় সংসদের সামনেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। জলাবদ্ধতায় যে-কোনো মানুষের যে-কোনো মুহূর্তে জীবনহানি ঘটতে পারে ম্যানহোলে পড়ে গিয়ে। কারণ দেশে রাস্তার ম্যানহোলের ঢাকনাও চুরি হয়ে যায়। আর সেই খোলা ম্যানহোলে পড়ে গেলে জীবননাশ অতি সম্ভাব্য। কারণ জলাবদ্ধতার সময় ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা থাকলে সেখানে কেউ পড়ে গেলে সেখান থেকে উঠে আসার কারো সাধ্য নেই।
এছাড়াও জলাবদ্ধতার ফলে রাস্তায় যেখানে-সেখানে ভেঙে যায়, দেবে যায়। দেবে যাওয়া স্থানে জলাবদ্ধতার সময় অনেক মানুষের পড়ে যাওয়ার দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। এছাড়াও এতে অঙ্গহানিরও সম্ভাবনা থাকে। অনেকে অঙ্গহানির শিকারও হচ্ছে। এসব বলার জন্যই মনে হয় বলছি। কারণ এসবের কোনো প্রতিকার নেই। সিটি করপোরেশনে একেক সময় একেক পরিকল্পনাবিদ আসে। আর তারা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কিছুটা হলেও বাস্তবায়ন করেন। এতে আগের পরিকল্পনাবিদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। তাই দেখা যায় একই কাজ একই জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হচ্ছে। তাই দেখা যায় একই রাস্তা বারবার কাটা হচ্ছে। এতে যানজটময় ঢাকা শহরের রাস্তায় চরম যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
রাস্তা কাটা অবস্থায় বৃষ্টি হলে তো দুর্ভোগের শেষ থাকে না। তাতে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আর বৃষ্টি না হলেও দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তা কাটা থাকার ফলে রাস্তায় চলাচলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এছাড়াও রাস্তা কাটার পর ভরাট হলেও অনেক সময় রাস্তা পিচ না করায় রাস্তায় ধূলাবালির সৃষ্টি হয়। এসব ধূলাবালির ফলে রাজধানীর আকাশ-বাতাস ধূলিকণাপূর্ণ হয়ে যায়। এতে দেখা যায় রাস্তার পাশে গাছের সবুজ পাতা ধূলায় সাদা হয়ে যায়। তখন ঢাকার আকাশ-বাতাস দূষিত হয়ে যায়। তাতে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্করাও শ্বাসকষ্টে ভোগেন। এ অবস্থায় অনেককে রাস্তায় চলাচলের সময় মাস্ক ব্যবহার করতে দেখা যায়। কিন্তু সবাই তো মাস্ক ব্যবহার করতে পারে না। তারা ধূলার মধ্যেই চলাচল করে।
এসব দেখার কেউ নেই। আর কেউ দেখলেও জনগণ তার মূল্যায়ন করতে জানে না। কারণ দেশে আইন আছে অথচ কেউ আইন ভঙ্গ করলে তার কোনো শাস্তি হয় না। যেমন- রাস্তায় কেউ ময়লা ফেললে আইনে তার শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়াও যেখানে-সেখানে ধূমপান করলে ৫০টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব আইন প্রয়োগ ও মানার লোক মনে হয় দেশে নেই। সিটি করপোরেশন থেকে রাস্তার পাশে ময়লা ফেলার বক্স বসানো হলো যাতে রাস্তার ও আশপাশের মানুষ ময়লার বক্সে ময়লা ফেলতে পারে। তাতে নগরী হবে পরিচ্ছন্ন ও দুর্গন্ধহীন। কিন্তু কি হলো? একটা সফল উদ্যোগের অপমৃত্যু হলো। কিছুদিন যেতে না যেতেই বক্সগুলো ভেঙে গেল, চুরি হয়ে গেল। বক্সে কেউ ময়লা ফেললেও তা সরানোর কোনো লোক দেখা গেল না। আবার যেই সেই, রাস্তার পাশেই ময়লা ফেলা হচ্ছে। তাতে বৃষ্টির পানি রাস্তায় জমে যাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এই জলাবদ্ধতার শিকার শুধু রাজধানীবাসীই নয়, বন্দর নগরী চট্টগ্রামের অবস্থা আরো বেহাল। বিশ্বে যদি কোনো জলাবদ্ধতাপূর্ণ শহর খোঁজা হয় তবে মনে হয় চট্টগ্রাম শীর্ষস্থান অর্জন করবে। আইন প্রয়োগহীন এই শহরের দুরবস্থা দূর করার জন্য প্রয়োজন কঠোর নীতি অবলম্বন করা। এছাড়াও জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য প্রতিমাসে সুয়ারেজের লাইন ও ড্রেন পরিষ্কার করার পাশাপাশি বৃষ্টি আসলেই সঙ্গে সঙ্গে একদল পরিচ্ছন্ন কর্মী রাস্তায় নেমে পড়বে এবং এসব কর্মী ম্যানহোলের ঢাকনা ঠিক আছে কিনা, রাস্তার পানি নিষ্কাশনের পথে কোনো ময়লা আবর্জনা আছে কিনা যেমন- কাগজ, পলিথিন ও অন্যান্য বস্তু পড়ে পানি যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে আছে কিনা তা দেখভাল করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা । এসব করতে পারলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করি।
লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি বাঙলা কলেজ, ঢাকা । ইত্তেফাক
