বাংলাভূমি ডেস্ক ॥
বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ২ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ বাস করে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই মিয়ানমারে পুলিশের হামলা ও সামরিক বাহিনীর বিতাড়নের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
মিয়ানমার সরকার বলছে চার মাসের অভিযানে ১’শ জন নিহত হয়েছে কিন্তু মানবাধিকার গোষ্ঠিগুলোর মতে, এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি এবং এটি গণহত্যার তুল্য। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নেয়া হাজারো রোহিঙ্গাদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশের নিবন্ধন রয়েছে। নিবন্ধিত এই শরণার্থীরা শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকারের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। কিন্তু এই রোহিঙ্গাদের মধ্যে শিক্ষার হার খুবই কম। কারণ কায়িক পরিশ্রম করার উপযুক্ত হলেই শিশুরা জীবন-ধারণের আশায় স্কুল ছাড়ে। এর জন্য তাদের কোন আফসোস নেই। তারা বাংলাদেশে থাকতে পেরেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে।
কক্সবাজারের আওয়ামী লীগের সমন্বয় সভাপতি নাজনীন সরওয়ার কাবেরী বলেন, ‘বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার একটি ছোট্ট দেশ। যদি শরণার্থীরা এই দেশে পুরোপুরি স্থায়ী হয়ে যায় তাহলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পাবে এবং আমরা আমাদের নাগরিকরা সুযোগ-সুবিধা হতে বঞ্চিত হবে।’
রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সবচাইতে নিগৃহীত জনগোষ্ঠি হিসেবে গণ্য করা হয়। মিয়ানমারের জাতীয় আদিবাসী আইন অনুযায়ী তারা দেশটির ১৩৫টি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত নয়। বাংলাদেশি না হলেও মিয়ানমার সরকার তাদের ‘বাঙ্গালি’ বলে অভিহিত করে। প্রকৃতপক্ষে তাদের কোন স্থান নেই। তারা আনুষ্ঠানিকভাবেই দেশহীন।
দশকব্যাপী দমন-পীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে হাজারো রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও মালয়েশিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালে এই সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌছে। শুধুমাত্র এই চার বছরে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা এই তিনটি দেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। এদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০, বাংলাদেশে ৪৩ হাজার এবং ভারতে ১৩ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের অর্ন্তভুক্ত নয় এবং শুরু থেকেই বাংলাদেশ সরকার শরণার্থী বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। তা সত্ত্বেও সম্প্রতি অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কাবেরী জানান, বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাশা করছে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফেরত নিবে।
কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ২০০৬ সালে বে অব বেঙ্গলে আবিস্কৃত ‘ঠেঙ্গার চর’ এর স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। হাতিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘এতে করে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নির্ধারণ সহজ হবে এবং তাদের খাদ্য ও বসতি নিশ্চিত করা যাবে। ৩০ হাজার একরের এই জমিতে তাদের প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা দেয়া হবে।’ কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি নির্বাহী পিল রবার্টসন বলেন, এটি মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে। কারণ এই চরে বন্যার আশঙ্কা অনেক বেশি এবং এখানে পরিস্কার পানি, আবাদি জমি নেই।
২০১৬ সালের ডিসেম্বরে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা হাসনা আক্তার বলেন, অর্ধেক দামে আমি আমার বাড়ি পাশের বার্মিজ প্রতিবেশির কাছে বিক্রি করে দেই এবং বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য চোরাচালানকারীদের ৬২০ ডলার দেই। সেনাবাহিনীর লোকজন রাইফেল দিয়ে খোঁচা মেরে উপহাস করতে করতে আমাদের বলে, ‘তোমরাতো বাঙ্গালি, নিজের দেশে ফেরত যাও।’
ওএইচসিআরএর প্রতিবেদনে বলা হয়, সাক্ষাতকার নেয়া ২০৪ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা জানান, তাদের ঘরবাড়ি, স্কুল, বাজার, দোকান, মাদরাসা এবং মসজিদ মিয়ানমারের আর্মি পুড়িয়ে দিয়েছে। কখনো কখনো তাদের সঙ্গে যোগ দেয় পুলিশ এবং বার্মিজ নাগরিকরা।
হাসনা আক্তার আরো বলেন, সৈন্যরা প্রথমে আমাদের পুরুষদের ঘর থেকে নিয়ে যায় এরপর মেয়েদের ধর্ষণ করে ও ঘর পুড়িয়ে দেয়। যদি তারা ওই নারীকে অনেক পছন্দ করে ফেলে তাহলে তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যায় ও উপর্যুপরি ধর্ষণের পর হত্যা করে। অন্যদিকে মিয়ানমারে প্রেসিডেন্টের অফিসের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল ইউ জ হালতে নভেম্বরে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সহিংস এলাকগুলোতে কোন ধর্ষণ মামলা বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে নি।’ হাসনা জানান, নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসার পর তার ৮টি সন্তান পড়তে ও লিখতে ভুলে গেছে। আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থা থেকেও তারা কোন ত্রাণ পান না। তিনি বলেন, অনেক সাংবাদিক আমাদের কাছে আসেন, খোঁজ-খবর নেন, কথা বলেন, কিন্তু কেউই আমাদের সাহায্য করেন না।’
কক্সবাজার জামে মসজিদের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল হক বলেন, মুসলিম হিসেবে আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই কিন্তু আমাদের সরকারের অনুমতি লাগবে। তিনি আরো বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু করার অনুমতি নেই।
বাংলাদেশে ক্যাম্পের শরণার্থীরা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে নিরাপদ আছে বটে, কিন্তু শরণার্থী শিবিরের জীবন অনেক প্রতিকূল। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই সেদেশে রোহিঙ্গারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তাদেরকে নাগরিকত্ব এবং ভোট দেয়ার অধিকার দিচ্ছে না সরকার। তারা নিজেদের দেশ ছেড়ে এসেছেন, কেননা, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং অসংখ্য মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ করেছে। কিন্তু অং সান সু কী’র গণতন্ত্রকামী নেত্রী খেতাব এখনো বিদ্যমান। সিএনএন অবলম্বনে।
