গোলাম মোর্তোজা ॥
ফরহাদ মজহার বিষয়ে নতুন করে কি কিছু লেখার আছে? অসংখ্য সমস্যা-ইস্যুর ভিড়ে বিষয়টি তো প্রায় চাপা পড়ে গেছে। সেই প্রায় চাপা পড়ে যাওয়া বিষয়টি নিয়ে আবার লেখার প্রয়োজন মনে করছি। প্রয়োজন মনে করার কারণ, যখন থেকে ফরহাদ মজহার বিষয়ক ঘটনার সূত্রপাত, তখন থেকেই এর সঙ্গে এক ধরনের সম্পৃক্ততা তৈরি হয়েছে। ‘অপহরণ’ বা ‘গুম’ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। তবে গত কয়েক বছর তা ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। ‘অপহরণ’ ‘গুম’র সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর নাম সম্পৃক্ত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটি ‘অপহরণ’ বা ‘গুম’র ঘটনা জানাজানি বা আলোচনায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করে নেয় যে ঘটনাটি সত্যি। আরও বিশ্বাস করে নেয় যে, এই ‘অপহরণ’ বা ‘গুম’র কাজটি সম্পন্ন হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্বীকার করে বলে, এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মানুষ একথা পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। নারায়ণগঞ্জের সাত অপহরণ হত্যার আগে পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এমনকি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মাঝেও কিছুটা সন্দেহ ছিল, সত্যিই কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ‘অপহরণ’ বা ‘গুম’ করেছে? যারা বিশ্বাস করতে চাইতেন না তাদের একটা প্রশ্ন এমন যে, চাইলেই তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করতে পারে। ‘অপহরণ’ বা ‘গুম’ কেন করবে? ‘গুম’ করে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কী লাভ?
প্রশ্নগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ অনেক মানুষ ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার পরও, এসব প্রশ্নের গুরুত্ব একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। তবে প্রশ্নটি খুব বড়ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলো, নারায়ণগঞ্জে সাত অপহরণ হত্যার ঘটনার পর। র্যাব কর্তৃক অপহরণ এবং হত্যার সংবাদ যখন জানা গেল, দেশের প্রায় সব মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করলেন যে, ‘অপহরণ’ ‘গুম’ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীই করে। এই একটি ঘটনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ইমেজ ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতির কারণ হয়েছে।
‘গুম’ ‘অপহরণ’র ইতিহাস নয়, আজকের লেখার প্রসঙ্গ ফরহাদ মজহার। প্রায় চাপা পড়ে যাওয়া এই প্রসঙ্গটি নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।
১. ভোরবেলার ঘটনা সকাল ৮টার দিকে ফরহাদ মজহারের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হলো। দুপুর থেকে মোটামুটিভাবে সারা দেশের মানুষ বিষয়টি জেনেছেন। জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যারা ফরহাদ মজহারকে পছন্দ করেন তারা তো বটেই, অপছন্দকারীরাও তাকে উদ্ধারের দাবি জানিয়েছে। মানুষ ধরেই নিয়েছে ফরহাদ মজহার অপহৃত হয়েছেন। মানুষ এও বিশ্বাস করে নিয়েছে এই অপহরণের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পৃক্ত। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের বিক্ষুব্ধ মনের প্রকাশ ঘটেছে। এবং তার প্রায় পুরোটা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা সরকারের বিরুদ্ধে। ফরহাদ মজহার অপহৃত হননি, নিজেই নাটক করেছেন- এই আলোচনাও শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু তা খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। তাকে বাস থেকে উদ্ধার করার আগে-পরে পর্যন্ত পুলিশ এমন ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে সফল হয়নি। উল্টো মানুষ আরও বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। ফলশ্রুতিতে পুলিশ তার বক্তব্য কিছুটা পরিবর্তনও করেছে। কিন্তু সবকিছু উলট-পালট করে দিল কিছু সিসিটিভি ফুটেজ।
২. প্রথম সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল ফরহাদ মজহার খুলনা নিউমার্কেট দিয়ে ঘুরছেন। সেই ফুটেজ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হলো। বলার চেষ্টা করা হলো, ফরহাদ মজহার হাঁটছেন, তবে ভীত-সন্ত্রস্ত। কেউ হয়তো দূরে দাঁড়িয়ে তাকে নির্দেশনা দিচ্ছেন। সেই অনুযায়ী তিনি হাঁটছেন। তার পরনের লুঙ্গি একবার সাদা, একবার রঙিন মনে হচ্ছে। বিষয়টি জনমনে তেমন স্থান পেল না। তাকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসীরাও সন্দেহে পড়ে গেলেন। সন্দেহের বড় কারণ, আদালতে ফরহাদ মজহারের জবানবন্দি। ভিক্টিমের জবানবন্দি এভাবে নেয়া আইন অনুযায়ী হয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন আছে। তা এই আলোচনায় আনছি না। আদালতের জবানবন্দিতে ফরহাদ মজহার বলেছেন, সারাদিন তার চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। সন্ধ্যার পরে চোখের বাঁধন খুলে বাসের টিকেট ধরিয়ে দেয়া হয়। সেই বাসে তিনি ফিরছিলেন। তখন পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। খুলনা নিউমার্কেটে নিজের ইচ্ছেয় বা কারও নির্দেশনায় ঘোরাঘুরি করেছেন বা করতে বাধ্য হয়েছেন, এমন কোনো কথা তিনি আদালতে বলেননি।
৩. ‘লুঙ্গির রঙ, বাধ্য হয়েছেন’ এমন আলোচনা চলাকালীনই আরও একটি সিসিটিভি ফুটেজের সন্ধান পাওয়া গেল। ‘লুঙ্গির রঙ, বাধ্য হওয়া’র প্রসঙ্গ গুরুত্ব হারালো। সিসিটিভি ফুটেজে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তিনি একটি দোকানে দাঁড়িয়ে মোবাইল নাড়াচাড়া করছেন। সম্ভবত সিম পরিবর্তন করছেন। একবার দোকান থেকে চলে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর আবার আসছেন। ব্যাগ থেকে টাকা বের করছেন, কয়েকবার গুনছেন। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তিনি টাকা কোনো মোবাইল নাম্বারে পাঠাতে বলছেন, দোকানদার সেই নাম্বার খাতায় লিখছেন। ফরহাদ মজহার টাকা দিচ্ছেন। এই ঘটনার কিছুই তিনি আদালতে বলেননি।
৪. এই দুটি সিসিটিভি ফুটেজের পর আর একথা বলার সুযোগ নেই যে, ফরহাদ মজহার অপহৃত হয়েছিলেন। প্রথমাবস্থায় পুলিশের বক্তব্য মানুষ বিশ্বাস করেনি। সিসিটিভি ফুটেজ দেখার পর পুলিশের বক্তব্য বিশ্বাস না করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। পুলিশ একজন নারীর সন্ধান পেয়েছে, তাকে এনে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। তার সঙ্গে ফরহাদ মজহারের অনৈতিক সম্পর্ক, তাকে টাকা পাঠানো প্রসঙ্গগুলোর কথা পুলিশ বলেছে। যা সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গেছে। পুলিশ বলেছে, ফরহাদ মজহার নিজের ইচ্ছেই গিয়েছিলেন, সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যে তিনি নিজেই অপহরণ নাটক করেছেন। পুলিশের এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। ফরহাদ মজহারের অপহরণের বক্তব্য অবিশ্বাস করছেন প্রায় সবাই।
৫. পুলিশের বক্তব্য, ফরহাদ মজহারের পরিবারের ও তার নিজের বক্তব্য, মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ফরহাদ মজহারের নিজের বক্তব্য। পূর্বে যা দিয়েছেন তা নয়, এখন যা দেবেন তার কথা বলছি। ফরহাদ মজহার অসুস্থ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে গেছেন। হাসপাতালে থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’র সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। বলেছেন, অন্য সব অপহৃত যারা ফিরে এসে কথা বলেননি, তিনি তাদের মতো নন। তিনি ভীত নন। তিনি অপহরণের সবকিছু জানাবেন। ফরহাদ মজহার যখন গার্ডিয়ানকে এসব কথা বলেছেন, তখন সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসেনি। সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসার পর ফরহাদ মজহার পুরোপুরি চুপ হয়ে গেছেন। কেন তিনি চুপ হয়ে গেলেন, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। তিনি অসুস্থ, তিনি ভয় পেয়েছেন, গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলার পর এই যুক্তি অচল। এখন তার কথা না বলার অর্থ, তিনি অপহৃত হয়েছেন বলে যা যা পূর্বে বলেছিলেন, তার কোনো কিছুই সত্যি নয়। তিনি সারা দেশের মানুষের সঙ্গে অন্যায় করেছেন, প্রতারণা করেছেন। তিনি স্বেচ্ছায় গেছেন, সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যে গেছেন, একজন নারীকেন্দ্রিক ঘটনায় পুরো পরিস্থিতি তৈরি করেছেন- পুলিশের এই বক্তব্যই এখন মানুষ বিশ্বাস করছে। ফরহাদ মজহার চুপ থেকে মানুষকে বিশ্বাস করতে সহায়তা করছেন। সিসিটিভি ফুটেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে কাজ করছে।
সেদিন কোনো এক সময়ে ফরহাদ মজহার ফোনে তার স্ত্রীকে বলেছেন, ওদের বলবা টাকা ডেলিভারি হয়ে গেছে। কোন টাকা ডেলিভারির কথা বলেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর ফরহাদ মজহারের থেকে অবশ্যই জানা দরকার। টাকা দিয়ে তিনি মুক্ত হয়েছেন, সম্ভবত স্ত্রীকে দিয়ে একথা বলাতে চেয়েছেন। এই টেলিফোন অডিও প্রমাণ করে, তিনি নাটক করেছেন, অপহরণ হননি। কথা না বলে চুপ থাকলে এটাই হবে সত্যি। আর যৌক্তিক – বিশ্বাসযাগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারলে, সেটা বিবেচনায় নিয়েই সবকিছু আবার পর্যালোচনা করা হবে।
৬. ফরহাদ মজহার নিজে যদি এত বড় অপহরণের নাটকটি সাজিয়ে থাকেন, তা আসলে কত বড় অপরাধ? নাটক করে থাকলে তিনি ষোলো কোটি মানুষের কাছে অপরাধী। আমরা যারা তাকে উদ্ধারের দাবিতে অপহরণ করার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলাম, তাদের সঙ্গে তিনি বড় মাপের অপরাধ করেছেন। গত কয়েক বছরে সারা দেশ থেকে কয়েক’শ মানুষ ‘অপহৃত’ ‘গুম’ হয়েছেন। ফরহাদ মজহার সবচেয়ে বড় অপরাধ করেছেন এসব ‘অপহরণ’ ‘গুম’ হওয়া মানুষ ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। অপহরণের দায়ে অভিযুক্তরা সবসময় যা বলেন, এখন তা উদাহরণ দিয়ে বলবেন যে, এসব অভিযোগ সত্যি নয়। ফরহাদ মজহার যেভাবে নাটক করেছেন, অনেকেই সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যে ‘অপহরণ’ হয়েছেন বলে প্রচার করছেন। ফরহাদ মজহার একই সঙ্গে বড় মাপের অনেক অপরাধ করেছেন।
৭. ফরহাদ মজহারের বয়স ৭০ বছর। তিনি সিনিয়র সিটিজেন। কবি-লেখক। তার প্রতি অবশ্যই কোনো অন্যায় করা যাবে না। পুরো বিষয়টির সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার। তদন্তে ফরহাদ মজহার দোষী প্রমাণিত হলে, বয়স-বুদ্ধিজীবী, কবি-লেখক কোনো পরিচয়ই গুরুত্ব পাওয়া উচিত নয়। একমাত্র গুরুত্ব পাওয়া উচিত ‘অপরাধ’। অবশ্যই দেশের প্রচলিত আইনে তার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আইজিপি বলেছেন, ফরহাদ মজহার যদি পুলিশের তদন্ত চ্যালেঞ্জ করে, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটা কেমন কথা? ফরহাদ মজহার এখন যে চুপ থাকার নীতি নিয়েছেন, সেভাবেই যদি থাকেন তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন না? এটা তো আইনের ভাষা নয়। আবারও বলছি, ফরহাদ মজহারের প্রতি অবশ্যই কোনো অন্যায় করা যাবে না। তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছভাবে। দোষী বা অপরাধী প্রমাণিত হলে, অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। যে নারীর প্রসঙ্গ এসেছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা হোক।
৮. পুলিশ প্রসঙ্গ দিয়ে লেখা শেষ করব। এই ফরহাদ মজহার ঘটনায় পুলিশের বক্তব্য জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। এটা পুলিশের জন্যে খুব ভালো সংবাদ। তবে পুরো ঘটনায় পুলিশের পেশাদারিত্বের ঘাটতি তীব্রভাবে চোখে পড়েছে।
ক. পুলিশ সকাল ৮টায় ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকে কমপক্ষে ৬ বার ফরহাদ মজহারের অবস্থান শনাক্ত করেও তাকে আটকানোর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
খ. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবস্থান শনাক্ত করা বিষয়ে বলেছেন, ‘আমরা তো জানি না তিনি কোথায় আছেন। আমরা তখন তার টেলিফোনের অবস্থান নির্ণয় করতে পেরেছি। পুলিশ তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে পরে অভিযান চালিয়েছে। ৃতার আরিচা-মাগুরা পার হয়ে যাওয়ার ঘটনা পুলিশ অনুসরণ করেছে।’
ফরহাদ মজহারের মোবাইল টেলিফোনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া মানেই তো তার অবস্থান নিশ্চিত হওয়া। অনুসরণ করল কিন্তু ধরতে বা আটকাতে পারল না? এটা কেমন কথা হলো?
গ. আইজিপি বলেছেন, আরিচা পার হয়ে যাওয়ার পরে আমরা তার অবস্থান শনাক্ত করতে পেরেছি। এর আগে পুলিশের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে গাবতলী থেকে খুলনা পর্যন্ত ৬বার ফরহাদ মজহারের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। আরিচা পার হওয়ার আগে ফরহাদ মজহারের মোবাইল ফোন কয়েকবার খোলা হয়েছে। তিনি স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। আইজিপির কথা অনুযায়ী এই সময়ে পুলিশ যদি তার অবস্থান শনাক্ত করতে না পেরে থাকে, এটাও তো পেশাগত বা প্রযুক্তিগত দিক থেকে পুলিশের বড় মাপের ব্যর্থতা।
ঘ. আইজিপি বলেছেন, আমরা আরিচার পর থেকে সব মাইক্রোবাসে তল্লাশি করেছি। মাইক্রোবাসে অপহরণ করা হয়েছে, একথা আপনারা শুনেছেন। আর নিজেরা প্রযুক্তি দিয়ে মোবাইলের অবস্থান শনাক্ত করেছেন। মোবাইলের অবস্থান সুনির্দিষ্ট করে শনাক্ত করা যায়। বাস বা অন্য পরিবহন বাদ দিয়ে, শুধু মাইক্রোবাসে তল্লাশি কেমন পেশাদারিত্ব বা বিচক্ষণতার পরিচয় হলো? অপহরণকারীরা তো কৌশলগত কারণেও মাইক্রোবাসের গল্প বলতে পারে, এই সন্দেহ পুলিশের মনে আসবে না?
ঙ. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবস্থান শনাক্ত করে খুলনায় তল্লাশি শুরু করে। কিন্তু সিসিটিভির ফুটেজ বলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করে তল্লাশি আর বাস্তবতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। তার খুলনা নিউমার্কেটে ঘোরাঘুরি, টাকা পাঠানো এসব সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার অবস্থান শনাক্ত করতে পারেনি। ভুল জায়গায় ভুল সময়ে অভিযান চালানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা তো সীমাহীন।
চ. সত্য হলে অবশ্যই এক বা একাধিক নারীর প্রসঙ্গ তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে। একজন নারী, যার প্রসঙ্গ এই প্রেক্ষিতে এসেছে, পুলিশ যার সন্ধান বের করেছে, তার প্রতি দায়িত্ব তো পালন করতে হবে। পুলিশ কোনো অবস্থাতেই তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করে দিতে পারে না। গণমাধ্যমও তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করে সংবাদ পরিবেশন করতে পারে না। এক্ষেত্রে এই নারীর প্রতি পুলিশ এবং গণমাধ্যম সঠিক আচরণ করেনি। আর সিসিটিভি ফুটেজ এভাবে ছড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ করা দরকার ছিল না যে, ফরহাদ মজহার অপহৃত হননি। ভিডিও ফুটেজ পুলিশ সংরক্ষণ করে, তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে উপস্থাপন করলে আরও ভালোভাবে প্রমাণ করা যেত যে, ফরহাদ মজহার অপহৃত হননি। সেক্ষেত্রে হয়তো আরও দু’একদিন সময় লাগত। পেশাদারিত্বের কারণে সেটাই হতো পুলিশের সঠিক কাজ।
ছ. অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, আইনগত সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। পুলিশ এই তদন্তটি সম্পন্ন করুক, ফরহাদ মজহার কীভাবে, কোন পরিবহনে খুলনায় গেলেন। সারা দিনের পুলিশের কর্মকা- নিয়ে ওঠা হাজারো প্রশ্ন, নির্মোহভাবে তদন্ত করে, নিজেদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে, আরও সক্ষম হয়ে উঠুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
সিনিয়র সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজার ফেসবুক স্ট্যাটাস ।
