বিনোদন ডেস্ক ॥
আজকের এফডিসি চেনার উপায় নেই। নেই কোন শুটিং আর লাইট-ক্যামেরা নিয়ে হাক ঢাক। সুনসান নিরবতায় মুড়ানো। শোক আর বেদনাময় ছাপ। কারণ, আসছেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক।
‘লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন’ শব্দে যে মানুষটি নিজেকে মেলে ধরতে হাজারবার গিয়েছেন এফডিসিতে, আজ শেষবারের মতো নিথর দেহে সেখানে তিনি। আজ হয়তো কারো সঙ্গে কথা বলবেন না, শুধু ভক্ত আর মানুষের ভালবাসা দেখবেন চুপচাপ নিশ্চিন্তে।
মঙ্গলবার সকাল ১১টায় নায়করাজ রাজ্জাকের মরদেহ ঢাকার গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘর থেকে শেষবারের মতো নিয়ে আসা হয়েছিলো তার প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে।
এখানের ইট পাথরে মিশে আছে রাজ্জাকারে শরীরের ঘ্রান। এখানেই এক্সট্রা শিল্পী থেকে মাহানায়ক হয়ে উঠেছেন তিনি। শোকে তাই বুঝি নিথর সবকিছু। সকালে ছিলো বৃষ্টির ঝমঝমানি।
পাঁচ যুগেরও বেশি সময়ের স্বজনকে হারিয়ে যেন কাঁদছে এফডিসিটাও। কিন্ত নায়করাজের মরদেহ এফডিসিতে পৌঁছাতেই রোদের আলোয় হেসে উঠলো প্রকৃতি। বুঝি বা এফডিসির সঙ্গে তার বোঝপড়া হলো, প্রিয় মানুষটির শেষ বিদায়ে একটু হাসিমুখে থাকার।
কিন্তু ভারি ছিলো এফডিসির প্রাঙ্গন, আকাশ-বাতাস। ঘরের বাইরে মরে যাওয়া মানুষের লাশটা যখন ঘরে ফিরিয়ে আনা হয় তখন প্রতীক্ষায় থাকা স্বজনেরা লাশের মুখ দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এমনই এক দৃশ্য দেখা গেল আজ বেলা ১১টায়, এফডিসিতে। সকাল থেকেই ভিড় করছিলেন সবাই। বাড়ছিলো সেই ভিড়।
সবার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা, কখন আসবেন নায়করাজ। তিনি এলেন, একেবারে শোকের পাথর ভাসিয়ে দিয়ে গেলেন কান্না আর আহাজারিতে। সবাই যেন একে অপরকে জড়িয়ে কেঁদে কেঁদে হালকা হবার চেষ্টা করলেন। কেউ নেই সান্তনা দেয়ার। কে দেবে কাকে সান্তনা?
তিনি কার প্রিয়জন ছিলেন না! জনপ্রিয়তা আর গ্রহণযোগ্যতার আকাশ ছোঁয়া মানুষটির মধ্যে অহংকার ছিলো না। সব প্রজন্মের চলচ্চিত্র অভিনয় শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছেই তিনি নন্দিত। সবাইকেই তিনি পিতৃতুল্য আশ্রয় দিয়েছেন ভালোবাসায়। তাই তার বিরহে কান্নার বৃষ্টি থামাতে পারেনি কেউ।
এফডিসিতে অ্যাম্বুলেন্সেই রাখা ছিলো রাজ্জাকের লাশ। লাইনে দাঁড়িয়ে একে একে সবাই শেষ দেখাটা দেখে নিলেন। সবার চোখে জল। কাঁদছেন লুকিয়ে। কিন্তু চাপা সেই কান্না বুক ভেঙ্গে বেরিয়ে এলো যখন শাবনূর এলেন বাবার মতো শ্রদ্ধা করা রাজ্জাকে দেখতে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। তার কান্না সংক্রমিত হয়ে গেলো সবখানে।
দীর্ঘদিনের বন্ধুকে দেখতে এসে আবেগের বাঁধ ভাঙলেন ঢাকাই ছবির মিষ্টি নায়িকা কবরীও। হু হু করে কাঁদলেন ঢাকাই ছবির তিনকন্যা সুচন্দা, ববিতা ও চম্পা। ছিলেন দিলারা, মিনু রহমান, সুজাতা, রোজিনা, অঞ্জনা, নূতন, সৈয়দ হাসান ইমাম, আলমগীর, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, রুবেল, ওমর সানি, সাইমন, শাহনূর, জায়েদ খান, আলীরাজ, উজ্জ্বল, জাভেদ, আহমেদ শরীফ, শাকিব খান, অমৃতা, বুবলী, পপি, আমিন খান, ফেরদৌস, বদিউল আলম খোকন, আজাদ রহমান, ছটকু আহমেদ, মনতাজুর রহমান আকবর, শান আরাফ, কায়েস আরজু, ডি এ তায়েব, শিবা শানু, নাসরিন, তমা মির্জা, মাসুম বাবুল, দেবাশীষ বিশ্বাস, ড্যানিরাজ, হেলাল খানসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট পাঁচ শতাধিক মানুষ।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছিলেন তথ্যমন্ত্রী, তথ্যসচিব, এফডিসির পরিচালকসহ আরও অনেক কর্মকর্তাবৃন্দ। আর রাজ্জাকের পরিবারের মধ্যে ছিলেন তার দুই পুত্র বাপ্পারাজ ও সম্রাট।
সেখানেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল নায়করাজের প্রথম জানাজা। বলা হচ্ছে, স্মরণকালের মধ্যে এত বড় জানাজা আর কোনো অভিনেতার বেলাতে দেখা যায়নি। আর এজন্যই তিনি মহানায়ক, যার শেষযাত্রাও হলো মহা আয়োজনে।
যেখানেই থাকুন অদেখা ভুবনে, ভালো থাকুন আমাদের নায়করাজ। সর্বত্রই আজ উচ্চারিত হচ্ছে, ‘বড় ভালো লোক ছিলো’ এই অভিনেতা। স্রষ্টা তাকে তার যোগ্য সম্মান দান করুন।
উল্লেখ্য, রাজ্জাক পশ্চিমবঙ্গের (বর্তমান ভারতের) কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্বরসতী পূজা চলাকালীন সময়ে মঞ্চ নাটকে অভিনয়ের জন্য তার গেম টিচার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁকে বেছে নেন নায়ক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় চরিত্রে। শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহীতে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা।
তিনি ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি জমান। প্রথমদিকে রাজ্জাক তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে “ঘরোয়া” নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হন। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি আব্দুল জব্বার খানের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগড় লেন চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সবার কাছে নিজ মেধার পরিচয় দেন রাজ্জাক।
পরবর্তীতে কার বউ, ডাক বাবু, আখেরী স্টেশন-সহ আরও বেশ ক’টি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করে ফেলেন। পরে বেহুলা চলচ্চিত্রে তিনি নায়ক হিসেবে ঢালিউডে উপস্থিত হন সদর্পে। তিনি প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র।
১৯৯০ সাল পর্যন্ত বেশ দাপটের সাথেই ঢালিউডে সেরা নায়ক হয়ে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এর মধ্য দিয়েই তিনি অর্জন করেন নায়করাজ রাজ্জাক খেতাব। অর্জন করেন একাধিক সম্মাননা। এছাড়াও, রাজ্জাক জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করছেন।
