Skip to content

‘চোখের সামনে নিজের ১৮ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করা হচ্ছে’

বাংলাভূমি ডেস্ক ॥

‘চোখের সামনে নিজের ১৮ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করা হচ্ছে। এর চেয়ে বড় যন্ত্রণার কিছু পৃথিবীতে আর আছে?’- এভাবেই রাখাইনে নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা করছিলেন এক রোহিঙ্গা দম্পতি। বুক চাপড়ে চিৎকার করে কাঁদছিলেন।

শরীর কাঁপছে- লজ্জায়, ক্ষোভে, অপমানে। স্থানীয় এক ব্যক্তি আমাদের যখন বিষয়টি বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন তখন উপস্থিত সবার চোখ ভরে ওঠে জলে। এ কেমন নির্মমতা! মানুষ কি এমন বর্বরতা চালাতে পারে? এমন অসংখ্য ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তবে সব ঘটনা দৃশ্যপটে আসছে না। এটি এখন রাখাইন রাজ্যের নিত্যদিনের ঘটনা।

খাদিজা বেগম-তৈয়ব আলী দম্পতির বড় মেয়ে আরফা (১৮)। বিয়ের কথাবার্তা চলছিল। ঠিক এমন সময়ই বিভীষিকা নেমে আসে পরিবারটিতে। মেয়ের করুণ পরিণতি নিজ চোখে দেখেছেন বাবা-মা। ছোট্ট আরও চারটি জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছেন খাদিজা বেগম ও তৈয়ব আলী। দামি খাবার আর পোশাক না পেলেও বাংলায় ঠাঁই মিলেছে। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াক্যং ইউনিয়নেরর রইক্ষ্যং শরণার্থী ক্যাম্পে গতকাল দেখা ও কথা হয় দম্পতির সঙ্গে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা আমাদের সময়কে জানান, রোহিঙ্গা সুন্দরী নারীদের খুঁজে বের করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দোসর মগরা। প্রথমে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয় সেনাবাহিনীর কাছে। সেনাসদস্যরা তাদের প্রথমে ধর্ষণ করে। তার পর তুলে দেওয়া হয় মগদের হাতে। ঘরের মধ্যে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হয়। কাউকে-কাউকে জঙ্গলে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেনাক্যাম্পে।

তারা আরও জানিয়েছে, পুড়িয়ে দেওয়া বাড়িঘরের অবশিষ্ট থাকা দুই-একটি বাড়িতে অনেক ধর্ষিত নারীকে আটকে রাখা হচ্ছে। এ ছাড়াও সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে সুন্দরী নারীদের আটকে রাখার জন্য অস্থায়ী কারাগার বানানো হয়েছে। সেখানে চলছে দমন, নিপীড়ন-নির্যাতন। সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা দ্রুত রাখাইনে প্রবেশের অনুমতি না পেলে এসব নির্যাতিত নারীকে বাঁচানো যাবে না বলে মনে করছেন প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা রোহিঙ্গারা।

গতকাল দুপুরে টেকনাফের কয়েকটি প্রবেশপথে কথা হয় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। এর মধ্যে ওসমান ও আবু ইউসুফ নামে দুই ব্যক্তি জানান, রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যে সুন্দরী কেউ থাকলে তাকে পালাতেও দিচ্ছে না মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর মগরা। তাদের সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করার মতো কেউ নেই। বন-জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা অনেকেই এসব দেখে জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। হিংস্র সেনাবাহিনী ও মগদের সামনে কারো কিছু করার নেই।

ফিরে আসি খাদিজা বেগম-তৈয়ব আলী দম্পতির বিষয়ে। তারা মিয়ানমারের আরাকানের কুপখুলা এলাকার থানবাজার গ্রামের বাসিন্দা। প্রাচুর্য না থাকলেও সংসারে অভাব ছিল না।
খাদিজা বেগম স্থানীয় ভাষায় আমাদের সময়কে বলেন, নিজেদের বাড়িঘরে খুব ভালোই ছিলাম। মেয়েটা বড় হয়ে উঠল দেখতে দেখতে। স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে আরফা। যেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে পড়ার সুযোগ দিতে চায় না মিয়ানমার সরকার, সেখানে আরফার এই পড়াশোনাকে ‘বেশ গুরুত্ব’ দেওয়া হতো। সবাই ওকে খুব স্নেহ করত। ভালোবাসত। সেই মেয়েকে এভাবে চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখব ভাবিনি।

খাদিজা বেগম তৈয়ব আলী দম্পতির সঙ্গে আরও দুটি রোহিঙ্গা পরিবার বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আরফার এই দুই প্রতিবেশী পরিবারের সদস্যরাও এমন বর্বরতা মেনে নিতে পারেননি। গতকাল এই দুই পরিবারের সদস্যরাও আরফার ওপর চলা অমানুষিক নির্যাতনের করুণ বর্ণনা দেন।

সবাই যখন আক্ষেপ করে কথা বলছিলেন, এরই এক পর্যায়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন আরফার বাবা তৈয়ব আলী। তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, আমি আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। আমার মতো বাবার বেঁচে থাকার কোনো দরকার নেই। আরফার বাবা-মায়ের কান্নার মধ্যে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়। আকাশও যেন আরফার যন্ত্রণায় কাতর। গভীর মমতা আর বেদনা নিয়ে আকাশও কাঁদতে চায় মানুষের সঙ্গে!

গতকাল সকাল থেকেই টেকনাফ এলাকায় গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়। কখনো কখনো তা গতি পেয়ে অবিরাম ধারায় ঝরেছে। এমনিতেই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের সন্ধান করছে শরণার্থী রোহিঙ্গারা, এর মধ্যে আবহাওয়ার এমন বৈরী আচরণ তাদের কষ্ট-দুর্ভোগ যেন বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। তার পরও মানুষগুলো হাসতে চাইছে এই ভেবে, জীবন তো রক্ষা পেয়েছে। বেঁচে তো আছি! আহ জীবন!

ওই শরণার্থী ক্যাম্পেই দেখা মেলে গুলবাহারের। সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছেন মাঝবয়সী রোহিঙ্গা নারী। সঙ্গে আছে পরিবারের আরও ১০ সদস্য। কিন্তু প্রিয় দুজনকে আনতে পারেননি তাদের সঙ্গে। একজন তার বড় ভাই আবু আইজা, অপরজন মেয়ে লামিয়া।

আবু আইজাকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে সেনাবাহিনী। মেয়ের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম যৌন নির্যাতন। এর পর থেকে মেয়ের আর কোনো খবর পাননি এই মা। ধারণা করছেন, তাকে হত্যা করা হয়েছে, না হলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বন্দিশালায় নির্যাতনই সয়ে যেতে হচ্ছে।

তাদের একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন জিয়া রহমান। গুলিবিদ্ধ হয়ে টেকনাফ শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় মিলেছে তারও। টেকনাফের স্থানীয় একটি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়েছেন তিনি।

ওই ক্যাম্পে বসে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের বর্ণনা দেন আরও ৬ রোহিঙ্গা নারী। তাদের মধ্যে দুজন কিশোরী। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও মগদের চালানো নির্মম যৌন নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে তাদের বর্ণনায়।

জমিলা (ছদ্মনাম) নামে এক ধর্ষিতা আমাদের সময়কে বলেন, আমার বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করে মগরা। এর পর পরিবারের অন্যদের পালিয়ে যেতে বলা হয়। কিন্তু আমি যেতে চাইলে আমাকে আটকে ফেলা হয়। মগরা (মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দোষর) আমাকে ধর্ষণ করে। তারা ৯ জন ছিল। শরীরের কয়েকটি জায়গা জখমের চিহ্ন দেখিয়ে কাঁদতে থাকেন জমিলা।

তার কান্নায় কোনো শব্দ নেই, শুধু অশ্রু ঝরে। এই চোখের পানির শেষ কোথায় তা জামিলা নিজেও জানে না। সেইদিনের পর থেকে রাতে ঘুমাতে পারেননি তিনি। ঝিমুনি এলেই সেই দুঃসহ স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফেরে ২০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা তরুণীকে। সূত্র: আমাদের সময়।

 

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫