মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার ॥
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এ. এম. মনজুরুল ইসলাম ৭১’এ যুদ্ধ করে ছিলেন পাকিস্থানী শোষন-নির্যাতনের হাত থেকে এ দেশকে মুক্ত ও স্বাধীন করার জন্য। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য দরকার একটি বাসস্থান এবং দু’মুঠো ভাত, তার চেয়ে বেশি স্বপ্ন ছিল না তাঁর। কিন্তু তিনি হেরে গেছেন, জীবন সংগ্রামে পদে পদে এ দেশের স্থানীয় দখলদারবাহিনী এবং প্রশাসনের উদাসীনতার কাছে। জীবদ্দশায় একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দখলদারবাহিনী ফিরিস্তি প্রশাসনের কাছে তুলে ধরলেও সুষ্ঠু বিচার পায়নি। তাছাড়া সরকারের বরাদ্দকৃত প্লটের দলিলও পায়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামে যে মানুষটি বীর দর্পে যুদ্ধের ময়দানে শক্রপক্ষের মোকাবেলায় পাকিস্থানী মিলিটারীর গুলিতে আহত হয়েছেন সেই মানুষটি জীবন সংগ্রামে হেরে গিয়ে বুকে কষ্ট ও বিতৃঞ্চা নিয়ে পারি দেন পরপারে। ২০০২ সালের ৭ আগস্ট মনজুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর বৃদ্ধা স্ত্রী শাহানুর বেগম গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুর এলাকায় ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রামে সরকারের বরাদ্দ পাওয়া ৫০ শতাংশ কৃষি জমি বেদখল হওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসন থেকে দলিল বুঝে নেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে এখন ক্লান্ত। তারপরও তিন হাল ছাড়েননি গত ১৪ সেপ্টেম্বর গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর এ সংক্রান্তে একটি আবেদন দাখিল করেছেন।
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এ. এম মনজুরুল ইসলামের স্থায়িনিবাস মুন্সিগঞ্জ জেলার টংগীবাড়ি থানার হাসাইল গ্রামে, পিতা আঃ গফুর মাস্টার। মন্ত্রণালয়ের সনদ নং ম- ১৮৭৬, মুক্তিবার্তা নং (লাল বই) ০১০৩০৫০২৩০, গেজেট নং- ৪২০।
১৯৮২ সালে পদ্মার ভাংগনে ভিটে-মাটি হারিয়ে স্ত্রী, দুই পুত্র ও তিন কন্যা নিয়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে গাজীপুর জেলার টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় ভাড়াবাড়ি নিয়ে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে তৎকালীন সরকার ছিন্নমূল মানুষের বাসস্থান ও কৃষি জমি বরাদ্ধের জন্য বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম ‘ভাওয়ালপুর গুচ্ছগ্রাম’ নামে প্রকল্প চালু করে। বর্তমানে যা ‘ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রাম’ নামে পরিচিত। এখানে ৪২টি পরিবার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। প্রত্যেককে বাসস্থানে জন্য আট শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ কৃষি জমি বরাদ্দ করে। বরাদ্দকৃত জমিতে ৪২ পরিবার প্রত্যেকে দখল বুঝে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেয়া ৪২ পরিবারের জমির মধ্যে ৩৪টি দলিল স্থানীয় প্রশাসন সম্পাাদন করে দেয়। কিন্তু এর মধ্যে রহস্যজনক কারণে বাকী আট পরিবারের জমির দলিল এ যাবত সম্পাদন হয়নি।
এ আদর্শ গ্রামের আওতায় কতিপয় সুযোগ সন্ধানী প্রভাবশালী ১৯৯৯ সালে নিরীহ মনজুরুল ইসলামের কৃষি জমিটুকু বেদখল করে নেয়। অনুরুপভাবে বিভিন্ন সময়ে বেদখল করে নিরীহ প্রকৃতির হাসেম উদ্দিন, সুরুজ বানু ও জাহেরার কৃষিজমি ।
মনজুরুল ইসলামের জীবদ্দশায় স্থানীয় প্রশাসের কাছে বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার এবং দলিল সম্পাদনের বিষয়ে একাধিকবার আবেদন করলে শুধু তদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সুফল পায়নি। শুধু নিরাশা ও হতাশার অশনি সংকেত গ্রাস করে নেয় এ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাকে।
এ বেদখলের অভিযোগ উঠে ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রামের সভাপতি আব্দুর রশিদ, দুলাল, আজম আলী ও সোলামানের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে বরাদ্ধকৃত প্লট ছাড়াও এ দাগে সরকারের আরো খাসজমি দখল করে অন্যত্রে বিক্রির করার। এরমধ্যে কিছু প্লটের জমির মাটি বিক্রি করে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করার।
গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়ৈপাড়া মৌজার এসএ ৫৪৮নং দাগে ২৫ একর ৪৮ শতাংশ সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভূক্ত জমি রয়েছে। ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রামটি ঐ মৌজায়। ৪২ পরিবারের প্রত্যেকে বাসস্থান ও কৃষি জমিসহ ৫৮ শতাংশ করে বরাদ্দ পেলেও ঐ দাগে আরো অতিরিক্ত ২ একর ৭৭ শতাংশ জমি অবশিষ্ট থাকে।
এসব দখলকারীরা ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রামের নক্সার ভিতর এবং বাহিরের পতিত প্লট বিভিন্ন জনের কাছে দখল দিয়ে মোটা অংকের টাকা নিচ্ছেন।
আব্দুর রশিদ নিজের কৃষি প্লট ছাড়াও মনজুরুল ইসলাম ও সুরুজ বানুর দু’টি কৃষিপ্লট দখল করে নেয়। দখলের পর হাত বদল (বিক্রি) করে নেয় তার ভাই আহসান। আহসান আবার বিক্রি করে অন্যত্র।
অপরদিকে প্লট বরাদ্দ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমানের ছেলে অন্ধ প্রতিবন্ধী হাফেজ কামরুজ্জামান অভিযোগ করেন, দলিল না পাওয়ার কারণে আঃ রশিদ তাঁর কৃষিপ্লট থেকে জবর-দখল করে প্রায় ২৫ শতাংশ জমি বহিরাগত চার ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে দেন। ঐ চারব্যক্তি বর্তমানে এখানে বসতভিটা তৈরি করে বসবাস করছেন।
সোলায়মানের মার নামে প্লট বরাদ্দ থাকলেও তার নামে কোন প্লট বরাদ্দ নেই। তবুও এ সোলায়মান দু’টি কৃষি প্লট জবর দখল করে পুকুর খনন করে ভোগ দখলে আছেন। এভাবে দুলাল নিজের প্লটসহ দু’টি প্লট দখল করে নেয়। আজম আলী নিজের প্লটসহ তিনটি প্লট দখল করে নেয়।
এরা প্রত্যেকেই প্লটের মাটি বিক্রি করে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছেন।

এ বিষয়ে ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রামের সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রামে ১৪/১৫টি পুকুর রয়েছে। এগুলো নিজের প্রয়োজনে খনন করা হয়। তবে জেলা প্রশাসকের কোন অনুমতি নেই। তিনি বেদখলের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, যাদের নামে বরাদ্দের দলিল আছে এমন ব্যক্তির জমি আমার দখলে নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি বলেন, ভাওয়ালপুর আদর্শ গ্রামে সরকারের দেখবালের অভাবে অনেক অনিয়ম, অরাজগতা চলছে। মাটি বিক্রি করা, পুকুর খনন, একজনের প্লট অপর জনের বেদখল, পজিশন বিক্রি, স্থায়ী ইমারত নির্মাণ ইত্যাদি নানা অনিয়ম, যেন দেখার কেউ নেই।
ভবানীপুর এলাকার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্যাহ গোলাপ বলেন, এদেশে যুদ্ধ হয়েছে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের জন্য। দেশ স্বাধীনের পর আবারও তাঁরা সুবিধা বঞ্চিত। দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর পূর্বে এখানে ভূমিহীন ৪২ পরিবারকে মাথা গুজার ঠাই করে দিয়েছিলেন সরকার। বিনা কারণে তাদের মধ্যে আট পরিবারকে তৎকালীন প্রশাসন গাফেলতি করে দলিল সম্পন্ন করে দেননি। তবে জেলা প্রশাসক আন্তরিক হলে যে কোন সময় এটা সম্ভব।
এ বিষয়ে বাংলাভূমিকে জেলা প্রশাসক ডক্টর দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন, বর্তমান সরকারের দর্শন হলো, আগামী ২০২০ সালের মধ্যে দেশে কোন ভূমিহীন রাখবে না। সে হিসেবে এ আট পরিবার যদি প্রকৃত ভূমিহীন হয় তবে তাদের বাসস্থান নির্মাণসহ কৃষি জমি বরাদ্দ দেয়া হবে।
