স্টাফ রিপোর্টার ॥
গাজীপুর: আর মাত্র দুদিন পর মঙ্গলবার গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। আর আগামী কাল রবিবার রাতেই শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। তাই শেষ মুহূর্তের নির্বচনী প্রচারণা ও গণসংযোগে এখন মহাব্যস্ত প্রার্থীরা। নির্বাচনের ভোট গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত শেষ মুহূর্তে আওয়ামীলীগ ও বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থীর প্রতিশ্রুতির বন্যায় প্রচারণায় যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা। পাশাপাশি কাউন্সিলর প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার ব্যাপকতাও বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে ২৬ জুনের নির্বাচনকে ঘিরে গাজীপুরে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য মাঠে নামছে প্রায় ১২ হাজার নিরাপত্তা কর্মী।
নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়নের আবারও দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মনোনিত মেয়র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা হাসান উদ্দিন সরকার। তবে এ দাবিকে অযোক্তিক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আওয়ামীলীগ মনোনিত মেয়র প্রার্থী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার গাজীপুরে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সেনা মোতায়নে দাবি নাকচ করে দিয়েছিলেন।
এদিকে নির্বাচন কমিশন ভোট গ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছেন। ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স, অমোচনীয়কালী এবং সিলসহ অন্যান্য নির্বাচনী সরজ্জাম গাজীপুরে বঙ্গতাজ অডিটরিয়ামে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে পৌঁচেছে। আগামীকাল সোমবার দুপুর থেকে সংশ্লিষ্ট ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভোট কেন্দ্রে প্রেরণ করা হবে। আগামী সোমবার থেকে নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ প্রায় ১২ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মাঠে নামবে।
বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার শনিবার এক পথসভায় অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচণের সার্থে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আবারও সেনাবাহিনী মোতায়নে দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন সেনাবাহিনী ছাড়া ভীতিহীন পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এদিকে সেনা মোতায়নের দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের জানান নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই বিএনপি এই অযোক্তিক দাবি তুলছে। নিশ্চিত পরাজয়ের আশংকায় তারা উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে ভোটাদের বিভ্রান্ত করছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়নে কোন প্রয়োজন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
১২ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন থাকবে
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আগের দিন সোমবার থেকে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসারসহ প্রায় ১২ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মাঠে থাকবে। স্থানীয় নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায় ৪২৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাকী ৮৮টি কেন্দ্র সাধারণ বলে চিহিৃত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর জন্য ২৪ জন এবং সাধারণ কেন্দ্রের জন্য ২২ জন করে সশস্ত্র পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া থাকবে পুলিশের টহল দল ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দারা। সব মিলিয়ে ২৬ জুন ভোটের দিন প্রায় ১২ হাজার নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করবে।
নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার রকিবউদ্দিন মন্ডল জানান নির্বাচন আচরণবিধি প্রতিপালন পর্যবেক্ষণ ও নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীকে তাৎক্ষণিক সাজা দিতে প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ১৯টি সংরক্ষিত মহিলা কেন্দ্রে একজন করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে। অপরদিকে ১৯টি মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স, ১০টি র্যাবের টহল টিম এবং ২৯ প্লাটুম বিজিবি মোতায়ন থাকবে।
চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা
দুইদিন পর নির্বাচনকে সামনে রেখে শনিবার শেষ মুহূর্তে প্রচারণায় প্রধান দুই মেয়র প্রার্থীসহ অপর পাঁচ মেয়র প্রার্থী ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। সকালে আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম ৫১ নং ওয়ার্ডের খরতৈল এলাকা থেকে প্রচারণা শুরু করেন। এরপর তিনি ৫২ নং ওয়ার্ডের মুদাফা, ৫৩ নং ওয়ার্ডের দেওড়া ফকির মার্কেট, ৫৫ নং ওয়ার্ডের মিলগেট এলাকায় গণসংযোগ ও পথসভায় বক্তব্য রাখেন। পরে বিকালে ৫৪ নং ওয়ার্ডের কলেজ রোড এলাকায় গণসংযোগ করেন। এসময় পথসভায় তিনি বলেন নৌকা প্রতীকে আমি বিজয়ী হলে গাজীপুর সিটিকে একটি পরিকল্পিত আধুনিক সিটিতে পরিণত করব। পাশাপাশি সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে যানজট নিরসন, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা দূরীকরণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করব। তিনি বলেন সেবক ও কর্মচারী হিসেবে সকলের সহযোগিতা নিয়ে নগরবাসীর সেবা করে ভোটারদের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চাই। এজন্য আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নৌকা মার্কায়, উন্নয়নের নৌকা মার্কায় ভোট চাই।
জাহাঙ্গীর আলমের পথসভায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজার হাজার নেতা-কর্মী, সমর্থক অংশগ্রহণ করেন। দুপুরে টঙ্গীর মিলগেট এলাকার পথসভায় হাজার হাজার মানুষের নৌকার জয়ধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত হয়ে উঠে। পথসভায় জাহাঙ্গীর আলম বলেন কোন কাজই ছোট নয় আমিও মিলগেট এলাকার ব্যবসায়ীদের মত কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছি। আমি নিজেও একজন কর্মচারী। সকল শ্রেণীর মানুষকে সমান ভাবে আমি সম্মান দেখাতে চাই। আমি গাজীপুরকে একটি বাসযোগ্য নগরীকে পরিণত করতে চাই। এসময় তার সাথে ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন, জালাল উদ্দিন মাস্টার, কাজী ইলিয়াস, মোস্তফা হুমায়ুন হিমু, সাইফুল ইসলাম, নীলিমা আক্তার লিলি প্রমুখ।
এদিকে জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় শনিবার বিকেলে প্রচারণায় অংশ নেন সাবেক মন্ত্রী ও সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়া, জেপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন, জেপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেন, গণতান্ত্রিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. শহিদুল্লাহ সিকদার। তারা পরে টঙ্গীর পাগার এলাকায় একপথসভায় বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনরে যুগ্ম সম্পাদক ডা. সৈয়দ আবু দাউদ মসনবী হায়দার পথসভায় সভাপতিত্ব করেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমার আকন্দের নেতৃত্বে নগরীর ২৮ নং ওয়ার্ডে গণসংযোগ করেন।

অপরদিকে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার শনিবার সকালে নগরীর হায়দরাবাদ এলাকা থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। পরে তিনি মাজুখান বাজার, নন্দীবাড়ি, বিন্দান, পূবাইল, ভাদূন, ইছালি ও কলের বাজার এলাকায় গণসংযোগের মাধ্যমে প্রচারণা চালান। এসময় তিনি বলেন নৌকা সমর্থরা আমাদের কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমরা সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই। এজন্য আমরা সেনা মোতায়নের দাবি করেছি। নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে ধানের শীষের বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। আওয়ামীলীগ প্রার্থী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে চাচ্ছে কিন্তু গাজীপুরের ভোটাররা সঠিক সিন্ধান্ত নিতে ভুল করবেন না। নির্বাচনী প্রচারণার সময় হাসান সরকারের সাথে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, কেন্দ্রীয় নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন, সাধারণ সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল প্রমুখ। হাসান উদ্দিন সরকারের পক্ষে নগরীর ৯নং ওয়ার্ডে প্রচারণা চালান বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, ৪০ ও ৪২ নং ওয়ার্ডে প্রচারণা চালান বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, ৫নং ওয়ার্ডে প্রচার কাজ চালান ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, ২৩নং ওয়র্ডে প্রচার কাজ চালান অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, ৩৯নং ওয়ার্ডে প্রচার কাজ চালান ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, ২৭নং ওয়ার্ডে প্রচারণা চালান আমানউল্লাহ আমাম, ২৮নং ওয়ার্ডে প্রচারণা অনুষ্ঠানে মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ৭নং ওয়ার্ডে প্রচারণা চালান সামসুজ্জামান দুদু, ৬নং ওয়ার্ডে প্রচারে অংশ নেন শিল্পী বেবী নাজনীন, ৩নং ওয়ার্ডে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু প্রমুখ। এছাড়া নগরীর ৩১ নং ওয়র্ডে প্রচারণা চালান দলীয় চেয়ারপাশনের উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন ফারুক, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়ের ও ইমরান সালেহ পিন্স ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে গণসংযোগ করেন।
