শাহান সাহাবুদ্দিন
বিশেষ প্রতিনিধি:
পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির সম্প্রতি এমন এক প্রস্তাব সামনে এনেছেন, যা শুধু বিস্ময় নয়, লজ্জা, হতাশা আর বিশ্ব-রাজনীতির প্রতারণার মুখোশও উন্মোচন করে। তিনি বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া উচিত। এই সেই ট্রাম্প—যিনি ফিলিস্তিনকে ছিন্নভিন্ন করেছেন, ইরানে যুদ্ধ চাপিয়েছেন, বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছেন দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের দোলাচলে। অথচ তাঁকেই শান্তির দূত বানানোর প্রস্তাব আসে! বিষয়টি নিছক বিতর্ক নয়, এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি প্রতীকী এবং ভয়ঙ্কর চিত্র—যেখানে পুরস্কার হয়ে উঠেছে ক্ষমতা আর চাটুকারিতার হাতের খেলনা।
আজকে দাঁড়িয়ে শান্তিতে নোবেল, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক কিংবা পিপিএম-বিপিএম—এসব পুরস্কার মানেই আর ন্যায়বোধের প্রতীক নয়। বরং এগুলো হয়ে উঠেছে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দখলে থাকা এক একটি মুখোশ, যার আড়ালে থাকে বর্বরতা, ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক লবিংয়ের কুৎসিত সমীকরণ।
বাংলাদেশের দিকে তাকান—
ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ নামটি এখন বর্বরতা ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগের প্রতীক।
তিনি শুধু সাংবাদিককে পেটাননি—রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গোপনে ধরে নিয়ে নির্যাতন, জমি দখল, চাঁদাবাজি, এমনকি শত কোটি টাকার সম্পত্তি লুটপাটের অভিযোগ পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
তবু তাঁর বুকেই ঝুলে পিপিএম-বিপিএম।
এদিকে আ ক ম মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে রয়েছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ—ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ তৈরি, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং আদালতের বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা। সম্মুখ মুক্তিযোদ্ধারা তাকে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছেন। ১৯ মার্চ ১৯৭১ জয়দেবপুর প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্বের দাবিও ইতিহাস বিকৃতি বলে মনে করেন প্রকৃত নেতৃত্বদানকারীরা। ২০২৪ সালে অভিনেত্রী ইলোরা গহর অভিযোগ করেন, মোজাম্মেল হক ভিডিও কলে তাকে উত্ত্যক্ত করে অশোভন প্রস্তাব দিয়েছিলেন। রাজাকারের তালিকায় নিরীহদের নাম ঢুকিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। এতসব বিতর্ক, প্রশ্ন ও নিন্দার মাঝেও তিনি কীভাবে পেলেন স্বাধীনতা পুরস্কার—সেটিই আজকের বড় প্রশ্ন।
এমনকি ছারছিনার পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ—একজন আলোচিত রাজাকার, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানপন্থী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তিনিও পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক।
এই কি তাহলে আমাদের ন্যায়ের মানদণ্ড?
পশ্চিমেও একই নাটক।
ডোনাল্ড ট্রাম্প—শান্তির কথা বলে কিম জং উনের সঙ্গে হাত মেলালেও, মধ্যপ্রাচ্যে চালিয়েছেন চরম ইসরায়েলপন্থী কূটনীতি।
তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করে ফিলিস্তিনের হৃদয়ে ছুরি বসিয়েছেন।
তিনি ইরানকে ঘিরে চাপ তৈরি করেছেন, পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে আমেরিকাকে একতরফাভাবে সরিয়ে নিয়েছেন।
কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছেন ইরাকের মাটিতে—যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সামিল।
এমন একজন চক্রান্তকারী নেতাকে শান্তির নোবেল মনোনয়নে তোলা হয়—আর এটিই এই পুরস্কারের আজকের দেউলিয়াপনা।
বারাক ওবামা (নোবেল ২০০৯)—আফগানিস্তানে সেনা বাড়ালেন।
লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে ফেলে দিলেন।
পাকিস্তানে ড্রোন চালালেন।
ইরাকে তাঁর নীরব সহায়তায় সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
ইয়েমেন-সিরিয়া-সোমালিয়া রক্তে ভেসে গেলো।
ওবামা শান্তির নোবেল পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ড্রোনে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে শিশুদের দেহ!
ইতিহাস তাঁকে “Drone President” বলেই মনে রাখবে।
হেনরি কিসিঞ্জার (নোবেল ১৯৭৩)—এই লোক ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্থপতি।
চিলিতে গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দেকে সরিয়ে স্বৈরশাসক পিনোচেটকে ক্ষমতায় আনেন।
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন।
তবু শান্তির নোবেল পেয়েছেন!
বিশ্বখ্যাত বুদ্ধিজীবী টমাস লারসন লিখেছিলেন—“If Kissinger can win a peace prize, so can Satan।”
আং সান সু চি (নোবেল ১৯৯১)—একসময় গণতন্ত্রের প্রতীক ছিলেন।
পরে ক্ষমতায় এসে রোহিঙ্গা গণহত্যাকে সমর্থন করেছেন, যা জাতিসংঘ ‘জাতিগত নির্মূল’ বলেছে।
তবুও নোবেল তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়নি।
এতেও শেষ নয়।
আবিয় আহমেদ (নোবেল ২০১৯)—ইরিত্রিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির জন্য পুরস্কার পেলেও, পরে ইথিওপিয়ার টিগ্রে অঞ্চলে চালালেন নিপীড়নের রাজনীতি। জাতিসংঘ বলেছে—সেখানে নারী নির্যাতন, গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
মেনাচেম বেগিন (নোবেল ১৯৭৮)—ইসরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, ইরগুন নামের এক সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা, দেইর ইয়াসিন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।
তবু শান্তির পুরস্কার তাঁর গলায়।
শিমন পেরেস ও ইতজাক রবিন (নোবেল ১৯৯৪)—ফিলিস্তিনের সঙ্গে শান্তিচুক্তির ছদ্মবেশে ইসরায়েলি আগ্রাসনের নায়ক।
শিমন পেরেস লেবাননে কানা হত্যাকাণ্ডের সময় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন, যেখানে শতাধিক শিশু ও নারী নিহত হন।
মো. আনোয়ার আল-সাদাত (নোবেল ১৯৭৮)—ইসরায়েলের সঙ্গে আপস করে আরব বিশ্বের ঐক্য ভাঙলেন।
ফিলিস্তিন আন্দোলন দুর্বল হল তাঁর কারণে।
তবুও শান্তির পদক তাঁরই হাতে।
এই যদি হয় মানদণ্ড, তাহলে ইতিহাস আসলেই এখন নাট্যশালা। পুরস্কার কেবল একেকটি প্রপস।
রক্তে রাঙা হাতে গলে ওঠে শান্তির মালা।
সত্য, সাহস, ত্যাগ—এসব এখন মঞ্চের পেছনের চুপচাপ দর্শক।
আজ যদি ট্রাম্প শান্তির নোবেল পেয়ে যান, কিংবা আরও কিছু ছারছিনা জাতীয় মুখোশধারী স্বাধীনতা পদক পেয়ে যান—আমি বিস্মিত হবো না।
আমি শুধু বলব—লজ্জিত।
আমি পুরস্কারের বিরুদ্ধে নই।
আমি শুধু চাই, পদক যেন হয় সত্য, ত্যাগ, নৈতিকতার স্বীকৃতি।
যেখানে শিশুদের কান্না, লাশের রক্ত কিংবা নিপীড়নের শিকার মানুষের আর্তনাদ পদকের নিচে চাপা না পড়ে।
সম্মান যদি খুনির গলায় ঝোলে—তবে সেই সম্মান আমাদের প্রয়োজন নেই।
২১ জুন ২০২৫
শাহান সাহাবুদ্দিন: কবি,লেখক ও সাংবাদিক
shahanpoet@gmail.com
