Skip to content

শহীদ সাংবাদিক মেহেদী হাসানের স্মরণসভায় সাঈদুর রহমান রিমন: “ঐক্যবদ্ধ না থাকায় সাংবাদিকরাই আজ সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত”

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের সাহসী পেশাদার সাংবাদিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন শহীদ সাংবাদিক হাসান মেহেদী। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের গুলিতে নিহত এই সাহসী সংবাদযোদ্ধার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে স্মরণ করলেন দেশের প্রবীণ সাংবাদিক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন্যতম রূপকার সাঈদুর রহমান রিমন।

১৮ জুলাই, বৃহস্পতিবার, রামপুরা হাতিরঝিল প্রেসক্লাবের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় শহীদ সাংবাদিক হাসান মেহেদীর স্মরণসভা। সেখানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রিমন। স্মরণসভায় তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ না থাকার কারণেই আজ তারা সবচেয়ে বেশি হামলা ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। মাঠে একজন সাংবাদিক আক্রান্ত হলেও পাশে কেউ দাঁড়ায় না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক বাস্তবতা।”

সাইদুর রহমান রিমন স্মরণসভায় শহীদ হাসান মেহেদীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং তার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে ‘শহীদ সাংবাদিক মেহেদী হাসান স্মৃতি সংসদ’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “একজন সাংবাদিক যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য তুলে ধরতে রাজপথে নামে, তখন সে শুধু সংবাদকর্মী নয়—একজন নায়ক হয়ে ওঠে। হাসান মেহেদী ছিলেন ঠিক তেমনই এক অকুতোভয় সৈনিক।”

সাংবাদিক সমাজে বৈষম্য ও সংগঠনের অভাব
স্মরণসভায় রিমন সরাসরি আক্ষেপ করে বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাংবাদিকরা নিজেদের পেশাগত ঐক্যে অত্যন্ত দুর্বল। যে কারণে একজন সাংবাদিক আহত বা নিহত হলেও, তার পাশে দাঁড়ানোর মতো সংগঠিত কাঠামো গড়ে ওঠেনি।” তিনি বলেন, “মাঠে একজন সাংবাদিকের রক্ত ঝরে, অথচ তার প্রতিষ্ঠান, সহকর্মী এমনকি সমাজও অনেক সময় নিরব থাকে। এ চিত্র আমাদের সাংবাদিকতা পেশার জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।”

এই সমস্যা উত্তরণে তিনি থানা পর্যায়ে শক্তিশালী প্রেসক্লাব গঠনের আহ্বান জানান। বলেন, “বর্তমানে যেসব থানা এলাকায় প্রেসক্লাব আছে, সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। ফলে কোনো বৃহত্তর সাংগঠনিক শক্তি তৈরি হচ্ছে না। আমি আশা করি, একটি ‘ঢাকা প্রেসক্লাব ইউনিট’ গঠন করে থানা ভিত্তিক প্রেসক্লাবগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

শহীদ মেহেদীর আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্যাতন
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে যাত্রাবাড়ী উড়ালসেতু এলাকায় পুলিশের ছোড়া ছররা গুলিতে নিহত হন দৈনিক ঢাকা টাইমস-এর সিনিয়র রিপোর্টার হাসান মেহেদী। তাঁর শরীরে শতাধিক ছররা গুলি লাগে, যদিও তার গলায় ঝুলছিল স্পষ্ট পরিচয়পত্র। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি ক্যামেরা আর কলম হাতে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে সাংবাদিক সমাজসহ সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিকভাবে ইউনেস্কো, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস এবং সিপিজের মতো সংস্থাগুলো এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানায়।

রিমন বলেন, “হাসান মেহেদীর মৃত্যু শুধু একটি জীবনহানির ঘটনা নয়, এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট। তাঁর মৃত্যুতে প্রমাণিত হয়েছে, সত্য বলার দায় কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তার রক্ত বৃথা যায়নি—তার আত্মত্যাগই আন্দোলনকে বেগবান করেছে।”

আইনি জটিলতা ও বিচারের প্রত্যাশা
স্মরণসভায় আরও উঠে আসে, কীভাবে হাসান মেহেদীর মৃত্যুর পর দায়সারা তদন্ত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে পুলিশ বিএনপি-জামায়াত সংশ্লিষ্টদের অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করে, এরপর এক ‘ফুফু’ পরিচয়ে আরেকটি বিভ্রান্তিকর মামলা হয়।

পরবর্তীতে তার পরিবার নতুন মামলা দায়ের করতে চাইলেও আগের মামলার কারণে সেটি গ্রহণ করা হয়নি। পরে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় নতুন মামলা করা হলেও, শর্তসাপেক্ষে অভিযুক্ত ছয় পুলিশ কর্মকর্তার নাম বাদ দেওয়ার কারণে বিচার প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। এখন পর্যন্ত মামলায় তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের পথচলা
সাঈদুর রহমান রিমন বলেন, “সাংবাদিকদের জন্য একটি নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। সাংবাদিকদের নিপীড়ন বন্ধ না হলে গণতন্ত্র কখনোই বিকশিত হবে না।” তিনি রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও ন্যায্যতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

তিনি আরও বলেন, “হাসান মেহেদীর রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে, আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। থানা পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তুলে একটি কেন্দ্রীয় শক্তিশালী কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করতে হবে। সাংবাদিকদের আর নিঃসঙ্গভাবে মরতে দেওয়া যাবে না।”

স্মরণসভা শেষে উপস্থিত সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও মেহেদীর পরিবারের সদস্যদের সকলের কণ্ঠে ছিল একটিই দাবি—“হত্যাকারীদের শাস্তি চাই, আর কখনো কোনো হাসান মেহেদীকে যেন প্রাণ দিতে না হয় শুধু সাংবাদিকতা করার কারণে।”

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫