মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ডহরি—তালতলা খালে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আবারও দাপটের সঙ্গে চলাচল করছে বালুবাহী বাল্কহেড। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিত চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে শত শত বাল্কহেড চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছে ।
ফলে খালের দুই তীরে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে হাড়িদিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প, বসতবাড়ি, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা।
মঙ্গলবার ২১ জুলাই সরজমিনে গেলে স্থানীয়রা জানান, গত এক সপ্তাহে বাল্কহেডের ঢেউয়ে হাড়িদিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের গোয়ালঘর, নুরপুর গ্রামের বসতঘর, কৃষিজমি ও একাধিক বসতবাড়ির অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে শতাধিক পরিবার চরম ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, মসজিদ, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হুমকির মুখে রয়েছে।
গত ১২ মে উপজেলা প্রশাসন ডহরি—তালতলা খালে বাল্কহেড চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও বাস্তবে সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি। বরং একটি প্রভাবশালী চক্র চালকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে নির্বিঘ্নে বাল্কহেড পারাপারের ব্যবস্থা করছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে এই খালে বাল্কহেডের ধাক্কায় একটি পিকনিকের ট্রলার ডুবে নারী ও শিশুসহ ১০ জন নিহত হন। এর আগেও একই ধরনের দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এসব ঘটনার পর জেলা প্রশাসন এবং পরে উপজেলা প্রশাসন কয়েক দফা বাল্কহেড চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সে সময় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চলতি বছর অভিযান শিথিল হওয়ায় চাঁদাবাজ চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, গাঁওদিয়া গ্রামের রুবেল মাদবর ও আল—আমিন মাদবর, শামুরবাড়ি গ্রামের রিপন ওস্তাগার, আনোয়ার ঢালী, ডহুরী গ্রামের ফরিদা বেগম, লেকু ওস্তাগার, মারইল গ্রামের খোকন এবং বালিগাঁও বাজার এলাকার রাজন মুন্সীসহ কয়েক জনের নেতৃত্বে চাঁদার বিনিময়ে বাল্কহেড চলাচল করানো হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে লৌহজং, টংঙ্গীবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ সদর, জাজিরা ও শরীয়তপুরের বিভিন্ন থানায় নৌ—ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের একাধিক মামলা রয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর বাল্কহেড থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগে রুবেল মাদবরকে ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই লাখ টাকা জরিমানা ও তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়। একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর ডহরি খালে চাঁদাবাজির মামলায় রাহাত চাকলাদার ও দীপু ওস্তাগারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে হত্যা ও চাঁদাবাজি মামলায় রিপন ওস্তাগারও গ্রেফতার হন।
স্থানীয়দের দাবি, ঐ সময় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছিল। হাড়িদিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা খায়রুন নেছা বলেন, বাল্কহেডের ঢেউয়ে আমার গোয়ালঘরের একাংশ ভেঙে গেছে। আরেকটু ভাঙলেই বসতঘর ও নদীতে চলে যাবে। নুরপুর গ্রামের জাহাঙ্গীর বেপারী বলেন, এক সপ্তাহ আগে আমার একটি ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। আরেকটি ঘর এখন ভাঙনের মুখে। বাল্কহেড চলাচল বন্ধ না হলে শেষ সম্বলটুকুও হারাতে হবে।
হাড়িদিয়া গ্রামের পাপ্পু শিকদার বলেন, দিন—রাত বাল্কহেড চলাচল করছে। আমরা সবাই ভাঙনের আতঙ্কে আছি। চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে রুবেল
মাদবর বলেন, আমি একা নই, আরো অনেকে বাল্কহেড আনে। আমরা জোর করে টাকা নিই না, সুকানিরা খুশি হয়ে এক দেড় হাজার টাকা দেন। তার বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন আগে নদীতে কাজ করতাম তখন সব মিলিয়ে ১২টি মিথ্যা মামলা হয়েছিল দশটি মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে এবং বর্তমানে দুটি মামলায় জামিনে আছেন।
ফরিদা বেগম বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর আমি ও আমার ছেলে এই কাজ দেখি। চাঁদাবাজি জোর করে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সুকানি ভাইরা খুশি মনে কিছু টাকা দেয়।
লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভাঙনের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বাল্কহেড চলাচল বন্ধে নৌ—পুলিশকে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মাওয়া নৌ—পুলিশ স্টেশনের ইনচার্জ মো: জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, খালে নিয়মিত টহল চলছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলা ও মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম জোরদার হলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
