Skip to content

আমেরিকা বাংলাদেশ সম্পর্ক ও হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের অবদান: আবদূন নূর

 

বিশেষ প্রতিনিধি:

আমেরিকা ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় এবং এর পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন, বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা বিতর্কিত হলেও স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামল (১৯৮২-১৯৯০) ছিল বাংলাদেশ-আমেরিকা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে সম্পর্কটি মূলত বাস্তববাদী, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল।স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্কপ্রাথমিক পর্যায় (১৯৭২-১৯৭৫): তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব উইলিয়াম রজার্স এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৮ মে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে খাদ্য সংকট মোকাবিলা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমেরিকা বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য ও অনুদান প্রদান করে।নীতিগত পরিবর্তন (১৯৭৫ পরবর্তী): রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ভাবধারা থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরের ফলে আমেরিকার সাথে সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি ঘটে।বর্তমান প্রেক্ষাপট: কালক্রমে এই সম্পর্ক সাহায্য-নির্ভরতা থেকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, সন্ত্রাসবাদ দমন, রোহিঙ্গা সংকট এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বে রূপ নিয়েছে। আমেরিকা বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক খাতের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার এবং অন্যতম প্রধান বৈদেশিক বিনিয়োগকারী দেশ।সম্পর্কের উন্নয়নে এরশাদের অবদান ও ভূমিকাসামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর এরশাদ সরকার মার্কিন প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে বেশ কিছু কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন :

উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও রাষ্ট্রীয় সফরহোয়াইট হাউস সফর (১৯৮৩): ১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাসে এরশাদ ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগানের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে একটি অত্যন্ত সফল ও আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন।

আন্তর্জাতিক প্রশংসা: এই সফরে রাষ্ট্রপতি রেগান জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে (NAM) বাংলাদেশের গঠনমূলক এবং আঞ্চলিক শান্তিপূর্ণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুক্তবাজার নীতিবেসরকারীকরণ ও বিরাষ্ট্রীয়করণ:

এরশাদ পূর্ববর্তী আমলের পাট ও বস্ত্রকলসহ বড় বড় শিল্প খাতকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সাহসী নীতি গ্রহণ করেন।

মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণ: এই সংস্কারের ফলে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ (Joint Venture) শুরু হয়।রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZ): দেশের প্রথম ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ এবং তৈরি পোশাক খাতের ভিত্তি মজবুত হয়, যা পরবর্তীতে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির দ্বার উন্মুক্ত করে。৩. ভূরাজনৈতিক অবস্থান ও সোভিয়েত বিরোধী নীতিসোভিয়েত প্রভাব হ্রাস: স্নায়ুযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে এরশাদ বাংলাদেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের (ইউএসএসআর) কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রভাব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বেশ কয়েকজন সোভিয়েত কূটনীতিককে ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরশাদের এই নীতি আমেরিকাকে বিশেষভাবে সন্তুষ্ট করেছিল।জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ: ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আমলেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে (UNIIMOG) প্রথম সৈন্য পাঠায়। আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ভাবনার সাথে এই পদক্ষেপটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।৪. সাহায্য ও মানবিক সহযোগিতা বজায় রাখাসামরিক শাসন ও মানবাধিকার সংক্রান্ত কিছু অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন থাকা সত্ত্বেও এরশাদ মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা USAID-এর মাধ্যমে আসা উন্নয়ন সহায়তা ও কৃষি খাতের অনুদান সচল রাখতে সক্ষম হন। ১৯৮৪ সালের তীব্র বন্যা ও খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় মার্কিন পিএল-৪৮০ (PL 480) কর্মসূচির অধীনে আসা খাদ্য সহায়তা সে সময় বড় বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করেছিল।সংক্ষেপে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বৈধতার সংকট থাকা সত্ত্বেও এরশাদ তাঁর বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং পশ্চিমাঘেঁষা কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে আমেরিকার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ককে একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পেরেছিলেন।

১৯৮৩ সালের ২৫ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসিতে এই ঐতিহাসিক বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সাক্ষাৎকারের সময় এরশাদের দাপ্তরিক পদবি সরাসরি ‘রাষ্ট্রপতি’ বা প্রেসিডেন্ট ছিল না; বরং তিনি তখন বাংলাদেশের ‘প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক’ (CMLA) এবং ‘মন্ত্রিপরিষদ প্রধান’ (President of the Council of Ministers) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর ঠিক কিছুদিন পর, ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।প্রেসিডেন্ট রেগান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মধ্যকার এই বৈঠকের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
ওভাল অফিসে বৈঠক: হোয়াইট হাউসের বিখ্যাত ওভাল অফিসে (Oval Office) প্রেসিডেন্ট রেগান এবং জেনারেল এরশাদ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা করেন।

মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রশংসা: এই সাক্ষাতের পর প্রেসিডেন্ট রেগান তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, এরশাদ বাংলাদেশেকে রাষ্ট্রায়ত্ত সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ধারা থেকে বের করে মুক্তবাজার অর্থনীতির (Free Enterprise) দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।গণতন্ত্রে ফেরার প্রতিশ্রুতি: বৈঠকে জেনারেল এরশাদ বাংলাদেশে দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন এবং ক্রমান্বয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্বহালের ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনকে আশ্বস্ত করেন।বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ: হোয়াইট হাউসের লনে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় জেনারেল এরশাদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানকে সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।যদিও পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে এরশাদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন প্রশাসনের সাথে আরও বহুমাত্রিক যোগাযোগ হয়েছিল, তবে ১৯৮৩ সালের এই সরকারি সফরটিই (Working Visit) ছিল প্রেসিডেন্ট রেগানের সাথে তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ সরাসরি সাক্ষাৎ।

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ‘টিকফা’ (TICFA) চুক্তিটিকফা-এর পূর্ণরূপ হলো Trade and Investment Cooperation Forum Agreement (বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি)। এটি বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।চুক্তি স্বাক্ষর: দীর্ঘ এক দশকের আলোচনার পর ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর ওয়াশিংটনে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।মূল উদ্দেশ্য: দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাধা দূর করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা।প্রধান কার্যপদ্ধতি: প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও ওয়াশিংটনে দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘টিকফা কাউন্সিল’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। টিকফা ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবি ও চাপশ্রম অধিকার ও নিরাপত্তা: তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার সুবিধা এবং কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমেরিকা প্রতিনিয়ত চাপ দিয়ে আসছে।মেধাস্বত্ব অধিকার (IPR): বাংলাদেশে মার্কিন সফটওয়্যার, ওষুধ এবং চলচ্চিত্রের পাইরেসি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি জানায় যুক্তরাষ্ট্র।বিনিয়োগ পরিবেশ সহজীকরণ: লাভ বা লভ্যাংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার তাগিদ দেয়।

টিকফা ফোরামে বাংলাদেশের মূল দাবি ও প্রত্যাশাজিএসপি (GSP) সুবিধা পুনর্বহাল: ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা বা GSP স্থগিত করে।

বাংলাদেশ প্রতি বৈঠকেই এই সুবিধা ফেরত চায়।মার্কিন তুলা আমদানিতে শুল্ক ছাড়: বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা তুলা আমদানি করে। সেই তুলা দিয়ে তৈরি পোশাক মার্কিন বাজারে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে রপ্তানির দাবি জানায় বাংলাদেশ।প্রযুক্তি হস্তান্তর: বাংলাদেশের আইটি এবং উৎপাদনশীল খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়।

সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সাম্প্রতিক সংবাদ

আর্কাইব

প্রধান উপদেষ্টাঃ মোঃ শওকত হোসেন সরকার

প্রধান সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুস সালাম

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ নজরুল ইসলাম আজহার

ঠিকানা : এ/১৩১ (ইকবাল কুটির) হাবিব উল্লাহ স্মরণী, জয়দেবপুর, গাজীপুর-১৭০০।

সেলফোন : ০১৭১৬-৩৩৩০৯৬ ॥ E-mail: banglabhumibd@gmail.com

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত বাংলাভূমি ২০০৯-২০২৫