বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: আশা দেখিয়েও উন্মুক্ত হচ্ছে না মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এ সুযোগে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে শ্রমিকদের দেশটিতে পাচারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন মানবপাচারকারীরা।
তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কক্সবাজার হয়ে নৌ-পথে মালয়েশিয়া যাওয়া বন্ধ হওয়ায় তারা বের করেছেন নতুন কৌশল, নতুন এক রুট।
এখন রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে মালয়েশিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্দোনেশিয়াকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশিদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা থাকায় ঢাকা থেকে শ্রমিকদের ভ্রমণ ভিসায় দেশটিতে পাঠান মানবপাচারকারীরা। এরপর সেখানকার বাংলাদেশি ও ইন্দোনেশিয়ার দালালরা মিলে নৌ-পথে তাদেরকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা করেন।
বিমানবন্দরের অসাধু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রকৃত পর্যটক না হয়েও ভ্রমণের নামে বিমানে ওঠার সুযোগ পান এসব শ্রমিকরা।
সর্বশেষ গত ১১ অক্টোবর মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে এমনই ২০ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে দেশটির নৌ-পুলিশ।
বেশ কিছুদিন ধরে নিয়মিতভাবে এমন কয়েকটি দলকে উদ্ধার করা হলেও টনক নড়েনি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন শীতে ইন্দোনেশিয়া হয়ে নৌ-পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তখন নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশিদের জন্য দেশটি অন অ্যারাইভাল সুবিধা বন্ধ করতে পারে বলে শঙ্কা তাদের। এর ফলে দেশটির সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ব্যহত হওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
পাশাপাশি বিমানবন্দর থেকে ভ্রমণের নামে যেন শ্রমিকরা ইমিগ্রেশন পার হতে না পারেন, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্যারাম এশিয়ার আঞ্চলিক সমন্বয়ক হারুন আল রশিদ মালয়েশিয়া থেকে টেলিফোনে বাংলানিউজকে বলেন, ‘কক্সবাজার দিয়ে মালয়েশিয়া পাঠানো বন্ধ হওয়ায় আকাশ পথে ইন্দোনেশিয়া, পরে সেখান থেকে নৌ-পথে মালয়েশিয়া পাঠানোর যে কৌশল মানবপাচারকারীরা অবলম্বন করছেন, তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাংলাদেশিদের জন্য ইন্দোনেশিয়ার অন অ্যারাইভাল সুবিধা ব্যবহার করে এ অপকর্ম করছেন মানবপাচারকারীরা’।
তিনি বলেন, ‘গত ৫-৬ মাসে এ পথে পাচারকারীসহ কয়েকজন বাংলাদেশি মালয়েশিয়ার উপকূলে ধরা পড়েন। নিশ্চয়ই তাদের তথ্য দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে পৌঁছেছে। তবুও কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি’।
ইন্দোনেশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাজমুল কাওনাইন বাংলানিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশিদের অন অ্যারাইভাল সুবিধা দেওয়ার অন্যতম দেশ ইন্দোনেশিয়া। সে সুবিধার অপব্যহার করে মানবপাচারের খবর শোনা যাচ্ছে। বেশ কয়েকজন দেশটিতে আটকও রয়েছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা বন্ধ করে দিতে পারে দেশটি’।
প্রকৃত পর্যটক না হয়েও শ্রমিকরা ভ্রমণের নামে ইমিগ্রেশন পার হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইমিগ্রেশনকে এক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
নৌ-পথে ইন্দোনেশিয়ার কঠোর নিরাপত্তার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, দেশটির সকল প্রান্তে নিরাপত্তার কঠোর জাল। তা পার হয়ে অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়া সহজ নয়। এতে জীবন হারানোর শঙ্কাও রয়েছে।
শিগগিরই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে জানিয়ে মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনের শ্রম কাউন্সিলর মো. সায়েদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘মালয়েশিয়া বাংলাদেশি শ্রমিক নিতে সম্মত হয়েছে। পদ্ধতিগত কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় এখনো শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়নি। শিগগিরই শুরু হবে বলে আশা করছি। তখন কম খরচে বৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাবেন শ্রমিকরা’।
গত বছর কক্সবাজার হয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে আটক হন সহস্রাধিক বাংলাদেশি ও মায়ানমারের রোহিঙ্গা। পাচারকারীরা মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের নৌকায় তুলে গভীর সমুদ্রে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করতেন। মুক্তিপণ না পেলে অত্যাচার ও অনাহারের শিকার হতেন তারা। নারী শিশুসহ এমন অনেক বাংলাদেশিই সে সময় পথে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মারা যান। যাদের অনেকের মরদেহ মেলে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের জঙ্গলে। ওই ঘটনার পরে নড়ে চড়ে বসেছিল পুরো বিশ্ব।
এরপর থেকে নৌ-পথে মালয়েশিয়া যাওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশ। সাধারণত: শীত মৌসুমে সাগর শান্ত থাকায় নৌ-পথে মানবপাচার বেড়ে যায়। তবে এবারও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আসন্ন শীতকে সামনে রেখে নৌ-পথে মানবপাচার রোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যমান কমিটি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কাজ করছে। এ কমিটির মেয়াদ বাড়ানো হবে। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
