স্টাফ রিপোর্টার ॥ হাঁকডাক দিয়ে সরকারবিরোধী ‘কঠোর’ আন্দোলনের কথা বললেও বিএনপির ১১ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন রাজপথে নেই দীর্ঘদিন। নিয়মরক্ষার গতানুগতিক সাংগঠনিক কর্মসূচির মধ্যেই বৃত্তবন্দি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। দুই-একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ-উত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগে। নতুন কমিটি গঠনেরও উদ্যোগ নেই। রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দলও। এ অবস্থায় সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা অলস সময় পার করছে।
২০১১ সালের ১ মার্চ ৫ সদস্যবিশিষ্ট যুবদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। এর প্রায় ৬ মাস পরে ঘোষিত হয় ২০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। পদবঞ্চিত নেতাদের বিক্ষোভের কারণে পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের ৪ মে আরও ৬০ জনকে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশাল পরিসরের ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটি রয়েছে সংগঠনটির। তবে জন-ইস্যু ও দলীয় কোনও ইস্যুতে রাজপথে উল্লেখযোগ্য কোনও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি যুবদল। ২০১২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৫ সদস্যবিশিষ্ট ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। একই সময়ে ৫ সদস্যের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিও গঠিত হয়। প্রায় ৪ মাস পরে সংগঠনটির ২৯১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হয়। নতুন কমিটি ঘোষণার পর সংগঠনটির নেতাকর্মীরা এখনও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। রাজধানীসহ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নিজস্ব কোনও কর্মসূচি নেই ছাত্রদলের। অনেক ‘হুঙ্কার’ দিয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারেনি ছাত্রদল। কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ ও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। গত জুন-জুলাইয়ে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে পদপ্রাপ্ত ও পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। ছাত্রদলে সিনিয়র-জুনিয়র নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে ইতোমধ্যে।
২০০৯ সালের ২৩ আগস্ট ৩৬৩ সদস্যবিশিষ্ট স্বেচ্ছাসেবকদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। এছাড়া সংগঠনটির ১১ সদস্যের ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটিও রয়েছে। ৩ বছর পার হলেও মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি সংগঠনটি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে নিজস্ব ‘ইনডোর প্রোগ্রামে’ সাফল্য দেখাতে পারলেও রাজপথের কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ নেই সংগঠনটির।
১৯৯৮ সালে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কৃষকদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। এছাড়া ১০১ সদস্যের ঢাকা মহানগর কমিটিও রয়েছে সংগঠনটির। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পার হলেও সংগঠনটির কোনও নতুন কমিটি হয়নি। কৃষকদলের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সাধারণ সম্পাদক বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু। সংগঠনের এ দুই শীর্ষ নেতা অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। শুধু বিবৃতি আর আড্ডা ও দায়সারা কিছু সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পালনের মধ্য দিয়ে মহাজোট সরকারের ৫ বছর পার করেছে কৃষকদলের নেতাকর্মীরা।
২০১১ সালের ৬ জুন ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট শ্রমিকদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। এছাড়া ৭১ সদস্যের ঢাকা মহানগর কমিটি রয়েছে সংগঠনটির। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সভাপতি ও বিএনপির শ্রমবিষয়ক সম্পাদক জাফরুল হাসান শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক। মহাজোট সরকারের সময়ে নিজস্ব কোনও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি শ্রমিকদল। সাম্প্রতিক সময়ে সাভারের রানা প্লাজাধসে বহু পোশাককর্মী নিহত ও আহতের ঘটনায় এবং বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্প নিয়ে যে অরাজকতা চলছে, এর প্রতিবাদেও শ্রমিকদলের কোনও কর্মসূচি নেই।
২০১০ সালের ২৩ মার্চ ৩৫১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় মহিলাদলের। এছাড়া ৩৫১ সদস্যের ঢাকা মহানগর কমিটিও রয়েছে এ সংগঠনের। তবে রাজপথের কর্মসূচিতে মহিলাদলের উল্লেখযোগ্য কোনও নেত্রীর অংশগ্রহণ নেই। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও আছে মহিলাদলে। ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর ৩৪৫ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)। এছাড়া রয়েছে ১৫১ ও ১৩১ সদস্যের ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ কমিটি। সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নিয়ে নিজস্ব আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। অনেক আগেই শেষ হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ। ২০০৮ সালে গঠিত হয় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই বললেই চলে। কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন অধিকাংশ সময় থাকেন নিজ নির্বাচনি এলাকা কুষ্টিয়ায়। সাধারণ সম্পাদক শফিউজ্জামান খোকন দেশের এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক। তিনি ব্যস্ত ব্যবসায়িক কাজে।
মত্স্যজীবী দল এবং ওলামাদলেও একই অবস্থা। সম্প্রতি মত্স্যজীবীদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হলেও এখনও পর্যন্ত নিজস্ব কোনও কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামেনি সংগঠনটি। শুধু জানাজা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে ওলামাদলের কর্মকাণ্ড। রাজপথে খুঁজে পাওয়া কঠিন দলটির নেতাকর্মীদেরও।
যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আন্দোলনে যুবদল সক্রিয় নয়, এটা ঠিক নয়। সরকারিদলের হামলা-মামলার ঝড় পৌনে ৫ বছর যুবদলের নেতাকর্মীদের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বহুভাবে। তারপরও আমরা দাঁড়িয়ে আছি শক্ত ভিতের ওপর। স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি হাবিব-উন-নবী সোহেল বলেন, আগামী ২৪ অক্টোবরের পর আন্দোলন কত প্রকার কী কী তা দেখানো হবে। এমন আন্দোল গড়ে তোলা হবে, আওয়ামী লীগ পালানোর পথ খুঁজে পাবে না।
