স্টাফ রিপোর্টার ॥ শর্তসাপেক্ষে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছয়টি শর্ত মেনেই কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে সরকার। এই স্বীকৃতির সুবাদে প্রায় ২৪ হাজার কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরির জন্য আবেদন এবং সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, কওমি মাদ্রাসা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার স্বীকৃতি দেওয়ার এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের মেয়াদেই ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ পাস করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার যে ছয়টি শর্ত মেনে কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে সেগুলো ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। শর্তগুলো হলো কওমি মাদ্রাসা কখনো এমপিওভুক্ত হবে না। কোনো মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। প্রচলিত কওমি মাদ্রাসা বোর্ডগুলো তাদের নিজ নিজ বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হবে। কওমি মাদ্রাসার নেসাব ও নেজামে তালিমে (পাঠক্রম) কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করা চলবে না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। মাদ্রাসা পরিচালনা পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করা চলবে না।
এসব শর্তের ফলে কওমি মাদ্রাসাগুলোয় সরকারের ন্যূনতম সম্পৃক্ততা, তদারকি বা মনিটরিংয়ের সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা কিংবা সংবিধানের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার কথাও কোথাও বলা হয়নি। বরং ‘বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ও অসুস্থ রাজনীতির কবলে পড়ে ভবিষ্যতে যেন কওমি মাদ্রাসা তার স্বকীয়তা না হারায়’ সে জন্য শর্তগুলো যোগ করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘শিক্ষা স্তর ও ধারা নির্বিশেষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রযোজ্য শর্তপূরণ সাপেক্ষে (যেমন- প্রশাসনিক ও ভৌত কাঠামো, ছাত্র ও শিক্ষক সংখ্যা, ছাত্র বেতন ও শিক্ষক পারিশ্রমিক, অর্থায়ন, শিক্ষাক্রম, সহ-শিক্ষাক্রম, শিক্ষার উপকরণ ইত্যাদি) যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধিত হতে হবে। নিবন্ধিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রতিবছর বহির্নিরীক্ষক দ্বারা নিরীক্ষিত হতে হবে এবং নিরীক্ষিত হিসাবের অনুলিপি নিবন্ধনকারী কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে।’ প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনেও এ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিন্তু কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নিয়মের আওতায় আনা হয়নি। প্রস্তাবিত কওমি মাদ্রাসা শিক্ষানীতিতেও এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতার উল্লেখ নেই।
গত বছরের ১৫ এপ্রিল সরকার ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন’ গঠন করে দেয়। দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতি, হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও কমিশনের চেয়ারম্যান (বর্তমানে হেফাজতে ইসলামের আমির) আল্লামা শাহ আহমদ শফীর প্রদত্ত দিকনির্দেশনা অনুসারে কমিশন তাদের প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশন একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে জনমত জরিপ শেষে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট গত ১৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করে।
কমিশনের রিপোর্টে কওমি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ১৯টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্য থেকে পাঁচটিকে স্বতন্ত্র শিক্ষা বোর্ডের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বোর্ডগুলোকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন ও স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষমতা প্রদানের সুপারিশ রয়েছে। আর বিএ অনার্স ও মাস্টার্সের সনদ প্রদানের লক্ষ্যে কওমি ওলামায়ে কেরামদের নিয়ন্ত্রণে স্বতন্ত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়া পর্যন্ত বোর্ডগুলোর প্রতিনিধি ও শীর্ষ ওলামায়ে কেরামদের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়।
‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কমিশন’ রিপোর্ট বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইনের খসড়া ইতিমধ্যে সচিব কমিটিতে অনুমোদিত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের জন্য আগামী বৈঠকেই তা উত্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কওমি মাদ্রাসাগুলোর অ্যাফিলিয়েটিং হিসেবে কাজ করবে। যেসব মাদ্রাসা এই কর্তৃপক্ষের অধিভুক্ত হবে তারাই তাদের সনদের স্বীকৃতি পাবে।
বেফাকের নেতৃত্বাধীন কওমি মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এরই মধ্যে এই ‘কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই কর্তৃপক্ষ গঠনের মাধ্যমে সরকার কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাচ্ছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, ‘কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’ হবে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কিংবা হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। যে ১৫ সদস্য নিয়ে বোর্ড হবে সেখানে সরকারের প্রতিনিধি থাকছেন মাত্র একজন। বাকি সবাই কওমি মাদ্রাসার আলেম। তাঁরা চাইলেই কেবল সরকার সহযোগিতা দেবে। তিনি বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে সুসমন্বয়ের জন্যই সরকার এই কর্তৃপক্ষ গঠন করছে।
