স্টাফ রিপোর্টার ॥ বিমানের ঘাটে ঘাটে বেপরোয়া চাঁদাবাজি হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় একমাত্র পতাকাবাহী এয়ারলাইনস সংস্থা বিমানের সিবিএ নেতাদের নেতৃত্বে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও হরিলুটের ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। একটি শ্রমিক সংগঠনের অন্তত ৫০ জন কর্মচারী রয়েছেন, যারা চাঁদাবাজি করেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়েছেন। সিবিএ নেতাদের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা তদন্ত করতে এবার মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সিবিএ নেতাদের এ বিষয়ে শীঘ্রই নোটিস করবে দুদক।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কেভিন জন স্টিল চিঠি দিয়ে অনুরোধ জানালে দুদক তদন্ত শুরু করে। অভিযুক্ত সিবিএ নেতাদের তালিকা দিয়ে তাদের ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের পরিমাণ মাসিক বেতনের সমতা রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাঁদার টাকা ভাগ-বাটোয়ারায় সরকারের অনেক প্রভাবশালী জড়িত থাকায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিমানের প্রথম বিদেশি নাগরিক কেভিন জন স্টিল ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কিন্তু দুর্নীতিরোধে ব্যবস্থা নিতে পারছিলেন না। অবশেষে সিবিএর প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে দুদকের আশ্রয় নেন। দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, কেভিন জন স্টিল যেসব অভিযোগ এনেছেন আমরা এখন সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তা খতিয়ে দেখছি। বিমান সূত্র জানায়, বিমানের বিভিন্ন বিভাগে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে।
এসবের মধ্যে মতিঝিল সেলস অফিস, কার্গো বিভাগ, এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগ, বিক্রয় ও বিপণন পরিদফতর, সম্ভার ও ক্রয় পরিদফতর, যানবাহন উপ-বিভাগ, সিকিউরিটি ও তদন্ত বিভাগ, আসন রিজার্ভেশন বিভাগ, বিএফসিসি, বিমানের কর্মচারী নিয়োগ ও কর্মচারীদের পদোন্নতি, চুক্তি নবায়ন ও শাস্তিকালীন সময় এবং প্রকৌশল বিভাগ অন্যতম। সূত্র জানায়, গত মাসে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেন কেভিন। তিনি চিঠিতে বলেছেন, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য এলাকায় অবৈধ কর্মকাণ্ড বৈধতা দেওয়ার জন্য ক্ষমতাধর সিবিএ নেতাদের দেওয়া হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। তদন্তে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। কেভিনের এমন চিঠি আমলে নিয়ে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে দুদক। উপ-পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি টিম সপ্তাহ ধরে দুর্নীতির খোঁজে মাঠে রয়েছে। এমডি কেভিন চিঠিতে বলেন, ট্রেড ইউনিয়ন (বিশেষ করে সিবিএ) নেতাদের বিমানবন্দর ও বাইরে অবৈধ কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বাইরের কারও কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, শ্রমিক-কর্মচারীদের ওভারটাইমের নামে চলছে হরিলুট। গত বছর শুধু ওভারটাইম খাতে বিমানকে গুনতে হয়েছে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। তার আগের বছর ৩৮ কোটি টাকা। শিফটিং ডিউটি চালু করায় এ ক্ষতি চলতি বছর কমপক্ষে ১২০ কোটি টাকা ছাড়াবে। সূত্র জানায়, কার্গো বিভাগের রপ্তানি শাখার স্পেস কন্ট্রোল, কার্গো ওজন চেকিং, কার্গো আমদানি শাখার মেইন ওয়্যার হাউস, ডেলিভারি গেট ও কার্গো শাখায় শ্রমিকদের ডিউটি রোস্টারের নামে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা অবৈধভাবে আয় করছে। সিবিএ নেতারা এসব শাখায় ডিউটি নিয়ে সে কাজ সাধারণ শ্রমিকদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এরপর ওই সিবিএ নেতা রাত ৯টা পর্যন্ত সিবিএ কার্যালয়ে আড্ডাবাজি করলেও পে স্লিপের মাধ্যমে আদায় করছেন লাখ টাকার ওপরে বেতন। যদিও একজন শ্রমিকের সর্বোচ্চ বেতন হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা। কার্গো বিভাগের এ শাখাগুলোতে পোস্টিং পেতে একজন শ্রমিককে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয় নেতাদের। সূত্র জানায়, এয়ারপোর্ট ট্রাফিক শাখার পাসপোর্ট চেকিং ইউনিট (পিসিইউ) শাখায় পোস্টিং নিতে হলে প্রত্যেক স্টাফকে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে।
এ শাখায় পোস্টিং নেওয়া একজন সদস্য প্রতিদিন আয় করছেন ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। কোনো কোনো দিন এ টাকা লাখের অঙ্কও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যার কারণে ট্রাফিক বিভাগের অধিকাংশ সদস্যের ঢাকায় একাধিক বাড়ি-গাড়ি ও নামে বেনামে সম্পদ রয়েছে। সূত্র মতে, বিভিন্ন ফ্লাইটে গমনকারী যাত্রীদের অতিরিক্ত ব্যাগেজ মাশুল আদায়ের নামে চেকিং কাউন্টারে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় করছে। এ টাকা কোষাগারে জমা হচ্ছে না। একইভাবে হারানো ও প্রাপ্তি শাখায় তাদের নিজেদের কর্মী পোস্টিং দিয়ে সিওডি ব্যাগেজের লাখ লাখ টাকা ভাড়া মাশুল আদায় করলেও কোষাগারে জমা হচ্ছে না।
সিট রিজার্ভেশন শাখায় পছন্দের কর্মী পোস্টিং দিয়ে এজেন্টদের থেকে সিট কনফার্ম করার অজুহাতে ফ্লাইটভিত্তিক লাখ লাখ টাকা আয় করেও সেই টাকা বিমানের কোষাগারে জমা না দিয়ে লুটপাট করছে। সূত্র জানায়, বিমানের ভাড়া গাড়ির ঠিকাদার ও মালিকদের কাছ থেকেও মাসিকভিত্তিতে লাখ লাখ টাকার মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। শুধু চাঁদাবাজি নয়, বিমানের জন্য যানবাহন ভাড়া নেওয়া, যানবাহনের জ্বালানি তেল ক্রয়ের মাধ্যমে নামে-বেনামে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করা হচ্ছে। বিমানের প্রতিটি নিয়োগের জন্য সিবিএকে মাসোহারা দিতে হচ্ছে। সূত্র জানায়, প্রতিটি নিয়োগের জন্য গড়ে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সিবিএকে। এ ছাড়া আত্দীয় পরিচয় দিয়ে নিয়োগ দিয়ে প্রতি নিয়োগে ৪-৫ লাখ টাকা আয় করছে। ি
