বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ অনিয়মে জড়িয়ে গেছে ব্যাংকিং খাত। নানা উপায়ে হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকের টাকা। বিশেষত এক খাতের ঋণ অন্য খাতে দেখানো, নির্ধারিত সুদ ছাড়াও প্রসেসিং ফি, লোন এপ্লিকেশন ফি, ভ্যাট, ডকুমেন্টেশন চার্জ, জীবন বীমা ফি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অগ্নি বীমা বাবদ বিপুল অংকের টাকা ঋণ গ্রহীতার কাছ থেকে অবৈধভাবে গ্রহণের প্রমাণ মিলেছে। এসএমই ঋণের বেশির ভাগ ব্যবসা খাতে, কিছু সেবাখাতে এবং নামমাত্র শিল্পখাতে বিতরণ করা হয়েছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তা খাতে কোন ঋণ বিতরণ করেনি।
এছাড়া, সার্ভিস সেন্টার নেই তবুও কার্যক্রম থাকার প্রচারণা হরহামেশাই ঘটছে। এতে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বেশ শঙ্কিত এবং চিন্তিত। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এসএমই খাতে ঋণের চাহিদা আছে। সে চাহিদার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি শ্রেণী গ্রাহকদের হয়রানি করছে। এটি স্বচ্ছ ব্যাংকিংয়ের জন্য এক ধরনের অশনি সংকেত। তিনি বলেন, রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও সতর্ক হতে হবে। এছাড়া, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের একটি অসাধু প্রতিযোগিতাও এখানে রয়েছে। এ কারণে এক খাতের ঋণ অন্য খাতে দেখানোর প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যাংকিংয়ের জন্য এসব অনিয়ম দমনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
কম নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণের কৌশল হিসেবে অন্য খাতের ঋণ এসএমইতে প্রদর্শন করেছে কয়েকটি ব্যাংক। এছাড়া, এসএমই ঋণের ক্ষেত্রে অনেক ব্যাংক বিভিন্ন নামে অযৌক্তিক চার্জ আরোপ করছে। মূলত মুনাফা বাড়াতে এমন আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের পথ ধরেছে তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামপ্রতিক পরিদর্শনে এ অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি প্রতিফলিত না হওয়ায় ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছে পরিদর্শক দল। এমন পরিস্থিতিতে এসএমই ঋণের সংজ্ঞা পুনঃনির্ধারণ, বর্তমানে প্রযোজ্য দশমিক ২৫ শতাংশের পরিবর্তে আগের নিয়মে ১ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছে তারা।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অধিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক উৎসাহিত করে। তবে এসএমই ঋণের খরচ বেশি হয় বলে ব্যাংকগুলো অন্য খাতের ঋণ এ খাতে দেখিয়ে দিচ্ছে। এটি বড় ধরনের অন্যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে দুর্বলতা এবং সুশাসনের অভাবে এমন হচ্ছে। এক খাতের ঋণ অন্য খাতে দেখানো বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। এছাড়া, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন নয়, এর বাস্তবায়নই দেখতে চান তিনি। এসএমই ঋণের সার্বিক বিষয়ে একটি ধারণা পেতে সমপ্রতি ৩০টি ব্যাংক ও ৪টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৫৪টি শাখা এবং ১১৫টি এসএমই সার্ভিস সেন্টারের ওপর বিশদ পরিদর্শন করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
এছাড়া, বিভিন্ন ব্যাংকের আরও ৬৬টি শাখা পরিদর্শন করা হয়েছে। পরিদর্শনে দেখা গেছে, নীতিমালা অনুযায়ী অশ্রেণীকৃত সাধারণ ঋণের বিপরীতে ১ শতাংশ হারে প্রভিশন সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আর এসএমই ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হচ্ছে দশমিক ২৫ শতাংশ হারে। ব্যাংকগুলো সাধারণ প্রভিশন কম দেখানোর মাধ্যমে মুনাফা স্ফীত করতে এসএমই বহির্ভূত ঋণকে এসএমই হিসেবে দেখাচ্ছে। ব্যাংক থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো এসএমই ঋণ বিবরণী এবং ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন সংরক্ষণ বিবরণীতে বর্ণিত তথ্যেও গরমিল রয়েছে। সে অনুযায়ী, এসএমই ঋণের বিবরণীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের ৫টি শাখায় ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং বেসরকারি খাতের ৪টি ব্যাংকের ৫১টি শাখায় ৫ কোটি ১৩ লাখ টাকার বাড়তি প্রভিশন সংরক্ষণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়মের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া নীতিমালায় কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। পরিদর্শক দল বলেছে, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা ও পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা এসএমই ঋণের মূল লক্ষ্য হলেও তা ব্যাহত হচ্ছে। এসএমই ঋণের বেশির ভাগ বিতরণ হচ্ছে ব্যবসা খাতে। কিছু দেয়া হয়েছে সেবা খাতে এবং নামমাত্র শিল্পখাতে। নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়া হয়েছে খুব সামান্য। এছাড়া, অনেক ব্যাংক এসএমই ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে সুদ আদায় ছাড়াও প্রসেসিং ফি, ঋণ আবেদন ফি, কর, ডকুমেন্টেশন চার্জ, জীবন বীমা ফি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অগ্নি বীমা বাবদ ঋণ গ্রহীতা থেকে বিপুল অংকের টাকা আদায় করছে। এ ধরনের ফি আদায় অযৌক্তিক।
বেশির ভাগ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নামমাত্র এসএমই ঋণ বিতরণ করে ব্যাপক সাফল্য প্রচার ও মুনাফা বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ নিচ্ছে। এসএমই ঋণের ব্যাপ্তির তুলনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নিয়োজিত জনবল কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত চিত্র আসে না বলেও এতে উল্লেখ রয়েছে। সরকার প্রণীত শিল্পনীতি-২০১০-এর আলোকে এসএমই ঋণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নীতিমালা অনুযায়ী, জমি ও ভবন ব্যতিরেকে যেসব প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদের পরিমাণ ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা অথবা কর্মরত জনবল ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৫০ জন, সেসব প্রতিষ্ঠান এসএমই খাতের আওতায় ঋণ নিতে পারে। এই সংজ্ঞার অপব্যবহার করে ব্যাংকগুলো ওই সীমার আওতায় থাকা যে কোন ধরনের ঋণকে এসএমইএ ঋণ হিসেবে দেখাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল তাদের সুপারিশে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। সূত্র-বেঙ্গলিনিউজটোয়োন্টিফোর.কম
