বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের প্রথম সংযোগ (ক্যান-বেতওয়া) প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পদ্মা ও যমুনা নদীর এক তৃতীয়াংশ পানি কমে যাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে এর পরিবেশ, প্রতিবেশ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। এমন আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা গেছে, আশির দশকের দিকে জরুরিভিত্তিতে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রলায় একটি জাতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পণা করে। যার মূলে ছিল ‘উদ্বৃত্ত’ এলাকা থেকে ‘ঘাটতি’ এলাকায় পানি সরিয়ে নেয়া। প্রকল্পটির দু’টি উপাদান ‘হিমালয় নদী উন্নয়ন’ ও ‘পেনিনসুলার নদী উন্নয়ন’।
এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৩৭টি নদীকে ৩০টি খালের সাহায্যে সংযুক্ত করা হবে। হিমালয় অববাহিকার নদীগুলোতে ১৪টি এবং উপদ্বীপের নদী হিসাবে পরিচিত ভারতের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে বাকি ১৬টি সংযোগ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ৩০টি সংযোগ খালের মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে সাড়ে ১২ হাজার কিলোমিটার। এতে মোট ১৭৩ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি ডাইভার্ট করা হবে।
২০০২ সালের ৩১ অক্টোবর দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের হাইকোর্ট ২০১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বস্তবায়নের নির্দেশ দেয়। পরে এ বিষয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০০৩ সাল থেকেই ভারতসহ গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অন্যান্য দেশ বাংলাদেশ ও নেপালে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। তখন ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম স্থগিত করে।
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরা ব্যাপক আন্দোলনের ঝড় তুললে ভারত সরকার বাংলাদেশসহ নেপাল ও ভুটানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হিমালয়ের অংশের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে তা বাস্তবায়ন করবে না বলে আশ্বস্ত করে।
২০০২ সালে দেয়া ওই আদেশ বাস্তবায়নে সরকারকে একটি নতুন নির্দেশনা জারি করে ভারতের সুপ্রিমকোর্ট। সুপ্রিমকোর্টের ওই আদেশকে ক্ষমতার পরিসীমার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন বলে মতামত দিয়েছেন খোদ ভারতের শীর্ষ পরিবেশবিদরা। ২০০৩ সালের ১ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় পানি সম্মেলনে তাদের ভূ-গোল ও পানি বিজ্ঞানীরা এই প্রস্তাবকে অবাস্তব বলে প্রত্যাখ্যান করেন। ওই বছরের ২৩ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিত এক আবেদনে তারা নদী সংযোগের এ প্রকল্প দেশটির জন্য শুধু ভয়াবহ সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে না বরং পরিবেশ ও প্রতিবেশগতভাবেও মারাত্মক ক্ষতি হবে বলে মতামত দেন। একই সঙ্গে দেশটির আন্তঃনদীর ব্যবহারিক অংশিদারিত্ব দেশ চীন, নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশেও তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
এসব দেশের পরিবেশবাদীরা বলেছেন, এ সংক্রান্ত একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও বই প্রকাশিত হয়েছে। এমন একটি রায় দেয়ার পূর্বেই ভারতের আদালতকে নদী সংযোগ প্রকল্প বিষয়ে বিদ্যমান দৃষ্টিভঙ্গীগুলো তাদের বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন ছিল।
দ্বিতীয় দফায় আদালতের আদেশের পর ভারত সরকার হিমালয়ান নদী উন্নয়ন সম্পর্কিত ১৪টি খাল খনন পরিকল্পনার অন্যতম ‘ক্যান-বেতওয়া’ কার্যক্রমটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান-বেতওয়া নদী সংযোগের কাজ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের যেসব ক্ষতি হতে পারে, সেসব বিষয় ভারতের আদালতে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ করে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে। সেক্ষেত্রে সেখানকার আদালত বাংলাদেশের পক্ষেও কথা বলতে পারেন।
সম্প্রতি ভারতীয় মন্ত্রিসভায় বিষয়টির ওপর আলোচনা পর এটি ‘স্পর্শকাতর’ উল্লেখ করে আসন্ন নির্বাচনকে লক্ষ্য করে আপততঃ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যদিও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত আলাপ আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য অঙ্গিকারাবদ্ধ থাকলেও এ বিষয়ে ভুক্তভোগী অন্যান্য দেশগুলোসহ বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনাও করেনি। ভারতীয় পানিসম্পদমন্ত্রী হারিশ রাওয়াত ও পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী জয়রাম রমেশসহ একাধিক পানি বিশেষজ্ঞ এধরণের প্রকল্পকে ভারতের জন্য ‘ধ্বংসাত্মক’ বলেও মত দিয়েছেন।
জানা গেছে, ভারতের ৫৪টি নদী থেকে বাংলাদেশে পানি আসে। এর প্রতিটি নদীর অববাহিকায় বাঁধ দিয়েছে ভারত। বাঁধের প্রতিটি মুখের পেছনে বড় ধরণের হ্রদ থাকায় এর ওপর দিয়ে বাংলাদেশে পলি প্রবেশ করতে পারে না। ওখানেই জমে থাকে। এসব পালি বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তার মাটি অনেক উর্বর হতো। এসব স্থানে বাঁধ নির্মাণের পূর্বে যেখানে ৪ থেকে ৫ মিলিমিটার ভূমি উর্বর হতো তা এখন নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ থেকে ৩ মিলিমিটারে। কারণ ওইসব হ্রদেই বাকি পলিগুলো জমে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে- ক্যান নদীর উপ-অববাহিকা থেকে বতওয়া নদীর উপ-অববাহিকায় প্রত্যাহারকৃত পানির সবটাই স্থানীয় বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার হবে। আর তার ফলস্বরূপ বাংলাদেশের পদ্মা নদীর পানি মোট অংশের এক তৃতীয়াংশ হ্রাস পাবে। একইভাবে উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে ফারাক্কা ব্যারেজ পয়েন্টে পানি ও তলানীর পারিমাণ হ্রাস পাবে। যার ফলে ভাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সুন্দরবনের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। উপকূলীয় নদীগুলোর লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে। সন্নিহিত প্লাবনভূমি ও বদ্বীপ ভূমিতে পলি কমে যাবে। নৌপথ-সেচ-ভূ গর্ভস্থ মাটির রিচার্জ-শিল্প কারখানার জন্য ভালো পানির প্রাপ্যতা ও মৎস্যসম্পদের জন্য পানির অভাব দেখা দেবে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার লক হ্যাভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশিষ্ট ভূতত্ব বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, ‘ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ বিজ্ঞান ও পরিবেশভিত্তিক নয়। বিভিন্ন নদীর মুখে বাঁধ নির্মাণ করায় ঐতিহাসিক প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করলে ভারত থেকে গত ১৬ বছরে মাত্র ৮৫ ভাগ পানি পায়নি বাংলাদেশ। তাদের একের পর এক ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তাছাড়া আগামী ২০২১ সালের মধ্যে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা দুই মিটার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলেও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ।’
তিনি আরো বলেন, ‘ক্যান-বেতওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পদ্মা ও যমুনা নদীর একতৃতীয়াংশ পানি কমে যাবে। যুগ যুগ ধরে যার খেসারত বাংলাদেশকেই দিতে হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন- বাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন বলেন, ‘ভারত বাংলাদেশকে পলিটিক্যাল বাউন্ডারি ভেবে একের পর এক ধ্বংসাত্মক কার্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করে যাছে। অথচ দেশের রাজনৈতিক কোনো দলই এ নিয়ে কথা বলছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশের পরিবেশবাদীরা প্রকল্পটির বিরুদ্ধে যে সূরে কথা বলছেন, সরকার সে সূরে কথা বলছে না। ভারত আমাদের বন্ধু হতে পারে কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা আমাদের দেশের অস্তিত্ব নিয়ে খেলা করবেন।’
বাংলাদেশের নদী কমিশন একটি অথর্ব কমিশন উল্লেখ করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসতে ভারতকে আহ্বান জানানোর জন্য বলেন আব্দুল মতিন।
এছাড়া ক্যান-বেতওয়া সম্পর্কে শনিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)।
